বাংলাদেশ ও নেপালের সাথে ভারতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ

ডিপ্লোম্যাট বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

নেপাল ও বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তা নয়াদিল্লিকে তার দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ করে দিয়েছে।

৩৫ বছর বয়সী র‌্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া বলেন্দ্র শাহের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ নেপালের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনিই এই পদে অধিষ্ঠিত সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি।

নেপালের আগে বাংলাদেশে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একটি সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এর আগে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণবিক্ষোভে দীর্ঘদিনের শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল।

সব মিলিয়ে, ভারতের প্রতিবেশী দেশ দু’টির এই নতুন সরকারগুলো অতীতের ধারা থেকে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

বাংলাদেশে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই ভারত একজন ঊর্ধ্বতন বাংলাদেশী সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা, মেজর জেনারেল কায়সার রশিদ চৌধুরীকে আতিথেয়তা প্রদান করে। আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানসহ আরো অনেকের ভারত সফর প্রত্যাশিত। এবং সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে, ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যে ভারত বাংলাদেশে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পাঠিয়েছে।

এদিকে, নয়াদিল্লি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর (বিজেআই) সাথে যোগাযোগ করেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে সহযোগিতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানপন্থী হিসেবে পরিচিত বিজেআই এখন বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল। মনে হচ্ছে, পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ভারত জামায়াতের সাথে সমঝোতা করতে ইচ্ছুক। ‘ভারতপন্থী’ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর যে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল, তা স্বাভাবিক করতে দিল্লি ও ঢাকা আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।

১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন এমন একটি বিষয় যার প্রতি দিল্লির অবিলম্বে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া, ভারতবিরোধী মনোভাব প্রশমিত করতে বাংলাদেশের জনগণের কাছে পৌঁছানোর উপায় ভারতকে খুঁজে বের করতে হবে।

হাসিনার শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) ভারত বাংলাদেশের সাথে জ্বালানি ও বাণিজ্য থেকে শুরু করে জনগণের সাথে সম্পর্ক পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে তার অবস্থান জোরদার করেছিল। নয়াদিল্লি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ বা মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে সতর্ক ছিল; ২০১৩, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বহুলাংশে একতরফা নির্বাচনে নয়াদিল্লি চোখ বন্ধ রেখেছিল, যে নির্বাচনে হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন। একইভাবে, হাসিনাও ভারতে মুসলিম-বিরোধী সহিংসতা নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত ছিলেন।

সুতরাং, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি বাংলাদেশের সাথে দিল্লির সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ধাক্কা ছিল। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক আরো খারাপ হয়। সরকার বারবার হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের দাবি জানায়, যা দিল্লি উপেক্ষা করে। এই বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে প্রভাবিত করে এবং বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাবকে উসকে দেয়। ভারতের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক গভীর করার জন্য ইউনূসের প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘু সদস্যদের ওপর হামলা উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছিল।

বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্দেশ্যে ভারত ঢাকায় একটি নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতায় আসার অপেক্ষা করছিল। প্রকৃতপক্ষে, যখন এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে বিএনপি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতবে, ভারত দলটির সাথে যোগাযোগ শুরু করে; পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে ডিসেম্বর ২০২৫-এ ঢাকা সফর করেন এবং তার ছেলে ও ভাবী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে দেখা করেন।

গত এক দশক ধরে নেপালের সাথে ভারতের সম্পর্ক সমস্যাপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে যখন কেপি শর্মা ওলি কাঠমান্ডুতে ক্ষমতায় ছিলেন। ২০১৫ সালে, যখন নেপাল একটি নতুন সংবিধান উন্মোচন করে, তখন নয়াদিল্লি আশঙ্কা করেছিল যে এটি মধেসিদের মধ্যে অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলতে পারে। মধেসিরা হলেন দক্ষিণ নেপালের ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী নেপালি জাতিগোষ্ঠী। এর পরপরই ভারত-বিরোধী মনোভাব তীব্র হয়ে ওঠে, কারণ নেপালের ওপর জ্বালানি অবরোধে ভারতকে সমর্থন করতে দেখা যায়। সম্পর্ককে উত্তপ্ত করে তোলা অন্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল বিতর্কিত লিপুলেখ অঞ্চলে নেপালের ভূখণ্ডের ওপর দাবি উত্থাপন, চীনের সাথে ওলির উষ্ণ সম্পর্ক এবং ভারতের বিতর্কিত নতুন অগ্নিপথ সামরিক নিয়োগ প্রকল্প, যা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত নেপালি গোর্খাদের জীবিকার নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করেছিল।

গত বছর গণবিক্ষোভে ওলি সরকারের পতন হলে, দিল্লি তার বিদায়ে স্বস্তি পেয়েছিল। যদিও শাহের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ভারতের জন্য সম্পর্ক নতুন করে লেখার একটি সুযোগ। নয়াদিল্লিকে অবশ্যই সতর্কতার সাথে এগোতে হবে। নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রীর তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন রয়েছে, যারা দ্রুত ফলাফল প্রত্যাশা করবে।

নতুন সরকার যদি তরুণদের আকাক্সক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে তা ভারতবিরোধী বিক্ষোভ উসকে দিতে পারে, যেমনটা দেশের অভ্যন্তরে চাপের মুখে পূর্ববর্তী সরকারগুলো করেছিল।

গত এক দশকে ভারত নেপালে সেচ ও পানীয় জল প্রকল্প এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কর্মসূচিসহ বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। নেপালে ইতোমধ্যেই একটি প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে ভারতের উচিত তার বেসরকারি সংস্থাগুলোকে নেপালে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করা। দেশটি নেপাল থেকে আরো বেশি জলবিদ্যুৎও ক্রয় করতে পারে।

নেপাল ও বাংলাদেশ উভয়ের সাথেই সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে ভারতকে চীনের কথা বিবেচনায় রাখতে হবে। চীন সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, কারণ এই দেশ দু’টির প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের জন্য তার বৃহত্তর আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে। তা ছাড়া, এই দেশগুলোতে ভারতকে যে ধরনের ব্যাপক বৈরিতার সম্মুখীন হতে হয়, চীনকে তা হতে হয় না।

তবে, ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের অনুকূলে। এ ছাড়া, শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বন্ধন বিদ্যমান, যা নেপাল ও বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে ভারতের কাজে লাগানো উচিত।