গাজা প্রশাসন কমিটির দায়িত্ব শুরু করলেন আলী শাথ, মিশন স্টেটমেন্ট স্বাক্ষর
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েছেন পুতিন
- গাজা পুনর্গঠন বোর্ডে স্থায়ী সদস্য হতে লাগবে ১ বিলিয়ন ডলার!
গাজা পরিচালনার জন্য গঠিত ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজার (এনসিএজি) প্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব শুরু করেছেন ড. আলী শাথ। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তিনি কমিটির ‘মিশন স্টেটমেন্ট’ অনুমোদন ও স্বাক্ষর করেন। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে শাথ বলেন, জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজ্যুলেশন ২৮০৩ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার আওতায় এই কমিটি গঠিত হয়েছে। তিনি জানান, গাজার অন্তর্বর্তীকালীন সময়কে টেকসই ফিলিস্তিনি সমৃদ্ধির ভিত্তিতে রূপান্তর করাই তাদের লক্ষ্য।
মিশন স্টেটমেন্ট অনুযায়ী, কমিটির মূল দায়িত্ব হবে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থার পুনরুদ্ধার এবং শান্তি, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারভিত্তিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা। শাথ বলেন, ‘আমরা শুধু অবকাঠামো নয়, গাজার মানসিক ও সামাজিক পুনর্গঠনেও কাজ করব।’
হোয়াইট হাউজ জানায়, এই টেকনোক্র্যাট কমিটি গাজার দৈনন্দিন প্রশাসন সামলাবে। পাশাপাশি একটি গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড গঠনের কথাও জানানো হয়েছে, যেখানে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনার, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বরা রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে এখন গাজার নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাট শাসন ও পুনর্গঠনে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েছেন পুতিন
গাজা পুনর্গঠন তদারকির জন্য গঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। সোমবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এ তথ্য নিশ্চিত করেন। খবর আনাদোলু এজেন্সির। মস্কোয় নিয়মিত ব্রিফিংয়ে পেসকভ জানান, কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে পুতিনের কাছে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছেছে এবং বিষয়টি বর্তমানে পর্যালোচনা করছে ক্রেমলিন। তবে রাশিয়া এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার অংশগ্রহণ হলে গাজা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কাঠামোয় বড় শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা বাড়বে, তবে এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন টানাপড়েনও তৈরি করতে পারে।
গাজা পুনর্গঠন বোর্ডে স্থায়ী সদস্য হতে লাগবে ১ বিলিয়ন ডলার!
গাজা পুনর্গঠন তদারকির জন্য গঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ স্থায়ী সদস্যপদ পেতে হলে ১ বিলিয়ন ডলার দিতে হবে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা। সিএনএনকে দেয়া তথ্যে বলা হয়, এই অর্থ সরাসরি গাজা পুনর্গঠনে ব্যয় করা হবে। ওই কর্মকর্তা জানান, এই অর্থ প্রদান বাধ্যতামূলক নয়। যারা অর্থ দেবেন না, তারা তিন বছরের মেয়াদে বোর্ডের সদস্য থাকবেন। তবে এক বিলিয়ন ডলার প্রদানকারীরা স্থায়ী আসন পাবেন। ব্লুমবার্গই প্রথম এই তথ্য প্রকাশ করে। হোয়াইট হাউজের ভাষ্য অনুযায়ী, বোর্ড অব পিস গাজা পুনর্গঠনের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তমূলক কাঠামো। এতে টনি ব্লেয়ার, মার্কো রুবিও, জ্যারেড কুশনার, বিশ্বব্যাংক প্রধান আজয় বঙ্গাসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রয়েছেন। তবে বোর্ডে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিনিধি নেই, যা নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। এই বোর্ডের পাশাপাশি একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি গাজার দৈনন্দিন শাসন পরিচালনা করবে। ইসরাইল ইতোমধ্যে তুরস্ক ও কাতারের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থের বিনিময়ে সদস্যপদ দেয়ার ধারণা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নজিরবিহীন এবং এটি গাজার ভবিষ্যৎ শাসন নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
প্রশাসন কমিটির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ফিলিস্তিনি পরিবার ও গোত্রগুলোর
গাজার ফিলিস্তিনি পরিবার, গোত্র ও গোত্রপ্রধানরা ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজার (এনসিএজি) প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেছেন। রোববার দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সমাবেশে এই ঘোষণা দেয়া হয়। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের। ফ্যামিলিজ গ্যাদারিংয়ের প্রধান আলাউদ্দিন আল-আকলুক বলেন, কমিটি গঠন একটি ‘জাতীয় মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা’। তিনি বলেন, দুই বছরের যুদ্ধ গাজার অবকাঠামো ধ্বংস করেছে, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা বাড়িয়েছে এবং লক্ষাধিক মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে। তিনি কমিটির কাজকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পরিবার ও গোত্রগুলো ত্রাণ কার্যক্রম, ধ্বংসাবশেষ অপসারণ এবং পুনর্গঠনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। পাশাপাশি তারা কমিটির কার্যক্রমে জনগণের নজরদারির ভূমিকাও পালন করবে। প্যালেস্টিনিয়ান ক্ল্যান্স কমিটির প্রধান হোসনি আল-মাঘনি বলেন, এই কমিটি ‘শেষ সুযোগ’, যা ব্যর্থ হলে গাজার পরিস্থিতি আরো জটিল হবে। তিনি জানান, গোত্রগুলো কোনো দলীয় স্বার্থ ছাড়াই কমিটির কাজ সহজ করতে প্রস্তুত। এর আগে আলী শাথ কমিটির ম্যান্ডেট স্বাক্ষর করেন। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, বোর্ড অব পিস ও গাজা এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলসহ চারটি কাঠামোর মাধ্যমে গাজার অন্তর্বর্তীকালীন শাসন পরিচালিত হবে।
‘বোর্ড অব পিসে শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলঘনিষ্ঠরা
গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো ঘোষণা করেছেন। হোয়াইট হাউজ জানায়, এটি ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা গাজা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তৈরি করা হয়েছে। তিন স্তরের এই কাঠামোর শীর্ষে রয়েছেন ট্রাম্প নিজে এবং ইসরাইলপন্থী মার্কিন ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিরা, যেখানে ফিলিস্তিনিদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে পৌর ও সেবামূলক কাজে। খবর আলজাজিরার।
সবচেয়ে ক্ষমতাধর স্তর ‘ফাউন্ডিং এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল’-এর চেয়ারম্যান ট্রাম্প নিজেই, যিনি ভেটো ক্ষমতা রাখবেন। এই বোর্ডে রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী মার্ক রোয়ন, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং মার্কিন ডেপুটি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েল জুনিয়র। বোর্ডের মাঠপর্যায়ের তদারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাবেক জাতিসঙ্ঘ মধ্যপ্রাচ্য দূত নিকোলাই মøাদেনভ। তার অধীনে কাজ করবে দ্বিতীয় স্তরের ‘গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড’, যেখানে তুরস্ক, কাতার, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিরা থাকলেও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা সীমিত। সবচেয়ে নিচের স্তরে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের নিয়ে গঠিত ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’, যারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি ও পৌরসেবা পরিচালনা করবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কাঠামো গাজাকে কার্যত একটি আন্তর্জাতিক ট্রাস্টিশিপে পরিণত করছে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার উপেক্ষিত।
ঝড়ে আরো বিপর্যয়ের আশঙ্কা গাজায়, শীত ও বৃষ্টিতে অচল প্রায় সব বাস্তুচ্যুত শিবির
গাজায় নতুন করে ঝড় আঘাত হানার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে, যা বাস্তুচ্যুত লক্ষাধিক ফিলিস্তিনির দুর্ভোগ আরো বাড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইসরাইলের টানা দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে গাজার প্রায় পুরো জনসংখ্যা বাস্তুচ্যুত হয়ে অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছে, যেগুলোর বেশির ভাগই শীত ও বৃষ্টির জন্য অনুপযোগী। খবর আলজাজিরার।
গাজার গভর্নমেন্ট মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বৈরী আবহাওয়ার কারণে বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোর এক লাখ ৩৫ হাজার তাঁবুর মধ্যে অন্তত এক লাখ ২৭ হাজার তাঁবু সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আলজাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজ্জুম বলেন, ‘ছেঁড়া তাঁবু ও ছাদহীন ঘরে থাকা পরিবারগুলো ঠাণ্ডা রাত, বৃষ্টি ও কনকনে শীতে চরম মানবেতর অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিস্থিতির বড় কারণ ইসরাইলি অবরোধ। শীত উপযোগী প্রিফ্যাব ঘর, নির্মাণসামগ্রী ও পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা গাজায় ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির আওতায় প্রতিদিন অন্তত ৬০০ ট্রাক সহায়তা প্রবেশের কথা থাকলেও বাস্তবে গড়ে মাত্র ১৪৫টি ট্রাক ঢুকছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।
ঠাণ্ডা মোকাবেলায় জ্বালানির অভাবে মানুষ প্লাস্টিক, কাপড় ও আবর্জনা পুড়িয়ে গরমের চেষ্টা করছে, যা নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শীতজনিত কারণে অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধের সংখ্যা বেশি। আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, আগামী দিনে তীব্র ঠাণ্ডা ও তুষারপাতের ঝুঁকি রয়েছে।
পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বাহিনীর অভিযান, কারফিউতে স্থবির দক্ষিণাঞ্চল
অধিকৃত পশ্চিমতীরের হেবরন শহরে ‘বৃহৎ পরিসরের’ সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইসরাইল। সোমবার ভোর থেকে শত শত সেনা, সাঁজোয়া যান ও বুলডোজার মোতায়েন করে শহরের দক্ষিণাঞ্চলে কড়া কারফিউ জারি করা হয়। এতে স্বাভাবিক জীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। খবর আলজাজিরার।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাবাল জোহর এলাকায় ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস’ এবং অস্ত্র জব্দ করাই অভিযানের উদ্দেশ্য। তবে ঘটনাস্থল থেকে আলজাজিরা আরবির প্রতিবেদক মুনতাসির নাসসার জানান, পুরো এলাকা সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ করা হয়েছে এবং ট্র্যাকযুক্ত সাঁজোয়া যান মোতায়েন করা হয়েছে, যা দ্বিতীয় ইন্তিফাদার পর এই প্রথম হেবরনে দেখা গেল।