অনলাইন কেনাকাটায় জালিয়াতি বিস্তারে বাড়ছে ভোক্তার ঝুঁকি
প্রধান ফাঁদ ‘ব্রাশিং স্ক্যাম’
সময় ও স্রোতের সাথে সমান্তরালভাবে চলছে প্রযুক্তির অগ্রগতি। এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ, বদলে যাচ্ছে জীবনধারা। এক সময় ঘরে বসে পণ্য কেনাকাটার কথা ভাবাই যেত না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে অনলাইনে কেনাকাটা এখন এতটাই সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, আমরা এতে বেশ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। বাজার বা মার্কেটে না গিয়ে ঘরে বসে যখন এক ক্লিকেই পছন্দসই পণ্য হাতে তখন মানুষ অধিক হারে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে অনলাইন কেনাকাটায়।
Printed Edition
হাবিবুল বাশার
সময় ও স্রোতের সাথে সমান্তরালভাবে চলছে প্রযুক্তির অগ্রগতি। এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ, বদলে যাচ্ছে জীবনধারা। এক সময় ঘরে বসে পণ্য কেনাকাটার কথা ভাবাই যেত না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে অনলাইনে কেনাকাটা এখন এতটাই সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, আমরা এতে বেশ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। বাজার বা মার্কেটে না গিয়ে ঘরে বসে যখন এক ক্লিকেই পছন্দসই পণ্য হাতে তখন মানুষ অধিক হারে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে অনলাইন কেনাকাটায়।
২০২৬ সালে এসে অনলাইন কেনাকাটা বা ই-কমার্স খাত দেশের অর্থনীতিতে এক অপরিহার্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক ডাটাবেজ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় এক লাখের বেশি অনলাইন উদ্যোক্তা সক্রিয় রয়েছেন, যা প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির ঝকঝকে আবরণের নিচে লুকিয়ে আছে ‘ব্রাশিং স্ক্যাম’ ও গভীর ডিজিটাল জালিয়াতির ফাঁদ।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ম্যাকাফির ২০২৬ সালের গ্লোবাল থ্রেট রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে ‘ব্রাশিং স্ক্যাম’ বর্তমানে ই-কমার্স খাতের এক নম্বর ঝুঁকি। এই প্রক্রিয়ায় অসাধু বিক্রেতারা সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে ভুয়া অর্ডার তৈরি করে। এরপর নিজেরাই সেই পণ্যের অনুকূলে ‘ফাইভ স্টার’ রিভিউ দেয়। এর ফলে আলীএক্সপ্রেস বা অ্যামাজনের মতো বড় মার্কেটপ্লেসে নি¤œমানের বা অস্তিত্বহীন পণ্যগুলো কৃত্রিমভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সাধারণ ক্রেতারা রেটিং দেখে বিভ্রান্ত হয়ে অর্ডার করেন এবং প্রতারিত হন।
তথ্যপ্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে প্রতারকরা এখন ব্যবহার করছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। বিখ্যাত ব্যক্তিদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে পুঁজি করে তৈরি করা হচ্ছে ভুয়া বিজ্ঞাপন। সম্প্রতি ফেসবুকে এমন অসংখ্য পেজ দেখা যাচ্ছে, যেখানে জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার ড. মিজানুর রহমান আজহারী, ডা: জাকির নায়েক থেকে শুরু করে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের ছবি ও কণ্ঠস্বর এআইয়ের মাধ্যমে ক্লোন করে ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে।
এই ভিডিওগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের গুণগান গাইতে দেখা যায় তাদের, যা দেখে সাধারণ ধর্মপ্রাণ ও সাধারণ ব্যবহারকারীরা কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই পণ্য অর্ডার করছেন। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত আবেগকে সরাসরি আঘাত করছে।
অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণার জাল কতটা বিস্তৃত, তা ফুটে ওঠে ভুক্তভোগীদের কথায়। শাফিন নামের এক যুবক নয়া দিগন্তকে জানান, তিনি একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পণ্য পছন্দ করে অর্ডার দেন। বিজ্ঞাপনের সত্যতা যাচাই না করেই তিনি ১৫টি পণ্যের বিপরীতে ৩০০ টাকা অগ্রিম পেমেন্ট করেন। কিন্তু টাকা পাঠানোর পরপরই সেই পেজ কর্তৃপক্ষ তার নম্বর ব্লক করে দেয়।
একই অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন নূর হোসেন। চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে তিনি ২০০০ টাকা অগ্রিম পরিশোধ করেন। নূর হোসেন বলেন, ‘অনলাইনে মানুষ বিশ্বাস করে কেনাকাটা করতে চায়, কিন্তু এই ধরনের জালিয়াতি আমাদের বিশ্বাস ভেঙে দিচ্ছে। ই-কমার্স খাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।’
প্রতারণার শিকার হওয়া থেকে বাদ যাচ্ছেন না নারীরাও। ফারজানা আক্তার নামে এক ভুক্তভোগী জানান, তিনি কম দামে থ্রি-পিস কেনার লোভনীয় অফার দেখে ফাঁদে পড়েন। তাকে বলা হয়েছিল, তিনটি থ্রি-পিসের জন্য ৩০ শতাংশ অগ্রিম টাকা দিলে বাকি পণ্য হাতে পাবেন । কিন্তু অগ্রিম টাকা দেয়ার পর বিক্রেতার আর কোনো হদিস পাননি তিনি। ফারজানা আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, ‘অনলাইনে সবচেয়ে বেশি প্রতারণা হয় মহিলাদের সাথে। অনেক কিছু না বুঝেই তারা এই ফাঁদে পা দেয়। সরকারের উচিত এসব ভুয়া পেজ বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া।’
তরুণ উদ্যোক্তা নুর সাঈদ নয়া দিগন্তকে জানান, ‘কোনো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান যদি অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করতে বলে, তবে তা প্রতারণার ফাঁদ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ পদ্ধতিতে পণ্য কেনাবেচা করাই সঠিক পন্থা। যদিও অনেক সময় ক্রেতা পণ্য গ্রহণ না করলে বা রিটার্ন দিলে বিক্রেতাকে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের তথ্য মতে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই অনলাইন কেনাকাটা নিয়ে প্রায় ১২ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। অধিদফতরের তথ্যানুসারে, ৪০ শতাংশ অভিযোগই হলো অর্ডার নিয়ে পণ্য না দেয়া অথবা ছবির সাথে পণ্যের মিল না থাকা।
অন্যদিকে, সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের সূত্র জানায়, ভুয়া ফেসবুক পেজ খুলে ‘ক্যাশ অন ডেলিভারির নামে অগ্রিম ডেলিভারি চার্জ বা বুকিং মানি নিয়ে গ্রাহকের নম্বর ব্লক করে দেয়ার ঘটনা গত বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ডিজিটাল বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নেপথ্যের নেটওয়ার্কগুলো ধ্বংস করা এবং কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়, বরং এটি আরো ভয়াবহ রূপ নেবে।
বাজার বিশ্লেষক এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় প্ল্যাটফর্মগুলো বিক্রেতাদের যথাযথ ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন না করায় এই সঙ্কটের সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও সরকার ইউনিক বিজনেস আইডি বাধ্যতামূলক করেছে, কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় হাজার হাজার ক্ষুদ্র পেজ এখনো কোনো নজরদারির আওতায় নেই। এ ছাড়া, পেমেন্ট গেটওয়েতে ‘এসক্রো’ সিস্টেমের শতভাগ বাস্তবায়ন না হওয়ায় গ্রাহকের অর্থ ফেরত পাওয়া এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল আইন দিয়ে এই মহামারী রোখা সম্ভব নয়। গ্রাহকদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো এবং পণ্য কেনার আগে সংশ্লিষ্ট পেজের স্বচ্ছতা ও রিভিউ যাচাই করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এআই-প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে আরো দক্ষ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।