ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি ও পশ্চিমতীর সংযুক্তি বৈধ করতে ইসরাইলের নতুন পদক্ষেপ
Printed Edition
আলজাজিরা
ফিলিস্তিনিরা মালিকানা প্রমাণ করতে না পারলে অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিশাল এলাকাকে ‘রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি’ হিসেবে দাবি করার একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে ইসরাইল সরকার। কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ, বিচারমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল ক্যাটজ এ প্রস্তাব পেশ করেন। তারা এটিকে বসতি সম্প্রসারণ ও জমির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এ পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের জমি কেড়ে নেয়া ও বাস্তুচ্যুতিকে বৈধ রূপ দেবে এবং কার্যত সংযুক্তিকরণের শামিল হবে।
এই সিদ্ধান্ত ‘জমির মালিকানা নিষ্পত্তি’ প্রক্রিয়া ফের শুরু করার পথ প্রশস্ত করল, যা ১৯৬৭ সালে ইসরাইল পশ্চিম তীর দখল করার পর থেকে স্থবির হয়ে ছিল। এর অর্থ কোনো একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে ইসরাইল যখন ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করবে, ওই ভূমির মালিকানার দাবিদারকে অবশ্যই নথিপত্র দাখিল করতে হবে। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে চলা দখলদারিত্বের কারণে ফিলিস্তিনিদের মালিকান প্রমাণের পক্ষে বাধা খুব বেশি। ফলে এই পদক্ষেপ হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে তাদের ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে।
গবেষণা অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের প্রায় ৭০ শতাংশ জমি নিবন্ধিত নয়। ফলে মালিকানা প্রমাণ করা ফিলিস্তিনিদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। এমনকি নিবন্ধিত জমির ক্ষেত্রেও প্রমাণের মানদণ্ড এত কঠিন যে অধিকাংশ ফিলিস্তিনি তা পূরণ করতে পারবেন না। সরকার চার বছরের মধ্যে ১৫ শতাংশ অনিবন্ধিত জমি নিবন্ধনের লক্ষ্য নিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন বিমকম ও পিস নাও বলছে, এ প্রক্রিয়া আসলে পশ্চিম তীরের পূর্ণ দখল। তারা বলেছে, ইসরাইল এমন নথি চাইছে যা শত বছরের পুরনো ব্রিটিশ ম্যান্ডেট বা জর্দান আমলের। অধিকাংশ ফিলিস্তিনি তা দেখাতে পারবেন না, ফলে জমি ইসরাইলের নামে নিবন্ধিত হবে। পূর্ব জেরুসালেমে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া একই ধরনের প্রক্রিয়ায় মাত্র ১ শতাংশ জমি ফিলিস্তিনিদের নামে নিবন্ধিত হয়েছে, বাকিটা ইসরাইলি রাষ্ট্র বা ব্যক্তির নামে গেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও ২০২৪ সালে রায়ে বলেছিল, ইসরাইলের দখল ও বসতি স্থাপন অবৈধ এবং দ্রুত শেষ করতে হবে।
ফিলিস্তিনি প্রশাসন ও হামাস এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা বলছে, এটি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং অধিকৃত জমিকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত করে চুরি ও ইহুদিকরণ চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা। এইভাবে ইসরাইলের সর্বশেষ পদক্ষেপ পশ্চিম তীরে তাদের নিয়ন্ত্রণ গভীর করছে, বসতি সম্প্রসারণকে বৈধতা দিচ্ছে এবং ফিলিস্তিনিদের জমির অধিকারকে আরো দুর্বল করছে।
ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্টের প্রশাসন এক বিবৃতিতে ইসরাইল সরকারের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে একে ‘উত্তেজনার তীব্রতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক আইনে সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ যা ‘কার্যত সংযুক্তিকরণ’ বলে বর্ণনা করেছে। তারা বিশ্ব সম্প্রদায়কে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদকে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছে।
ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসও ইসরাইলের এ পদক্ষেপের নিন্দা করেছে। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে ‘অধিকৃত পশ্চিম তীরের জমিগুলোকে তথাকথিত ‘রাষ্ট্রীয় ভূমি’ হিসেবে নিবন্ধিত করে চুরি ও ইহুদিকরণ করা হচ্ছে’ বলে অভিযোগ করেছে তারা। হামাস আরো বলেছে, “এটি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন যা ভূমিতে জোরপূর্বক বসতিস্থাপন ও ইহুদিকরণ চাপিয়ে দেয়ার একটি প্রচেষ্টা।” তারা অনুমোদনটিকে ‘একটি অবৈধ দখলদার শক্তির জারি করা একটি অকার্যকর ও বাতিল সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছে।
ইসরাইলের এই সিদ্ধান্ত অধিকৃত পশ্চিম তীরে তাদের নিয়ন্ত্রণ গভীর করার সর্বশেষ পদক্ষেপ। সম্প্রতি ইসরাইল পশ্চিম তীরের অবৈধ ইহুদি বসতিগুলোতে ব্যাপকভাবে নির্মাণকাজ সম্প্রসারিত করেছে, এসব বসতিগুলোকে বৈধতা দিয়েছে এবং অঞ্চলটির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে তাদের আমলাতান্ত্রিক নীতিমালায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে।
ইসরাইল সরকারের সর্বশেষ এ পদক্ষেপ অধিকৃত পশ্চিম তীরের ‘সি’ নামে পরিচিত এলাকায় কার্যকর হবে। ১৯৯০ সালে স্বাক্ষরিত অসলো চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিম তীরকে যে তিনটি এলাকায় বিভক্ত করা হয়েছিল এটি তার একটি। সি এলাকাটি পুরোপুরি ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আছে। হিসাব অনুযায়ী, এই এলাকাটিতে তিন লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি বসবাস করে। আর আশপাশের গ্রামগুলোতে থাকা এর চেয়েও বেশি ফিলিস্তিনি সি এলাকার কৃষি ও চারণভূমিগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা ও এটি ব্যায়বহুল হওয়ার কারণে এই এলাকার অধিকাংশ ফিলিস্তিনি নিজেদের জমির নিবন্ধন করাতে পারেননি।