মিনি মুন

Printed Edition
Sahitto-4
মিনি মুন

যাকিয়া সুমি সেতু

প্রায় ৭০ বছর পর ইংল্যান্ড থেকে সুইজারল্যান্ডের মাউন্ট পিটালাসের চূড়ায় এসে আজ লুকার মনে হলো, যেন সে আবার নিজের অতীতে ফিরে এসেছে। গাছের পাতায় বাতাসের ছোঁয়ায়, যেন ল্যাবরেটরির সেই পুরনো ভবনটি লুকার ফেলে আসা দিনগুলোর গল্প বলছে। মনে পড়ে সেই রাতগুলো, যখন ল্যাবরেটরিতে রাতের গভীরে কাজ করত শিক্ষক থিওর সাথে আর সেই জোছনার মতো সাদা, মিস্টিরিয়াস মেয়েটির কথা। ল্যাবরেটরিটি এখন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনেকেই বলে এখানে নাকি প্রায়ই জোছনার মতো সাদা একটি মেয়ে গভীর রাতে ঘুরে বেড়ায়। লোকা নিজেও এর নীরব সাক্ষী। সোনার জল কাগজে প্লাটিনাম, রেডিয়াম অক্ষরে সব কিছু আজও জীবন্ত :

প্রায় শত বছর আগে এক শীতের রাত, সুইজারল্যান্ডের মাউন্ট পিলাটাসের আকাশ ছিল সেদিন নিঃশব্দ ও রহস্যময়। লুসার্ন হ্রদের শান্ত জলরাশি দেখা যাচ্ছিল মাউন্ট পিটালাসের চূড়া থেকে। লুসার্নের জলরাশি ছিল আয়নার মতো ঝকঝকে, উজ্জ্বল। আকাশের সব তারারা সবসময় এখানে এসে ঝরে পড়ে। সেই সাথে আকাশের একখণ্ড অংশও মিশেছে লুসার্নের জলধারায়। হ্রদের ধারের ওয়িলো, সিডার, পাইন, বিচ গাছগুলো শীতল স্নিগ্ধ বাতাসে, নীলাভ জলের ঢেউয়ে এক অপূর্ব সুর লহরির সৃষ্টি করছে। চাঁদ ছিল অর্ধেক পর্বে, তার হালকা আলোকচ্ছটা পাহাড়ের গায়ে পড়ে সেই রাতের নিস্তব্ধতাকে আরো গাঢ় করে তুলছিল। লুসার্নের হ্রদের অপার বিমুগ্ধতা, রূপালি আলোর লাখো তারার ফুল, রুপোর ঝিনুক-পাইপ স্নেল, ক্ল্যাম শৈবালের ওপর- সব মিলিয়ে স্বপ্নময় করে তুলেছিল সুইজারল্যান্ডকে।

সুইজারল্যান্ডের মাউন্ট পিলাটাসের চূড়ায় বিশাল এক অবজারভেটরি। এখানেই কর্মরত থিও, একজন প্রতিভাবান জ্যোতির্বিজ্ঞানী। রাতের আকাশের অসীম রহস্যের দিকে তাকিয়ে কাটে তার অধিকাংশ রাত। থিও ল্যাব কোট না খুলেই বিশাল ৩০ ইঞ্চি টেলিস্কোপ দিয়ে নির্মল, ঝকঝকে আকাশে চোখ রেখে সহকর্মীকে বলে, ‘ফিলিপ আজ বোধ হয় কিছু একটা হতে চলেছে। আমার এত বছরের অধ্যবসায় বোধ হয় আজ তারাদের মতো জ্বলজ্বল করছে।’

এরই মধ্যে আকাশের তারাদের আলোকময় মিছিলের মাঝে, মৃদু আলোয় কিছু অদ্ভুত নড়াচড়া তার টেলিস্কোপের চোখে পড়ে যায়- একটি ছোট্ট গ্রহাণু, পৃথিবীর কক্ষপথে আবর্তিত। লুসার্ন হ্রদের স্নিগ্ধতায় মিশে থাকা সেই বিশেষ মুহূর্ত যেন ছিল একটি নিঃশব্দ বার্তা, যা মহাবিশ্বের অজানা রহস্যকে থিওর সামনে উদ্ভাসিত করছিল। থিও চিৎকার করে বলে, ‘ইউরেকা, দেখো আমি একটি অদ্ভুত কিছু দেখছি। দেখো এটি একটি গ্রহাণু, পৃথিবীর কক্ষপথে চলছে।’

ফিলিপও টেলিস্কোপে চোখ রাখে। “এটি দেখছি আরেকটি চাঁদ, কীভাবে সম্ভব!’

থিও বারবার নিরীক্ষণ করতে থাকে, বলে- ‘এটি একটি ছোট গ্রহাণু, তবে চাঁদের মতো উজ্জ্বল নয় এবং আকারেও ছোট। এই গ্রহাণুটি শিলা উপাদান দিয়ে তৈরি। এটিই ‘মিনি মুন’।”

ক’দিন পর থিওর গবেষণায় ‘মিনি মুন’ নতুনরূপে প্রকাশ পায়। গ্রহাণু ‘চঞ৫’-এর কথা উল্লেøখ করে থিও বলে, ‘এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২.৬ মিলিয়ন কিলোমিটার দূর দিয়ে প্রদক্ষিণ করবে, যা পৃথিবী এবং চাঁদের দূরত্বের তুলনায় দশগুণ বেশি। এই গ্রহাণুটির আকার ৩৩ ফুট এবং এটি পৃথিবীর চারপাশে ঘণ্টায় প্রায় তিন হাজার ৫৪০ কিলোমিটার বেগে আবর্তন সম্পন্ন করবে এবং এর এই অস্থায়ী যাত্রা প্রায় ৫৬ দিন পর শেষ হয়ে অর্জুন বেল্টে ফিরে যাবে।’

এই আবিষ্কারের পরিপ্রেক্ষিতে, আমেরিকার নাসা ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমি কনফারেন্স’ থিওকে এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। সুইজারল্যান্ড থেকে থিও ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনা শহরে, যেখানে বিশ্বের অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও মহাকাশবিজ্ঞানী উপস্থিত ছিলেন সেখানে আসে। ‘মিনি মুন’ বিষয়ে এক মনোজ্ঞ আর্টিকেল উপস্থাপন করে। সব কিছু শেষে থিও সান ফ্রান্সিসকোতে একটি বিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দেয়।

সান ফ্রান্সিসকো শহরটি ছিল তার জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা- প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, বিশাল গোল্ডেন গেট ব্রিজ, আর চারপাশে সবুজ পাহাড় যেন অন্যরকম এক দৃশ্য। এক বিকেলে, থিও এসে পৌঁছে সান ফ্রান্সিসকোর বিখ্যাত এমবারকাডেরো এলাকায়। এখানে সুন্দরভাবে সাজানো ফিসারম্যানস ওয়ার্ফ, বিভিন্ন দোকান আর রেস্টুরেন্টের পাশে রাস্তায় সাজানো বেঞ্চগুলোতে বসে লোকজন সামনের সান ফ্রান্সিসকো বের দিকে তাকিয়ে থাকে। নদীর পানি কেমন মৃদু ঢেউয়ে আছড়ে পড়ছিল তীরে। সেখানে দাঁড়িয়ে থিওর চোখে স্থির হয়ে যায় ২৩ বছরের এক অপূর্ব সুন্দরীর মেয়ের দিকে।

মেয়েটি বসেছিল নদীর তীরে একটি বেঞ্চে, তার লম্বা চুল ছড়িয়ে পড়েছিল তার পিঠের উপর। তার গাঢ় বাদামি রঙের চুলে সূর্যাস্তের আলোতে সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ছে। মুখটা ফুলের মতো, স্নিগ্ধ হয়ে উঠা যেন চাঁদের আলো, হৃদয়কে এক নিমিষেই বিমোহিত করে।

থিও আরেকটু এগিয়ে যেতেই মেয়েটি থিওর দিকে তাকায়। থিও সে চোখের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যায়। মেয়েটির চোখ হালকা সবুজাভ, বসন্তের পাতার মতো উজ্জ্বল। গোলাপি চেরি ব্লসম ফুলের পাপড়ির মৃদু আভা, ঠোঁটের হাসিতে যেন নিখুঁত শিল্পকর্ম।

থিও অজান্তেই হাতে রাখা শামুকের খোলায় হাত কেটে ফেলে। উহ! বলতেই মেয়েটি এগিয়ে আসে। ‘হাত কেটে গেছে। বসুন আমি বেন্ডেজ করে দিচ্ছি।’

মেয়েটির সাথে ছিল ফার্স্ট এইড কিট। একটি পরিষ্কার বেন্ডেজ ও অ্যান্টিসেপটিক লোশন ব্যবহার করে দ্রুত আহত জায়গাটি পরিচ্ছন্ন করে দিল থিওর। তারপর বলল, ‘আমি ডাক্তার মুন। জাকারবার্গ সান ফ্রান্সিসকো জেনারেল হাসপাতাল আমার কর্মস্থল। হাতটা কীভাবে কাটলেন?’

২৫ বছর বয়সের থিওর সিল্ক গাঢ় কালো চুল বাতাসে উড়ছিল। চোখ ছিল গভীর বাদামি, যেন গোধূলির আকাশে লুকিয়ে থাকা রহস্যময় অন্ধকার। শৌর্য ও নরম ভাবের মেলবন্ধনে আকর্ষণীয় , ব্যক্তিত্বের থিও মৃদু হেসে বলে, ‘আপনার জন্য, আপনি এত সুন্দর কেন?’

মুন আবিষ্কার করে নিজেকে থিওর চোখের অনন্যতায়। মিষ্টি কণ্ঠে বলে, ‘আমি আপনাকে চিনি, সানফ্রান্সিসকো ক্রনিকল নিউজ পেপারে আপনার ছবি দেখিছি। তা ছাড়া সেদিন কনফারেন্সে আমিও ছিলাম। আমার বাবা নাসার একজন বিজ্ঞানী, অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট।’

থিও যেন স্বর্গ হাতে পেল। এরপর শুরু হলো তাদের কথা। আকাশ লাল টিপ পরে, গোধূলির স্বর্ণালি শাড়ি পরে রাতের কাছে চলে গিয়েছে, তবুও মুন আর থিওর কথা শেষ হয় না।

প্রতিদিন বিকেলে থিও আর মুন সানফ্রান্সিসকো বেতে দেখা করে এভাবে একটি মাস। গল্প করতে করতে সানফ্রান্সিসকো বের বুকের সূর্যাস্তের উজ্জ্বল সোনালি, গোলাপি রঙ ওদের মনে প্রশান্তি এনে দেয়। গোল্ডেন গেট ব্রিজের চমৎকার প্রতিফলন জলের ওপর ঝিলমিল করতেই আকাশ ভরে চাঁদ ওঠে। থিও দুষ্টুমি করে বলে, ‘আমাকে রেখে তুমি আকাশের কাছে কেন?’

সময় শেষ হয়ে আসতে থাকে, সুইজারল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে থিও। আর দু’সপ্তাহের মধ্যেই ফিরে যেতে হবে। থিও, মুনকে বিয়ে করে সাথে নিয়ে যেতে চায়। মুনের বাবা থিওর বাবা মা’র সাথে কথা বলে সব ফাইনালে করেছে। কিন্তু এরই মধ্যে একটি ঘটনা জীবনকে প্রত্যয়হীন করে তোলে।

সান ফ্রান্সিসকোর মিশন ডিস্ট্রিক্ট এলাকায় ঘটে মারাত্মক এক দুর্ঘটনা। আগের দিন রাতে, ভোরের সূর্যোদয় পর্যন্ত থিওর সাথে মুন ফোনে কথা বলেছে। সকাল হতেই নিজেকে গুছিয়ে হাসপাতালের দিকে দ্রুত যাচ্ছিল মুন গাড়ি ড্রাইভ করে। তখন হঠাৎ করে একটি বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি তার গাড়িতে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই মিশন ডিস্ট্রিক্টের ব্যস্ত রাস্তায় মুন চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে এলেও মুনকে বাঁচাতে পারেনি কোনো ডাক্তারই। থিওর হৃদয়ে নেমে আসে দুঃসহ বেদনা, গভীর শূন্যতার ক্ষত।

সুইজারল্যান্ডে ফিরে এসে জ্যোতির্বিজ্ঞানী থিও অন্য একজন মানুষ হয়ে যায়। দিন-রাত পড়ে থাকে ল্যাবে টেলিস্কোপের মধ্যে। আকাশ ভিশন, আর মুন এই নিয়েই থিও সময় কাটায়। প্রায়ই ল্যাবরেটরিতে রাত কাটায়। জীবনে আর কোনো নারীর সাথে সম্পর্ক করেনি। ‘ইটিএইচ জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে’ এখনো পড়ায়। সেখানে তার প্রিয় ছাত্র লুকা, শিক্ষক থিওর দেখাশোনা করে। লুকাও, থিওর সাথে ল্যাবরেটরিতে কাজ করে, থিওর কাছ থেকে অনেক কিছু শেখে। থিওর এখন ৮১ বছর বয়স। তারুণ্য নেই কিন্তু প্রাজ্ঞতা আছে সোনার মতো। গতকালও থিও ল্যাবরেটরিতে কাজ করে অনেক রাত ধরে। লুকা ঘুমিয়ে পড়লেও থিও আকাশ ভিশনেই ব্যস্ত ছিল।

রাতের দীঘল চাঁদ ডুবে সূর্য উঠেছে। ভোরের সুইজারল্যান্ডকে মনে হচ্ছে এক রূপকথার জগৎ। মাউন্ট পিলাটাসের পাদদেশে কুয়াশার মিহি চাদর চারপাশকে রহস্যময় করেছিল। হ্রদের ধারে শিশিরে ভেজা ঘাস আর বাগানের লাল টিউলিপ, হলুদ ড্যাফোডিল, আর সাদা ডেইজিগুলো হালকা রোদে ঝিলমিল করছে। সূর্যের প্রথম আলোর স্পর্শ সুইজারল্যান্ডের বুকে যেন সোনালি সুখের বিহ্বল। দূরে পাহাড়ের চূড়ায় সাদা সাদা বরফের আভা, আর পাখিদের শিষ ভোরের মধুরিমায় ঢেলে দিচ্ছে নতুন তত্ত্ব। চারদিকে গভীর, সুনশান নির্জনতা।

লুকার ঘুম ভেঙে যায় হঠাৎই ভোরের নিস্তব্ধতায় এক ভয়ার্ত চিৎকারে। দ্রুত সে ল্যাবরেটরির পেছনের রুম থেকে ছুটে এসে দেখতে পায় থিও মাটিতে নিথর হয়ে পড়ে আছে, আর এক তরুণী ভিজিটর কাঁদছে। লুকা তাড়াতাড়ি থিওকে জড়িয়ে ধরে কাঁপতে কাঁপতে তাকে ডাকে, কিন্তু থিও আর সাড়া দেয় না, পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গিয়েছে বহু দূর।

মেয়েটি তখনো কান্না করছিল; কিন্তু হঠাৎই নিজেকে সামলে উঠে ধীরে ধীরে ল্যাবরেটরি থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল। লুকা তাকে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি এত ভোরে এখানে কী করছ? তোমার নাম কী? কোত্থেকে এসেছ?’

মেয়েটি এক মুহূর্তের জন্য লুকার দিকে তাকায়। তার চোখে যেন এক গভীর বিষাদ। হালকা হাসির এক আভাস নিয়ে মেয়েটি উত্তর দিলো, ‘আমার নাম মিনি মুন’। তারপর সে চলে যায়।

লুকা কিছুক্ষণের জন্য হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ তখন আকর্ষিত হয়ে গেল দেয়ালের এক কোণে রাখা থিওর প্রেমিকা মুনের ছবির দিকে। ছবির মেয়েটি- যেন হুবহু এই তরুণীটির মতো! এমন মিল, এমন প্রতিরূপ কি আসলেই সম্ভব? লুকার মনে হলো যমজ বোনের মতো। বিষয়টি ভাবতেই লুকার মনের ভেতর অসংখ্য প্রশ্ন তার চেতনাকে অবশ করে দিচ্ছে। তারপর লুকার চোখ পড়ল থিওর লেখা খোলা ডায়েরির দিকে। পৃষ্ঠাটিতে অক্ষরগুলো যেন জীবন্ত হয়ে কথা বলছে-

‘আজ রাতে আমি এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নে আমি দেখি, মুন এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। তার হাসি যেন সারা বিশ্বের সমস্ত আলো নিয়ে এসেছে, আর আমি তার কোলে শুয়ে আছি- সুখের আবেশে ডুবন্ত।’

এরপর লুকা, প্রিয় শিক্ষক থিওকে হারিয়ে বিমর্ষ হয়ে পড়ে, চলে যায় নিউজিল্যান্ডে। সেখানে সে তার জীবনকে, থিওর শিক্ষায়, অনুশীলনে অবারিত করে তোলে। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে লুকা অনুভব করে প্রিয় জন্মভূমি সুইজারল্যান্ডের কথা। তাই সে গত রাতে ফিরে এসেছে।

অনেক বছরের বেদনা, অপরিসীম দুঃখ, ব্যথা রয়েছে লুকার, প্রিয় শিক্ষক থিওর জন্য; যে একসময় তার শিক্ষক, পথপ্রদর্শক ছিল, তাকে জ্ঞান আর স্বপ্নের জগতে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সেই হারানো দিনের অপরিসীম দুঃখ আজ পাথরের মতো ভারী করে তুলছে বুকটা। আকাশে মেঘের দরজা খুলে আজ রুপার বলের মতো চাঁদ উঠেছে, তার মৃদু আলো পাহাড়ের শীর্ষে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই আলোয় ডুবছে সুইজারল্যান্ড।

লুকা তারাভরা আকাশের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। মনে মনে বলে, ‘ওই তো মিনি মুন, থিওকে বুকে জড়িয়ে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে। প্রিয় শিক্ষক থিও এখন নিশ্চিন্ত, যেন আকাশের গভীরে মিনি মুনের স্নেহমাখা আলোর মধ্যে তার নিজের শান্তি খুঁজে পেয়েছে।’

লুকার আজ আর পা চলছে না, যেন সমস্ত ক্লান্তি আর বেদনা তার পায়ের নিচে শিকড়ের মতো গেঁথে গেছে মাউন্ট পিটালাসের ভূমিতে। সে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল, পাহাড়ের চূড়ার নিচে, যেখানে থিওর স্মৃতি হাওয়ার সাথে মিশে তাকে স্পর্শ করছে। জোছনায় ভিজে যাচ্ছে লুকার চুল, অবয়ব আর মাউন্ট পিটালাস। ছমছমে অশরীরী আবেশে লুকা চুপচাপ দাঁড়িয়েই রইল, যেন এই মুহূর্তে সে থিওর স্মৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে।