অর্থনৈতিক কৌশল নিয়ে ড. তিতুমীর

‘সংখ্যাভিত্তিক’ পরিকল্পনার পরিবর্তে হবে বাস্তবভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক

Printed Edition
back-1
ব্রিফিংয়ে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এ সময় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো: জোনায়েদ সাকি উপস্থিত ছিলেন : নয়া দিগন্ত

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে বাস্তবভিত্তিক ও ভবিষ্যৎমুখী করার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। অতীতের মতো বাস্তবতা বিবর্জিত ও সংখ্যাভিত্তিক বয়াননির্ভর পরিকল্পনা নয়। বরং বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে নতুন অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন করা হবে। সেই সাথে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কৌশল ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা হবে। আর পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকী বলেছেন, আমরা চার বছরের মাথায় বাংলাদেশের চিত্রটা কিভাবে দেখব, আট বছরের মাথায় কিংবা ১০ বছরের মাথায় বাংলাদেশের চিত্রটা কোথায় যাবে, সেইটাই আসলে মূলত এই পরিকল্পনা স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমের মধ্যে জায়গা পাবে।

রাজধানীর শেরেবাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে বুধবার অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন নিয়ে উপদেষ্টা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে ড. তিতুমীর এই কথাগুলো বলেন। এতে বক্তব্য রাখেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো: জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন। উপস্থিত ছিলেন, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ প্রমুখ।

ড. তিতুমীর বলেন, ঋণনির্ভরতার পরিবর্তে মালিকানানির্ভর শিল্পায়ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তার প্রকৃত মূল্যায়নে কার্যকর সূচক তৈরি করা হবে। অতীতের বাস্তবতা বিবর্জিত পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমান সঙ্কট ও চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। প্রতিটি কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শেয়ারবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সংগ্রহের মাধ্যমে শিল্পায়নে উৎসাহিত করা হবে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতের সাফল্যের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তার প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়নের কার্যকর মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে। সামাজিক সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করার পরিকল্পনা, যা ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আমরা (বিএনপি) প্রতিবারই সরকার গঠনের পরে এই ধরনের সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু জনগণের যেহেতু সমর্থন আছে, জনগণের যেহেতু বৈধতা আছে, জনগণের যেহেতু আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের ইতিহাস আছে, আমরা প্রতিবারই দেখেছি যে প্রতিটি সঙ্কট থেকে উত্তরণ ঘটে আরেকটা নতুন উচ্চতায় গেছে। অতীতের দিকে যদি খেয়াল করেন তাহলে প্রতিটি বিএনপি সরকারের সময় ২ শতাংশীয় পয়েন্ট হারে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে।

উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অতীতে কোনো প্রকল্প ও পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত হয়নি। পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে হয়েছে। অতীতের সরকারের রেখে যাওয়া বর্তমান পরিকল্পনাগুলো কাজ করছে না। তিনি বলেন, আমরা অর্থনৈতিক শুমারিতে দেখেছি শিল্পের উৎপাদন নিম্নগামী। সব জায়গাতে একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি রেখে যাওয়া হয়েছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে বৈশি^ক সমস্যা। তিনি বলেন, অতীতে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, আমরা আর এমন কোনো পরিকল্পনা করতে চাই না যার বাস্তবায়নের কৌশল নেই। অতীতে অনেক পরিকল্পনা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন অর্থনৈতিক কৌশলে শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ নয়, তার সাথে বাস্তবায়ন পদ্ধতি, জবাবদিহিতা এবং জনগণের কাছে অগ্রগতি তুলে ধরার ব্যবস্থাও রাখা হবে। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি কাঠামো চাই যেখানে প্রতিটি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কৌশল স্পষ্ট থাকবে এবং সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। আমরা অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন চাই, যেখানে সবার প্রয়োজন ও চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা হবে। সরকার জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংস্কার ও পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে।

প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, পরিকল্পনার নাম বদলের কারণ হচ্ছে, আমাদের পরিস্থিতিটাকে এড্রেস করার চেষ্টা করা যায়। আমাদেরকে একটা পুনরুদ্ধার কিংবা ভঙ্গুরতাকে এড্রেস করতে হচ্ছে। যেটা পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে হবে। আবার আমাদেরকে ফিউচারটাও দেখতে হচ্ছে, সমৃদ্ধিতে আমরা আসলে কিভাবে যাবো। তিনি বলেন, চলমান প্রকল্পগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। মেগাপ্রকল্পগুলো নিয়ে একটা কমিটি করা হয়েছে। আগামী জুনে তারা তাদের প্রতিবেদন দেবেন। আমরা পতিত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে চাচ্ছি। তারপর পরিকল্পনা নেয়া হবে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সচিব ড. মনজুর হোসেন বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই অর্থনৈতিক কৌশলকে কেবল একটি সাধারণ প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং সমন্বিত পুনরুদ্ধার (রিকভারি), পুনর্গঠন (রিকনস্ট্রাকশন) এবং সংস্কার (রিফর্ম) প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি নির্বাচিত সরকারের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নেরই একটি অংশ। তিনি বলেন, আমরা আশা করছি, আগামী দুই মাসের মধ্যে খাসড়া কৌশলপত্র প্রস্তুত করতে পারব। পরবর্তীতে অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) মতামত নিয়ে ২-৩ মাসের মধ্যে চূড়ান্ত কৌশলপত্র প্রকাশ করা সম্ভব হবে।