জায়নবাদের অনিবার্য পতন ও একটি মিথের মৃত্যু
মিডল ইস্ট মনিটরের মন্তব্য কলাম
Printed Edition
কয়েক দশক ধরে বিশ্বকে একধরনের অপরাধবোধের মধ্যে রাখা হয়েছিল যাতে তারা সত্য দেখতে না পায়। কিন্তু সেই যুগের অবসান ঘটেছে। একটি জাতির নৈতিক জীবনে এমন একসময় আসে যখন মিথ্যা দিয়ে আর সত্যকে ঢেকে রাখা যায় না। ইসরাইল এখন সেই মুহূর্তের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। গাজা থেকে আসা ছবিগুলো কেবল যুদ্ধের নৃশংসতার প্রমাণ নয়; বরং এটি ইসরাইলকে নিয়ে দশকের পর দশক ধরে সাজানো সেই মিথের ময়নাতদন্ত। তিল তিল করে গড়ে তোলা সেই মিথ যেখানে ইসরাইলকে নিপীড়িতদের আশ্রয়স্থল, মরুভূমির বুকে গণতন্ত্র এবং বর্বরতার সাগরে এক আলোর মিনার হিসেবে দেখানো হতো, তা আজ নিজের তৈরি করা ধ্বংসস্তূপের নিচে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
সাংবাদিক ও লেখক ক্রিস হেজেস আমেরিকান গণমাধ্যমে অনেক আগেই সতর্ক করেছিলেন যে আমরা ইসরাইলকে জাতিগত নিধন এবং দখলদারিত্বের লাইসেন্স দিয়েছি; কিন্তু বিশ্ব তখন শোনেনি। কারণ তখন যেকোনো সত্যকেই ‘অ্যান্টিসেমিটিজম’ বা ইহুদিবিদ্বেষের তকমা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়া হতো। এক প্রজন্ম ধরে এই অস্ত্রটি বেশ ভালোই কাজ করেছে। এটি মানুষের জিভ জমিয়ে দিয়েছে এবং ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু আজ সেই অভিযোগটি একটি পাথুরে মেঝেতে পড়ে থাকা ব্যবহৃত কার্তুজের মতো মূল্যহীন হয়ে গেছে। বিশ্ব এখন অনেক কিছু দেখে ফেলেছে।
গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে থাকা শিশুর বিচ্ছিন্ন অঙ্গ কিংবা কবরে পরিণত হওয়া হাসপাতাল এসব দৃশ্য এখন সবার সামনে স্পষ্ট। কোনো কৌশলী জনসংযোগ দিয়ে এই চুরমার হয়ে যাওয়া ভাবমর্যাদা আর মেরামত করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্যালান্টের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে জাতিসঙ্ঘ তাদের ‘লজ্জার তালিকায়’ অন্তর্ভুক্ত করেছে। এগুলো কোনো অপপ্রচার নয়; বরং পশ্চিমা বিশ্বের তৈরি প্রতিষ্ঠানেরই রায়। প্রশ্ন এখন কেবল ইসরাইলকে নিয়ে নয়; বরং সেই পশ্চিমা শক্তিগুলোকে নিয়ে যারা বোমা ও কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে এই অপরাধে অংশীদার হয়েছে।
ইহুদি দার্শনিক হান্না আরেন্ডট একবার ‘মন্দের তুচ্ছতা’ নিয়ে সতর্ক করেছিলেন যে মন্দ কোনো দানব নয়; বরং সেসব কর্মকর্তার মাধ্যমে ঘটে যারা কেবল আদেশ পালন করে এবং চোখ ফিরিয়ে নেয়। ইতিহাস আজ এক নির্মম পরিহাসের মুখোমুখি। লন্ডন, প্যারিস, নিউ ইয়র্ক থেকে শুরু করে জাকার্তা ও জোহানেসবার্গ পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষ আজ রাস্তায় নেমে এসেছে। ফিলিস্তিনের প্রতি এই সহানুভূতি কোনো সাময়িক আবেগ নয়; বরং এটি একটি নতুন প্রজন্মের নৈতিক অবস্থান যারা তাদের পূর্বপুরুষদের মৌনতাকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে।
গত কয়েক মাসে যা ধ্বংস হয়েছে তা কেবল অবকাঠামো নয়; বরং এটি ইসরাইলের প্রচারিত সেই সাজানো গল্পের কঙ্কাল। জায়নবাদ আজ পশ্চিমা শক্তি ও মানুষের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। অ্যান্টিসেমিটিজম তকমা পাওয়ার ভয় এখন কেবল উপহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ইসরাইল আজ বিশ্বের কাছে একটি বিচ্ছিন্ন ও ঘৃণিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। গাজার এই ধ্বংসলীলা ইসরাইলকে একটি গণহত্যাকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মতো যে দুর্ভেদ্য দুর্গগুলো একসময় ইসরাইলের নিঃশর্ত সমর্থক ছিল সেখানেও এখন ফাটল ধরেছে। আইপ্যাকের মতো প্রভাবশালী লবিং গ্রুপগুলোও আর ভিন্নমতকে দমন করতে পারছে না। যে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) কর্তৃক ‘সম্ভাব্য গণহত্যা’ চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হয় তার আর কোনো নৈতিক উত্তরাধিকার থাকে না। জায়নবাদ আজ তা-ই করেছে যা কোনো শত্রু করতে পারেনি। এটি নিজের হাতে নিজের তৈরি মিথকে গ্রাস করেছে। ইতিহাসের বিচারক অবশেষে তার খাতা খুলেছেন এবং সেখানে প্রতিটি শিশুর লাশ আর প্রতিটি ইটের হিসাব লেখা হচ্ছে। যা কোনো ঝানু কূটনীতিক বা সুন্দর বক্তৃতার মাধ্যমে আর আড়াল করা সম্ভব নয়।