আলোচনায় প্রস্তুত হামাস, আগামী সপ্তাহে যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত ট্রাম্পের

তবে হামাস পরিষ্কারভাবে বলেছে, এই আলোচনা স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে উপনীত হবে এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে। সংগঠনটি জানিয়েছে, অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর সাথে পরামর্শের ভিত্তিতেই তারা এই অবস্থান নিয়েছে।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
Gaza-Destruction
গাজার ধ্বংসস্তূপ | সংগৃহীত

  • ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ারে’ ৩১ ইসরাইলি সেনা নিহত
  • ৯ ত্রাণপ্রার্থীসহ আরো ৫৬ ফিলিস্তিনিকে হত্যা
  • শিশুখাদ্য প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত

গাজায় যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে মার্কিন প্রস্তাব নিয়ে অবিলম্বে আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। হামাসের মিত্র সংগঠন ইসলামিক জিহাদও যুদ্ধবিরতি আলোচনায় অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে তারা পরিষ্কারভাবে বলেছে, এই আলোচনা স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে উপনীত হবে এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে। সংগঠনটি জানিয়েছে, অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর সাথে পরামর্শের ভিত্তিতেই তারা এই অবস্থান নিয়েছে।

এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হামাসের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া ভালো খবর। তিনি সাংবাদিকদের জানান, পরবর্তী সপ্তাহের মধ্যেই একটি যুদ্ধবিরতির চুক্তি সম্ভব হতে পারে। যদিও তিনি স্পষ্ট করেন যে, এখনো আলোচনার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে তাকে বিস্তারিত অবহিত করা হয়নি।

এর আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, গাজায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি হতে পারে এবং প্রয়োজনে এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ ২১ মাস ধরে চলা গাজা সঙ্ঘাতের একটি টেকসই অবসান আনতে যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে সব পক্ষের আন্তরিকতা ও যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি মেনে চলার প্রতিশ্রুতির ওপর।

হামাস জানিয়েছে, “তারা মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের কাছে ইতিবাচক জবাব জমা দিয়েছে এবং এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা শুরুর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।” একজন হামাস কর্মকর্তা বলেন, সংগঠনটি ইসরাইলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ও একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির নিশ্চয়তা চায়। আগামীকাল সোমবার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন। তার এই সফরের আগেই শান্তি প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি এসেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

নতুন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে যা আছে : কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, গাজায় যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে মার্কিন প্রস্তাবের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তাদের হাতে এসেছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬০ দিনের জন্য একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির নিশ্চয়তা দেবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এই সময়সীমার মধ্যে একাধিক মানবিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই হামাস ১০ জীবিত ইসরাইলিকে মুক্তি দেবে। একইসাথে, ইসরাইলি সেনা বা নাগরিক পরিচয়ে আটক ১৮ জনের লাশ ফিরিয়ে দেবে হামাস। গাজার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি সহায়তা পৌঁছানোর পথ উন্মুক্ত থাকবে। এই সহায়তা বিতরণে জাতিসঙ্ঘ, রেড ক্রিসেন্টসহ আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর নির্ধারিত চ্যানেল ব্যবহার করা হবে।

ইসরাইলি বাহিনী তাদের সব ধরনের আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান বন্ধ রাখবে। প্রতিদিন ১০ ঘণ্টার জন্য অন্যান্য সামরিক তৎপরতা ও নজরদারি কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। যুদ্ধবিরতির সময় ইসরাইলি সেনাবাহিনী গাজার উত্তরাঞ্চল, নেতজারিম করিডোর এবং দক্ষিণাঞ্চলে তাদের বাহিনী নতুনভাবে অবস্থান নেবে বা পুনঃমোতায়েন করবে। এই প্রস্তাবের আওতায় একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথে আলোচনা শুরুর কথাও বলা হয়েছে, যা অবিলম্বে শুরু হতে পারে।

লাশের সংখ্যা বাড়ছে : যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর ইঙ্গিত পাওয়া গেলেই গাজা উপত্যকাজুড়ে আক্রমণ তীব্র করা ইসরাইলি বাহিনীর একটি পরিচিত কৌশল। দেইর আল বালাহ থেকে আলজাজিরাকে বলছিলেন সংবাদদাতা তারেক আবু আযম। গাজা হাসপাতালের সূত্র অনুযায়ী ভোর থেকে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে কমপক্ষে ৫৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৯ জন ত্রাণপ্রার্থীও রয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে গত ২৪ ঘণ্টায় গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে কমপক্ষে ৭০ জনের লাশ এবং ৩৩২ জন আহত ব্যক্তি এসেছেন।

সমগ্র ফিলিস্তিন জুড়ে বিভিন্ন হামলার খবর পাওয়া গেছে। নাসের মেডিক্যাল কমপ্লেক্সের মতে, দক্ষিণ গাজা উপত্যকার খান ইউনুস শহরের পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত তাঁবুতে ইসরাইলি গোলাবর্ষণে কমপক্ষে ছয়জন নিহত এবং ১০ জনেরও বেশি আহত হয়েছে। শহরের জেইতুন পাড়ায়, ইসরাইলি বাহিনী আল-শাফি স্কুলে বোমাবর্ষণ করে কমপক্ষে পাঁচজন নিহত এবং আরো অনেকে আহত হয়েছে।

চিকিৎসা সূত্রের মতে, গাজা শহরের কাছে একটি পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে ইসরাইলি হামলায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছে। নাসের হাসপাতালের চিকিৎসা সূত্র আলজাজিরাকে জানিয়েছে, রাফাহের উত্তরে একটি সাহায্য কেন্দ্রের কাছে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে তিন শিশুসহ ৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

গত ১৮ মার্চ ইসরাইল হামাসের সাথে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করার পর থেকে কমপক্ষে ৬,৭৮০ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২৩ হাজার ৯১৬ জনেরও বেশি আহত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে, ইসরাইলি বাহিনী কমপক্ষে ৫৭ হাজার ৩৩৮ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং এক লাখ ৩৫ হাজার ৯৫৭ জনকে আহত করেছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে আরো হাজার হাজার।

নিজেদের গুলিতে নিহত ৩১ ইসরাইলি সেনা : গাজায় চলমান যুদ্ধে নিজেদের ভুলবশত ছোড়া গুলিতে (ফ্রেন্ডলি ফায়ার) অন্তত ৩১ ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছে। গত শুক্রবার ইসরাইলি আর্মি রেডিওর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজায় ‘স্থল অভিযান’ শুরুর পর থেকে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ইসরাইলের ৪৪০ জন সেনা নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭২ জন অভিযান পরিচালনাসংক্রান্ত দুর্ঘটনায় নিহত হয়, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ১৬ শতাংশ।

এ ছাড়া সেনাদের মধ্যে ৩১ জন নিজেদের মধ্যে ভুলবশত ছোড়া গুলিতে, ২৩ জন গোলাবারুদ সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায়, সাতজন সাঁজোয়া যানের চাকায় পিষ্ট হয়ে ও ছয়জন অজ্ঞাত গুলিবর্ষণের ঘটনায় নিহত হয়েছে। ইসরাইলি আর্মি রেডিওর খবরে আরো বলা হয়, গত ১৮ মার্চ ইসরাইল গাজায় সামরিক অভিযান আবার শুরু করার পর রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সেখানে ইসরাইলের ৩২ সেনা নিহত হয়েছে।

এর মধ্যে শুধু দু’জন ‘অভিযান পরিচালনা-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায়’ নিহত হয়েছে। এ ছাড়া ইসরাইলের আরো পাঁচ সেনা কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে বলেও খবরে বলা হয়েছে। এর মধ্যে উঁচু জায়গা থেকে পড়ে যাওয়া এবং প্রকৌশল সরঞ্জাম ব্যবহারে অসাবধানতার কারণও রয়েছে। এ ধরনের একটি ঘটনা গত বৃহস্পতিবার রাতেও ঘটেছে। তবে খবরে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়নি।

ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইল। এর প্রায় এক মাস পর ওই উপত্যাকায় স্থল অভিযান শুরু করে ইহুদিবাদী সেনারা। রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত গাজার এই যুদ্ধে ৮৮২ সেনা ইসরাইলি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে স্থল অভিযানে নিহত হয়েছে ৪৪০ সেনা। আর সব মিলিয়ে আহত হয়েছে ছয় হাজার ৩২ সেনা।

শিশুখাদ্য প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত : ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনী এখনো শিশুখাদ্য প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটিতে গত ২ মার্চ থেকে সব ধরনের মানবিক সহায়তার প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। এতে গাজায় ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গতকাল শনিবার আলজাজিরা এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজার ফিল্ড হাসপাতালগুলোর পরিচালক মারওয়ান আল-হামাস জানিয়েছেন, গাজায় স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

তিনি আলজাজিরাকে বলেছেন, জ্বালানির ঘাটতির কারণে গাজার হাসপাতালগুলোর পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে পড়েছে। ইসরাইলি দখলদার বাহিনী এখনো গাজা উপত্যকায় শিশুখাদ্য প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘সীমিত সম্পদ নিয়ে আমরা কাজ চালাতে বাধ্য হচ্ছি। ফলে নিহত ও আহতদের বিপুলসংখ্যক চাপ সামাল দেয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।’