বিক্রয়চাপ সত্ত্বেও পুঁজিবাজারে সূচক ও লেনদেনের উন্নতি
দুর্বল তিন কোম্পানি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
দিনের শুরুতে সূচকের উন্নতি, পরে বিক্রয়চাপের মুখে ফের নেতিবাচক প্রবণতার শিকার হওয়া দেশের দুই পুঁজিবাজারই গতকাল দিনশেষে সূচকের উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্যেও টানা দুই দিন সূচক বাড়ল পুঁজিবাজারে। গতকাল মাঝে মধ্যে বিক্রয়চাপের মুখে পড়লেও দিনের লেনদেনের বেশির ভাগ সময় বাজারগুলোতে সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী, যা বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে সহায়ক ছিল। ফলে প্রধান পুঁজিবাজারটিতে বৃদ্ধি পেয়েছে লেনদেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে নেতিবাচক প্রভাব দেশের পুঁজিবাজারকে কিছুটা স্থবির করে রাখলেও বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, যেকোনো মুহূর্তে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। আর এ কারণে বাজার ভালো দেখলে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও বেড়ে যায়। তবে একটি অংশের দ্রুত মুনাফা তুলে নেয়ার মানসিকতা বাজারকে টেকসই হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না। তা ছাড়া যুদ্ধের স্থায়িত্ব নিয়ে কোনো ধরনের ধারণা না থাকায় বাজার তার স্বাভাবিক গতিও ফিরে পাচ্ছে না।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৪ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ৫ হাজার ১২২ দশমিক ৫৩ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি মঙ্গলবার দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ১৫৬ দশমিক ৮৭ পয়েন্টে। তবে দিনের শুরুতে সূচকটি ৫ হাজার ১৭২ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করে। এ সময় সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় প্রায় ৫০ পয়েন্ট। সকাল সাড়ে ১০টার পর প্রথম বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারটি। বেলা পৌনে ১১টার সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ১৪৫ পয়েন্টে। তবে প্রথম দিকের এ চাপ দ্রুত কাটিয়ে ওঠে বাজারটি। বেলা ১১টার পর ফের ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সূচকটি দুপুর সোয়া ১২টার দিকে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ১৭৬ পয়ন্টে। এখান থেকে নতুন করে বিক্রয়চাপ সক্রিয় হলে বেলা ১টায় সূচক ৫ হাজার ১৫৫ পয়েন্টে নামে। দিনের বাকি সময় সূচকটি এ অবস্থানটিই ধরে রাখে। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩২০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৯২ ও ৫ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্য সূচক সিএএসপিআই গতকাল ৮ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৭৪ ও ৫ দশমিক ৫১ পয়েন্ট।
সূচকের উন্নতির ইতিবাচক প্রভাব ছিল ডিএসইর লেনদেনেও। গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজারটির লেনদেন ছিল ৫৯৭ কোটি টাকা, যা আগের দিনের থেকে ১২৭ কোটি টাকা বেশি। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৪৭০ কোটি টাকা। তবে লেনদেন কমেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। এখানে ৩১ কোটি টাকা থেকে ২৬ কোটিতে নেমে আসে লেনদেন।
এ দিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অপেক্ষাকৃত তিনটি দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি এবং এদের শেয়ারদর নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। কোম্পানি তিনটি হলো জি কিউ বলপেন, কে অ্যান্ড কিউ ও ফাইন ফুডস। গতকাল ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজে গেলে বিেিনয়াগকারীদের একটি অংশ প্রতিবেদকের কাছে প্রশ্ন রাখেন, যে পুঁজিবাজারে এ ধরনের কোম্পানির লাগামহীন দাম বাড়লেও কেউ প্রশ্ন করে না, নিয়ন্ত্রক সংস্থা চুপচাপ দেখতে থাকে, ডিএসইর মতো প্রতিষ্ঠান মূল্যবৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করে, সেখানে ভালো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কিভাবে বিনিয়োগে আসবে? বিদেশী বিনিয়োগ তো দূরের কথা। কোম্পানিগুলোর বর্তমান শেয়ারদর শুধু লাগামহীনভাবে বাড়ছে তাই নয়, বিভিন্ন সময় এগুলো ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানির তালিকায়ও উঠে আসছে।
এদের মধ্যে পুঁজিবাজারে সবচেয়ে আগে তালিকাভুক্ত হয়েছে বিবিধ খাতের কোম্পানি জিকিউ বলপেন। কোম্পানিটি ১৯৮৬ সালে পুঁজিবাজারে তালকাভুক্ত হয়। কোম্পানিটির শেয়ারসংখ্যা ৯০ লাখের কাছাকাছি; অর্থাৎ প্রায় ৯ কোটি টাকার কোম্পানি এটি। একসময় বাজারে জিকিউ বলপেন নামে একটি কলম প্রস্ততকারী প্রতিষ্ঠান ছিল এটি। কোম্পানির পারফরম্যান্স ও লভ্যাংশ ঘোষণার দিক থেকেও বেশ ভালো অবস্থানে ছিল কোম্পানিটি। কিন্তু ২০১০ সালের পর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে কোম্পানিটি। বন্ধ হয়ে যায় মূল ব্যবসা। পরে ব্যবসা পরিবর্তনের কথা জানা গেলেও কোম্পানিটি আগের অবস্থানে আর ফিরতে পারেনি। ২০২৩ সালে কোম্পানিটি ২ দশমিক ৫০ শতাংশ ও ২০২৪ সালে ৩ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে।
ডিএসইর ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে গত বছরের জুলাই মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ১৫০ টাকা। কিন্তু অক্টোবরে কোম্পানিটির শেয়ারদর উঠে যায় ৬০০ টাকায়; অর্থাৎ তিন মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৩০০ শতাংশ। মাঝখানে কিছু সময় বিরতি দিয়ে গতকাল কোম্পানিটির শেয়ারদর আবার উঠে যায় ৬১১ টাকায়।
কে অ্যান্ড কিউ সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, এটি ১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। প্রায় সাত কোটি টাকার কোম্পানি। উৎপাদন করত ড্রাইসেলে ব্যবহৃত ইলেকট্রোড। তবে ডিএসই থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে বেশ কয়েকবার কোম্পানিটি উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দিয়ে ফের চালু করে। এটিও বিভিন্ন সময় উৎপাদিত পণ্যে পরিবর্তন আনে। তবে কম মূলধনের কোম্পানি হওয়ার পরও ২০১৮ সাল থেকে কখনো ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারেনি। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৩ শতাংশ ও ২০২৫ সালে ৪ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। গতকাল মঙ্গলবার কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ৪৬০ টাকা। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় পরপরই কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে লাগামহীনভাবে। জানা যায়, এটি বিএনপির মান্ত্রপরিষদের একজন সদস্যের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় লাগামহীম দাম বাড়ছে।
ফাইন ফুডস নামক প্রতিষ্ঠানটি ২০০২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ওই সময়টিতে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশই বাজার থেকে ডি-লিস্টেড হয়ে গেছে। বর্তমানে ফাইন ফুডস প্রায় ১৪ কোটি টাকার কোম্পানি। গতকাল শেয়ারদর সর্বোচ্চ ৫০১ টাকায় ওঠে। বিগত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় ২০১৯ সালে কোম্পানিটি ২ শতাংশ, ২০২২ সালে ১.৫০ শতাংশ, ২০২১ সালে ১.৫০ শতাংশ ও ২০২৩ সালে ১ দশমিক ২৫ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। কিন্তু হঠাৎ করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে লভ্যাংশ বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ১০ ও ১৪ শতাংশে।
বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, তিনটি প্রতিষ্ঠানেরই আসলে কোনো ব্যবসা নেই। বাজারে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে শেয়ারের দাম ওঠানামার মাধ্যমে মুনাফা আয়ই এ তিনটি কোম্পানির মূল কাজ। এভাবেই এসব কোম্পানির উদ্যোক্তারা প্রতারণার মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে সবার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। তারা মনে করেন বিএসইসির নির্দেশনা অনুসারে ডিএসই কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েকটি কোম্পানি পরিদর্শনের ব্যবস্থা নিয়েছিল। এসব কোম্পানিকেও পরিদর্শনের আওতায় আনা হলে কোম্পানির আসল চিত্র বের হয়ে আসত।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে একটি প্রথম শ্রেণীর বেসরকারি ব্যাংকের ব্রোকারেজ হাউজের প্রধান নির্বাহী নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের ধারণা মোটামুটি সত্যি। তবে শুধু এ তিনটি কোম্পানি নয়, বরং অরো অনেক কোম্পানি রয়েছে যেগুলো উৎপাদিত পণ্যের আয় থেকে মুনাফার মাধ্যমে লভ্যাংশ দিয়ে নয়, শুধু কারসাজির মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে পকেট ভারী করে সেখান থেকে নামমাত্র মুনাফা ঘোষণা করে যুগের পর যুগ পুঁজিবাজারে টিকে থাকে। আর এসব কোম্পানির কারণে বিদেশী তো বটেই দেশীয় ভালো কোনো বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে আসার আগ্রহ দেখায় না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষের উচিত এসব কোম্পানির সার্বিক বিষয় ভালোভাবে তদন্ত করে বিনিয়োগকারীদের কাছে সঠিক চিত্র তুলে ধরা।