পশ্চিমতীরে বর্ণবাদী আচরণ করছে ইসরাইল : জাতিসঙ্ঘ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • গাজায় ইসরাইলপন্থী মিলিশিয়ার হামলায় নিহত ২
  • গাজায় সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখায় ইসরাইলকে নিন্দা
  • ২ বছর পর গাজায় শোকের মধ্যেই বড়দিন পালন করল খ্রিষ্টানরা

জাতিসঙ্ঘ গতকাল বুধবার জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বিভাজন আরো তীব্র হচ্ছে। সংস্থাটি দেশটিকে এ ‘অ্যাপার্টহেইড বা বর্ণবাদী ব্যবস্থা’ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার দফতরের নতুন রিপোর্টে বলা হয়েছে, দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘পদ্ধতিগত বৈষম্য’ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভয়াবহভাবে বেড়েছে। এ খবর জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া।

জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টার্ক এক বিবৃতিতে বলেন, ‘পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে পদ্ধতিগতভাবে দমিয়ে রাখা হচ্ছে। পানি পাওয়া, স্কুলে যাওয়া, হাসপাতালে ছুটে যাওয়া, পরিবার বা বন্ধুদের সাথে দেখা করা কিংবা জলপাই সংগ্রহ- জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র ইসরাইলি বৈষম্যমূলক আইন ও নীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।’ তিনি আরো বলেন, ‘এটি এক ধরনের জাতিগত বৈষম্য ও বিভাজন, যা অতীতে দেখা অ্যাপার্টহেইড ব্যবস্থার সাথে মিলে যায়।’ জাতিসঙ্ঘের সাথে যুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা আগে এ পরিস্থিতিকে ‘অ্যাপার্টহেইড’ বলেছেন। তবে এবারই প্রথম কোনো জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার প্রধান এ শব্দ ব্যবহার করলেন।

বাড়ছে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা

রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের ও ফিলিস্তিনিদের জন্য আলাদা আইন ও নীতি প্রয়োগ করছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের জমি বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে, সম্পদে প্রবেশাধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে। তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং সামরিক আদালতে বিচার চলছে, যেখানে ন্যায্য বিচারের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। টার্ক বুধবার দাবি জানান, ইসরাইলকে অবশ্যই সব বৈষম্যমূলক আইন, নীতি ও প্রথা বাতিল করতে হবে।

জাতিসঙ্ঘের দফতর জানিয়েছে, এ বৈষম্য আরো বেড়েছে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায়। অনেক ক্ষেত্রে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে এসব হামলা হয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমতীরে পাঁচ লাখের বেশি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছে। এ অঞ্চল ১৯৬৭ সাল থেকে দখলকৃত এবং এখানে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি বাস করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সহিংসতা বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে তা আরো তীব্র হয়। তখন থেকে ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীরা পশ্চিমতীরে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। এর মধ্যে অনেক সাধারণ মানুষ রয়েছে।

দায়মুক্তির সংস্কৃতি

রিপোর্টে বলা হয়েছে, গাজাযুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ বেআইনি শক্তি প্রয়োগ, নির্বিচারে আটক ও নির্যাতন আরো বাড়িয়েছে। নাগরিক সমাজ দমন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাধা এবং চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে পশ্চিমতীরে মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহভাবে অবনতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেআইনি বলে বিবেচিত বসতি সম্প্রসারণ দ্রুত বেড়েছে। একই সাথে ফিলিস্তিনিদের হত্যাকাণ্ড ঘটছে প্রায় সম্পূর্ণ দায়মুক্তির সাথে। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের ওপর এক হাজার ৫০০ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ মাত্র ১১২টি তদন্ত শুরু করেছে। এর মধ্যে কেবল একটি দণ্ড হয়েছে।

হাজার হাজার ফিলিস্তিনি এখনো ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের হাতে নির্বিচারে বন্দী রয়েছে। বেশির ভাগই অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই তথাকথিত ‘প্রশাসনিক আটক’-এ রয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এ বিভাজন ও বৈষম্য স্থায়ী করার উদ্দেশ্য রয়েছে, যাতে ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন ও আধিপত্য বজায় থাকে। জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, এটি আন্তর্জাতিক বর্ণবৈষম্যবিরোধী কনভেনশন লঙ্ঘন করছে, যা জাতিগত বিভাজন ও অ্যাপার্টহেইড নিষিদ্ধ করে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার দফতর বুধবার ইসরাইলকে আহ্বান জানিয়েছে, দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে বেআইনি উপস্থিতি সরিয়ে নিতে, সব বসতি ভেঙে ফেলতে এবং বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে দিতে। একই সাথে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সম্মান করতে।

গাজায় সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখায় ইসরাইলকে নিন্দা

মার্কিনভিত্তিক অলাভজনক সংগঠন ফরেন প্রেস অ্যাসোসিয়েশন (এফপিএ) ইসরাইল সরকারের প্রতি গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গাজায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের স্বাধীন প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখায় গতকাল মঙ্গলবার এ নিন্দা জানানো হয়। খবর আলজাজিরার।

এফপিএ এক বিবৃতিতে জানায়, ‘সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে গাজায় প্রবেশের সুযোগ দেয়ার পরিবর্তে সরকার আবারো আমাদের বাইরে আটকে রেখেছে। এটি এমন সময়ে ঘটছে যখন যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে।’ ২০২৩ সালে গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইল আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের স্বাধীন প্রবেশাধিকার বন্ধ রেখেছে। সীমিত সংখ্যক সাংবাদিককে কেবল সেনা পাহারায় প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে। ইসরাইলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, গত রোববার সরকার সুপ্রিম কোর্টকে বলেছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে এ নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা উচিত। এফপিএ জানিয়েছে, তারা আগামী দিনে আদালতে শক্তিশালী জবাব দাখিল করবে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা নিশ্চিত আদালত ন্যায়বিচার দেবে, কারণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জনগণের জানার অধিকার এবং মুক্ত গণমাধ্যমের মৌলিক নীতিগুলো বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে।’

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয় জানায়, ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি গণহত্যায় দুই বছরে অন্তত ২৫৭ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলি সেনারা শত শত লঙ্ঘন করেছে। এতে ৪২০ জন নিহত এবং এক হাজার ১৮৪ জন আহত হয়েছেন। দুই বছরের যুদ্ধ শেষে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এ যুদ্ধে ইসরাইল প্রায় ৭১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যা করেছে, যাদের অধিকাংশ নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজারেরও বেশি মানুষ। গাজা উপত্যকা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

গাজায় ইসরাইলপন্থী মিলিশিয়ার হামলায় নিহত ২

এক ইসরাইল-সমর্থিত ফিলিস্তিনি মিলিশিয়া বুধবার দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ গাজায় দুই হামাস সদস্যকে হত্যা করেছে। ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোকে শক্তিশালী করার পর এটি হামাসের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া। জনপ্রিয় ফোর্সেস নামে পরিচিত ওই সশস্ত্র গোষ্ঠী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা রাফাহ এলাকায় অভিযান চালায়। এতে দুই হামাস সদস্য নিহত হন এবং একজনকে বন্দী করা হয়। তারা একটি ছবি প্রকাশ করেছে, যা নিহতদের একজনের বলে দাবি করা হয়েছে।

হামাস এসব গোষ্ঠীকে ‘সহযোগী’ আখ্যা দিয়ে থাকে। তবে এ ঘটনায় তারা কোনো মন্তব্য করেনি। রয়টার্সও স্বাধীনভাবে এ দাবি যাচাই করতে পারেনি। রাফাহ বর্তমানে ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পড়েছে, যা অক্টোবরের ইসরাইল-হামাস চুক্তির অংশ। জনপ্রিয় ফোর্সেস গোষ্ঠীটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হামাসবিরোধী বেদুইন নেতা ইয়াসের আবু শাবাব। ধারণা করা হয়, ইসরাইলি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এটি সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী। গত ডিসেম্বর এক পারিবারিক বিরোধে আবু শাবাব নিহত হন। এরপর তার সহযোগী গাসান দুহিন নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। অক্টোবরের চুক্তির পর থেকে এ গোষ্ঠী ও অন্যরা নতুন সদস্য সংগ্রহ করছে। এ ধরনের গোষ্ঠীর উত্থান হামাসের ওপর চাপ বাড়িয়েছে এবং বিভক্ত গাজাকে স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা জটিল করে তুলেছে। স্থানীয় জনগণের কাছে তারা অজনপ্রিয়, কারণ তারা ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।

গাজার প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ হামাস নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বসবাস করছে। হামাস সেখানে পুনরায় শক্ত অবস্থান তৈরি করছে এবং চারটি সূত্র জানিয়েছে, তারা এখনো হাজারো যোদ্ধাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, যদিও যুদ্ধে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে ইসরাইল এখনো গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, যেখানে হামাসবিরোধীরা সক্রিয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা ধীরগতিতে এগোচ্ছে, ফলে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো তাৎক্ষণিক সম্ভাবনা নেই। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গত জুনে স্বীকার করেছিলেন, ইসরাইল হামাসবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করেছে। তবে এরপর থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। জনপ্রিয় ফোর্সেস দাবি করেছে, তারা ইসরাইল থেকে কোনো সহায়তা নেয় না।

২ বছর পর গাজায় শোকের মধ্যেই বড়দিন পালন করল খ্রিষ্টানরা

গাজা উপত্যকায় অর্থোডক্স খ্রিষ্টানরা দুই বছরের বেশি সময় পর প্রথমবার বড়দিনের প্রার্থনা করেছেন। মঙ্গলবার রাতে গাজা সিটির সেন্ট পোরফিরিয়াস গ্রিক অর্থোডক্স চার্চে প্রার্থনার পাশাপাশি বড়দিনের গাছ আলোকিত করা হয়। ইসরাইলের ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়ার পরও এই আয়োজন করা হয়।

গাজার প্যাট্রিয়ার্কাল ভিকার মেট্রোপলিটন আলেক্সিওস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই বছরের বড়দিন নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে। আমরা চাই আগামী বছর হোক যন্ত্রণার অবসান, গাজার আরোগ্য এবং প্রতিটি ঘরে শান্তির প্রত্যাবর্তন।’ তিনি আরো বলেন, বড়দিনের গাছ কেবল সাজসজ্জা নয়, বরং এটি ছিল জীবনের প্রতি বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং শান্তির পুনর্জন্মের প্রার্থনা। পশ্চিমা ক্যালেন্ডার অনুসারে বড়দিন পালিত হয় ২৪ ডিসেম্বর রাত থেকে, আর পূর্বাঞ্চলীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৬ জানুয়ারি। গাজার খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ও ইসরাইলি হামলার শিকার হয়েছে। ফিলিস্তিনি সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অন্তত ২০ জন খ্রিষ্টান নিহত হয়েছেন এবং তিনটি চার্চে ইসরাইলি সেনারা বোমা মেরেছে। বিশ্বের প্রাচীনতম খ্রিষ্টান চার্চগুলোর একটি সেন্ট পোরফিরিয়াস চার্চও একাধিকবার ইসরাইলি হামলার শিকার হয়। ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবরের এক ভয়াবহ হামলায় চার্চে আশ্রয় নেয়া অন্তত ১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন।