আমিরাতের সাথে সোমালিয়ার সব চুক্তি বাতিল

আমিরাতকে সোমালিয়ার বন্দর-সামরিক ঘাঁটি থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগ

Printed Edition
Int-2
সোমালিয়ার বোসাসো উপকূলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটি : ইন্টারনেট

রয়টার্স ও আলজাজিরা

সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে করা সব ধরনের চুক্তি বাতিল করেছে সোমালিয়া সরকার। এর ফলে দেশটির বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দর থেকে সরে যেতে হবে আমিরাতকে। সোমালিয়া কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণœ হওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সরকারি সূত্র ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, সোমবার মোগাদিশু সরকার আমিরাতের সাথে সব চুক্তি বাতিল করে। এতে ফেডারেল সরকার, সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং আঞ্চলিক প্রশাসনের সাথে করা সব ধরনের সমঝোতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নথিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, বেরবেরা, বসাসো ও কিসমায়ো বন্দরে আমিরাতের সাথে চলমান সব সহযোগিতাও এ সিদ্ধান্তের আওতায় পড়বে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এ পদক্ষেপ সোমালিয়া-আমিরাত সম্পর্ককে নতুন সঙ্কটে ফেলতে পারে। এ ছাড়া সোমালিয়ার মন্ত্রিসভা আমিরাতের সাথে করা দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ সব চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণœ করার বিষয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রমাণ’ পাওয়ার পরই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশটির অনেক নাগরিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মন্তব্য করেছেন, এটি সঠিক পথে একটি পদক্ষেপ। সোমালিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আবদুল্লাহি ফারমাজোও এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি আমিরাতের পক্ষ থেকে।

অন্য দিকে সোমালিল্যান্ড সরকারের মন্ত্রী খাদের হোসেন আব্দি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘সোমালিয়ার দিবাস্বপ্ন কিছুই পরিবর্তন করতে পারবে না। বারবেরা আমাদের প্রেসিডেন্টের জন্মস্থান এবং আরব আমিরাত সোমালিল্যান্ডের একজন বিশ্বস্ত বন্ধু। অন্যরা যখন আমাদের নিয়ে সন্দেহ করেছিল, তারা তখন এখানে বিনিয়োগ করেছে... মোগাদিসুর দুর্বল প্রশাসন যা-ই বলুক না কেন, আমিরাত এখানে ছিল এবং থাকবে।’

সোমবার মিডল ইস্ট আই জানায়, আরব আমিরাত সোমালিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের সামরিক বাহিনী সরিয়ে নিচ্ছে। এর মধ্যে পুন্টল্যান্ড অঞ্চলের বোসাসো শহরও রয়েছে, যেখানে একটি আমিরাতি ঘাঁটি ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এই ঘাঁটি থেকে সুদানের আধা সামরিক বাহিনী ‘র্যা পিড সাপোর্ট ফোর্সেস’-এর কাছে রসদ পাঠানো হতো। সোমালিয়ার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ‘আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, তারা তাদের নিরাপত্তাকর্মী এবং সামরিক সরঞ্জাম প্রতিবেশী ইথিওপিয়ায় সরিয়ে নিচ্ছে।’

পুন্টল্যান্ড অঞ্চলের প্রশাসন মোগাদিসু সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখ-তার প্রশ্নটি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। এর কারণ হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তার আঞ্চলিক মিত্র ইসরাইল সোমালিল্যান্ডের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করছে, যা সোমালিয়ার একটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চল এবং যেখানে নিজস্ব সরকার রয়েছে।

গত ২৬ ডিসেম্বর ইসরাইল বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিল্যান্ডের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়। এডেন উপসাগর উপকূলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বারবেরা এই অঞ্চলেই অবস্থিত। গত মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির পর ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার প্রথম সরকারি সফরে এই শহরে যান। সফরকালে সার ঘোষণা করেন, ‘ফিলিস্তিনের মতো সোমালিল্যান্ড কোনো ভার্চুয়াল রাষ্ট্র নয়’ এবং এই সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশকে ‘পাশ্চাত্যপন্থী ও ইসরায়েলের বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেন।

ইসরাইল ও সোমালিল্যান্ডের মধ্যে আলোচনায় বারবেরায় একটি ইসরাইলি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই শহরটি বর্তমানে লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে আরব আমিরাতের নিয়ন্ত্রিত ঘাঁটি বলয়ের একটি অংশ।

এরপর গত বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের দক্ষিণপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা আইদারুস আল-জুবাইদিকে বহনকারী একটি জাহাজ বারবেরায় নোঙর করে, যাকে আরব আমিরাত সমর্থন দিয়ে থাকে। সৌদি আরব তখন তাদের নামমাত্র মিত্র আমিরাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, তারা জুবাইদিকে ইয়েমেন থেকে বারবেরা বন্দর হয়ে কৌশলে আবুধাবিতে নিয়ে গেছে। সোমালিল্যান্ডের সাথে আরব আমিরাতের সম্পর্ক ২০১৭ সাল থেকে শুরু হয়, যখন সোমালিল্যান্ড সেখানে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের আমিরাতি প্রস্তাব গ্রহণ করে। তারা আশা করেছিল, এই সম্পর্ক তাদের স্বাধীনতার দাবিকে শক্তিশালী করবে। মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, বারবেরায় এই আমিরাতি নৌঘাঁটিটি একটি থমকে থাকা প্রকল্প থেকে প্রায় সম্পন্ন একটি স্থাপনায় রূপান্তরিত হয়েছে। এখানে আধুনিক সামরিক বন্দর, গভীর সমুদ্রের ডক, হ্যাঙ্গারসহ একটি বিমানঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে। বারবেরার রানওয়েটি ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা আফ্রিকার অন্যতম দীর্ঘতম রানওয়ে।