প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ নিয়ে শিক্ষক সংগঠনে বিভক্তি
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
বেসরকারি শিাপ্রতিষ্ঠানে অধ্য, উপাধ্য, প্রধান, সহকারী প্রধানসহ শীর্ষ পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে শিক্ষক সংগঠনের মধ্যে প্রকাশ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। যদিও বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী বেসরকারি শিক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপরে (এনটিআরসিএ) মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের বিধান করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই শিক্ষকদের একটি পক্ষ চাইছে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠন এবং এই কমিটির মাধ্যমেই নিয়োগপ্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হোক। তবে অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে স্কুল বা কলেজের কমিটিতে রাজতৈনিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার কারণে অনেক অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগও ছিল। এমনকি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের কিংবা কমিটির লোকজনের আত্মীয়দেরও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের ঢালাও অভিযোগ ছিল। আর এসব বিষয়ে বিবেচনা করেই বেসরকারি স্কুল ও কলেজের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির পরিবর্তে এনটিআরসিএর মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের বিধান করা হয়।
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকরের বিশেষ উদ্যোগ ছিল এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রধান নিয়োগ দেয়ার। সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন শিা সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এর ফলে স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের পথ উন্মুক্ত হবে। তবে এ পদ্ধতিতে নিয়োগ হলে ‘আওয়ামী লীগের’ লোকজন নিয়োগ পাবে এমন প্রশ্ন তুলে এর বিরোধিতা করছেন শিকদের একটি অংশ। ফলে শিাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের বিরোধিতা নিয়ে শিাঙ্গনে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি শিা ও প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের সাথে শিা মন্ত্রণালয়ের সভাকে মতবিনিময় করে বেসরকারি শিক-কর্মচারী ঐক্যজোট। সভায় জোটের চেয়ারম্যান ও বিএনপির সংসদ সদস্য অধ্য সেলিম ভূঁইয়া এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। তিনি আগের নিয়মে অর্থাৎ কমিটির মাধ্যমে এসব পদে নিয়োগের দাবি জানান। এর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে শিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
বেসরকারি শিাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিকদের বড় একটি অংশ জানিয়েছে, আগের নিয়ম অনুযায়ী ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান বা সহকারী প্রধান নিয়োগ দেয়া হলে রাজনৈতিক হস্তেেপর আশঙ্কা থাকবে। পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে যোগ্যতার পরিবর্তে অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসার পথ উন্মুক্ত হবে। তারা বলছেন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে এ পদগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গেলে শিাপ্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে মেধাভিত্তিক নিয়োগপ্রক্রিয়া জোরদার হওয়ার পাশাপাশি শিাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক কাঠামো আরো শক্তিশালী হবে।
শিা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক সময় যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান, সহকারী প্রধান নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এতে শিার মান যেমন তিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক অস্থিরতাও বেড়েছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে তারা শিার মানোন্নয়নের জন্য ইতিবাচক পদপে হিসেবে দেখছেন।
তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদগুলোতে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। এনটিআরসিএর কেন্দ্রীয়ভাবে পরীা আয়োজন করে মেধাবীদের নিয়োগের সুপারিশ করবে। নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করে যেকোনো শিকের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এসব পদে নিয়োগের পথ তৈরি হবে। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সহজ হবে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আগের নিয়মে কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ হলে অনিয়ম ও দুর্নীতি বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে এমপিওভুক্ত শিা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্য দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বেসরকারি শিাপ্রতিষ্ঠানের জন্য যতগুলো ভালো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তার মধ্যে এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ অন্যতম। সরকারের এমন যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্তের যারা বিরোধিতা করছে, তারা শিক সমাজের শত্রু।’
প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ কমিটির হাতে গেলে কোটি কোটি টাকার নিয়োগবাণিজ্য হবে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, বর্তমান শিামন্ত্রীর প্রতি আমাদের ভরসা রয়েছে। তিনি অন্যায় কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না- এমনটিই এমপিওভুক্ত ছয় লাখ শিক প্রত্যাশা করে। যদি শিামন্ত্রী তাদের দাবি মেনে নেয়, তাহলে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেবে এমপিওভুক্ত শিা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোট।’ এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের বিরোধীতার বিষয়ে শিক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ও বিএনপির সংসদ সদস্য অধ্য সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ‘গত ১৭ বছর এনটিআরসিএ আওয়ামী লীগের লোকজনকে নিয়োগের সুপারিশ করেছে। ফলে এখন এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ হলে আওয়ামী লীগের লোকজনই নিয়োগ পাবে। সে জন্য আমরা এটি চাচ্ছি না। আগের নিয়মে এ পদে নিয়োগের দাবি জানিয়েছি।’ অবশ্য সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শিা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, ‘বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা বিষয়গুলো পর্যালোচনা করব। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে আপনাদের জানিয়ে দেবো।’