আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ স্তর

Printed Edition
islami logo
আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ স্তর

ফাতিমা আজিজা

আধ্যাত্মিকতা বা ঝঢ়রৎরঃঁধষরঃু মন জগতের অতি উচ্চতর স্তরের একটি ধাপ। ইসলামে যাকে নফস বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। নিজের নফস আল্লাহর বান্দাদের সবচেয়ে বড় শত্রু বলে যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর এই শত্রুর সাথে জিহাদ করাকে বড় জিহাদ বলে রাসূল সা: ঘোষণা করেছেন।

আধ্যাত্মিকতা বা নফসের ধাপের মধ্যে আছে তিনটি ধাপ। নফসে আম্মারা, লাওয়ামা ও মুতমায়িন্নাহ।

সাধারণত নফসে আম্মারা বা খারাপ কাজে উদগ্রীবকারী আত্মা প্রতিটি মানুষেরই মজ্জাগত ও স্বভাবগত। সে মানুষকে মন্দ কাজে লিপ্ত হতে জোরদার আদেশ করে।

কিন্তু ঈমান, সৎকর্ম ও সাধনার বলে সে নফসে-লাওয়ামা হয়ে যায় এবং মন্দকাজ ও ত্রুটির কারণে অনুতপ্ত হতে শুরু করে। এটিকেই অনেকে বিবেক বলে। কিন্তু মন্দকাজ থেকে সে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয় না। অতঃপর সৎকর্মে উন্নতি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভে চেষ্টা করতে করতে যখন শরিয়তের আদেশ-নিষেধ প্রতিপালন তার মজ্জাগত ব্যাপার হয়ে যায় এবং শরিয়তবিরোধী কাজের প্রতি স্বভাবগত ঘৃণা অনুভব করতে থাকে, তখন এই নফসে মুতমায়িন্নাহ বা সন্তুষ্টচিত্ত উপাধি প্রাপ্ত হয়। এ ধরনের নফস যাদের অর্জিত হয় তারা দ্বীনি ব্যাপারে কোনো প্রকার সন্দেহ বা প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে মুক্ত হয়ে- ‘ক্বালবে সালিম’ বা সুস্থ হৃদয়ের অধিকারী হয়। আর এ সব লোকদের প্রশংসায় আল্লাহ বলছেন- ‘সে দিন উপকৃত হবে শুধু সে, যে আল্লাহর কাছে আসবে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে’ (সূরা আশ-শুআরা : ৮৮-৮৯)।

নফসে লাওয়ামা নফসের জগতের এমন একটি ধাপ যেটিকে নফসে মুমিনাহ বলে হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ তাফসির করেছেন আর বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম, মুমিন তো সর্বদা সর্বাবস্থায় নিজেকে ধিক্কারই দেয়। সৎকর্মসমূহেও সে আল্লাহর শানের মোকাবেলায় আপন কর্মে অভাব ও ত্রুটি অনুভব করে। (কুরতুবি) কারণ, আল্লাহর শানের হক পুরোপুরি আদায় করা সাধ্যাতীত ব্যাপার। ফলে তার দৃষ্টিতে ত্রুটি থাকে এবং তজ্জন্য নিজেকে ধিক্কার দেয়। পক্ষান্তরে অসৎ কাজ হলে মুমিনের কাছে এটা অত্যন্ত কঠোর হয়ে দেখা দেয় ফলে সে নিজেকে ধিক্কার দেয় (বাগভি)।

নফসে আম্মারার পর্যায় থেকে নফসে লাওয়ামাতে যখন বান্দা এসে যায়, এর পরে শুরু হয় নফসে মুতমায়িন্নার কাজ। প্রশ্ন আসে যে, আল্লাহর কাছে কোন মুহূর্তে একজন মুমিন আত্মা মুতমায়িন্নাহ বলে সম্বোধিত হবে। বলা হয় মৃত্যুকালে বলা হবে- ‘ইয়া-আইয়ুহান নাফসুল মুতমায়িন্নাহ’ বা হে প্রশান্ত আত্মা!

যখন কিয়ামতের দিন পুনরায় জীবিত হয়ে হাশরের ময়দানের দিকে যেতে থাকবে সে সময়ও বলা হবে। আল্লাহর আদালত যখন মানুষের হিসাব হবে তখনো এই সম্বোধন করা হবে। আর এই সম্বোধন দ্বারা রাব্বুল আলামিন নিশ্চিত করবেন, সে আল্লাহর রহমতের দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে (ইবনে কাসির)।

আত্মার আধ্যাত্মিকতার শেষ ধাপ তখনই আসবে যখন আল্লাহ প্রশান্ত আত্মা সম্বোধন করে বলবেন, ‘অতঃপর আমার বিশেষ বান্দাদের কাতারভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো’ (সূরা আল-ফজর : ২৯-৩০)। আল্লাহর কাছে যখন একজন বান্দা নেককার সৎ বান্দা হিসেবে গণ্য হবেন তখনই জান্নাতের আদেশ আসবে। এই কারণে যুগে যুগে সব নবী-রাসূল এবং ঈমানদার বান্দা আল্লাহর কাছে বিভিন্নভাবে দোয়া করেছেন এভাবে। সুলাইমান আলাইহিস সালাম দোয়া করেন, ‘এবং আপনার অনুগ্রহে আমাকে আপনার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের শামিল করুন’ (সূরা আন-নামল-১৯)।

আবার ইউসুফ আলাইহিস সালাম পেশ করেন, ‘আর আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের সাথে মিলিয়ে দিন’ (সূরা ইউসুফ-১০১)। এই আয়াতগুলো নির্দেশ করছে, সৎকর্মপরায়ণ বান্দারা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নিয়ামতের অন্তর্ভুক্ত। যা নবী-রাসূলরাও দোয়া করে চেয়ে নিয়েছেন। অতএব বুঝা গেল, জান্নাতের জন্য শুধু সৎ কাজই যথেষ্ট নয়; বরং আল্লাহর রহমতও দরকার হবে। রাসূল সা: বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি তার কর্মের ওপর ভরসা করে জান্নাতে যাবে না’ (বুখারি-৬০৯৮)।

লেখক : প্রাবন্ধিক