পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরে গুরুত্ব পাবে পানিবণ্টন ভিসা জ্বালানি
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দুই দিনের সফরে আজ ভারতের দিল্লি যাচ্ছেন। এই সফরে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সই, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করা, ভিসাব্যবস্থা সহজীকরণ ও জ্বালানি সহযোগিতায় গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ। অন্যদিকে ভারতের অগ্রাধিকারে রয়েছে নিরাপত্তা ও কানেক্টিভিটি। সফরে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের একটি রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটাই বাংলাদেশ থেকে ভারতে মন্ত্রী পর্যায়ের প্রথম সফর। এর আগে খলিলুর রহমান গত বছর নভেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসাবে দিল্লি গিয়েছিলেন। এ সময় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়।
কর্মসূচি অনুযায়ী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজ মঙ্গলবার দুপুরে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হবেন। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন। সন্ধ্যায় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপদেষ্টার বৈঠক হবে। পরদিন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়কমন্ত্রী হারদীপ সিং পুরির সাথে বৈঠক হবে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ইন্ডিয়ান ওশেন কনফারেন্সে যোগ দিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরিশাসের উদ্দেশে রওনা হবেন। ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ১০ থেকে ১২ এপ্রিল পোর্ট লুইসে এই কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হবে। এবারের কনফারেন্সে ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে।
১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের তিন দশক মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি হয়েছিল। মেয়াদ প্রায় শেষ হওয়ায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রতিনিধিদল উভয় দেশে চুক্তিটির জলবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন করছে। এ চুক্তির আওতায় উজানের দেশ হিসেবে বাংলাদেশে পানি ছাড়তে ভারত বাধ্য। তবে চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের সম্মতি প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সই করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার দফায় দফায় চেষ্টা করেও কোনো সফলতা পায়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশীদের জন্য সব ধরনের ভিসা বন্ধ করে দিয়েছিল ভারত। পরবর্তী সময়ে জরুরি চিকিৎসা ভিসা উন্মুক্ত করা হলেও এখনো বাংলাদেশীদের জন্য পর্যটনসহ অন্যান্য ভিসা বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হিন্দুুত্ববাদী সংগঠনগুলোর হুমকির মুখে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে ভারতীয়দের ভিসা দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এখন তা আবারো চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশীদের জন্য ভারতও চিকিৎসাভিসা সহজীকরণ করেছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ভিসাও চালু করা হবে বলে ভারত আশ্বাস দিয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সঙ্কট মোকাবেলায় অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহ চেয়ে সম্প্রতি ভারতকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে সরকার। এতে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে চার মাসে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব করা হয়েছে। ভারতকে দেয়া এ প্রস্তাবের ইতিবাচক সাড়া আশা করছে বাংলাদেশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতের সাথে সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে গত বছরের মাঝামাঝি ভারতের বিমানবন্দরগুলো ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি, স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের ছয়টি পণ্য ভারতে রফতানি এবং বাংলাদেশের ৯ ধরনের পাটজাত পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। বাংলাদেশও ভারত থেকে সড়কপথে সুতা আমদানিসহ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। এসব বিধিনিষেধ এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এর মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরের একদিন আগে দেশটির হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষাৎ শেষে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে হুমায়ুন কবির বলেন, দুই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানির বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। পাইপলাইনে জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে আমরা আশাবাদী।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রসঙ্গ টেনে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সাথে যে ধরনের সম্পর্ক ছিল, তা আর হবে না। সেই অধ্যায় এখন শেষ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত বরাবরই বলে এসেছে যে তারা বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করতে আগ্রহী। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় দুই দেশের মধ্যে রুটিন কাজ চলবে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের পর ভারতের অবস্থান পরিবর্তন হয়। নির্বাচনে বিএনপির বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে পাঠানো শুভেচ্ছাবার্তায় বলেছেন, আমাদের বহুমুখী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং কনেক্টিভিটি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও জনগণের মধ্যে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর অভিন্ন লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে আপনার সাথে আমি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী। অর্থনৈতিকভাবে দু’টি দ্রুত গতিশীল দেশ হিসাবে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের টেকসই প্রবৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক অগ্রগতিতে একসাথে কাজ করতে পারে।
বিএনপির মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি উপস্থিত ছিলেন। ওম বিড়লা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সপরিবারে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে নরেন্দ্র মোদির চিঠি হস্তান্তর করেছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
বেইজিং যাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী : বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চলতি মাসের শেষে বেইজিং যাবেন। এ সময় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সাথে তার বৈঠক হবে। গত রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় খলিলুর রহমানের সাথে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সাক্ষাতে এ ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে।