নোট অব ডিসেন্ট বিরোধী দলের এমপিদের

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি ১৬টি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ

৪টি অধ্যাদেশ রহিতকরণ ও হেফাজতের জন্য এখনই সংসদে বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে উত্থাপিত হচ্ছে না। ফলে সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী গণভোট, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ এসব অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। চারটি অধ্যাদেশ রহতিকরণ ও হেফাজতের জন্য এখনই সংসদে বিল আনয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার স্পিকার মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের প্রতিবেদন উত্থাপন করেন বিশেষ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো: জয়নুল আবেদীন।

এর আগে, গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে ১৩ সদস্যের এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি পর পর তিনটি বৈঠক করে ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে এই প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে।

কমিটির সুপারিশে ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি উত্থাপিত আকারেই পাসের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে এবং ৪টি অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। আর বাকি ১৬টি অধ্যাদেশ পরবর্তীতে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে আনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশ জারির পর তা পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করতে হয় এবং ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে তা বাতিল হয়ে যায়। আগামী ৯ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে বিল উত্থাপন করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে ওই ১৬টি অধ্যাদেশ বিল উঠছে না, তাই আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে তামাদি বা বাতিল (ল্যাপস) হয়ে যাবে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এর আলোকে বিল উত্থাপন ও পাস না করলে এগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

যে ১৬টি অধ্যাদেশ বাতিল হচ্ছে

গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, বাংলাদেশ ট্র্যাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মাইক্রো ফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ-২০২৬ এবং তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬।

জামায়াত এমপিদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ : সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তামাদির তালিকায় যাওয়া অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে ১২টিতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর তিন সংসদ সদস্য। তারা হলেন- অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও গাজী নজরুল ইসলাম। বিরোধীদলীয় এই সংসদ সদস্যরা সব মিলিয়ে ১৫টি বিলের ওপর নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।

এখনই ৪টি বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ : প্রতিবেদনে ৪টি অধ্যাদেশ রহিতকরণ ও হেফাজতের জন্য এখনই সংসদে বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলো হলো- জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ-২০২৪, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬।

১৫টির সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ : সংশোধিত আকারে সংসদে বিল উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করা ১৫টি অধ্যাদেশ হলো- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন)-২০২৫, ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৫, সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ-২০২৫, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ দমন অধ্যাদেশ-২০২৬, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি ভূমি সুরা অধ্যাদেশ-২০২৬, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, বেসরকারি শিাপ্রতিষ্ঠান শিক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬ এবং বেসরকারি শিাপ্রতিষ্ঠান শিক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬।

এ দিকে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন উত্থাপনের পর চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিল আকারে পাস করতে হবে। আগামী রোববারের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বিলগুলো আনয়ন করবেন।

স্পিকার এ সময় বলেন, আগামী রোববার সংশ্লিষ্ট বিলগুলো আনার জন্য মন্ত্রীদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেন। চেষ্টা করব বিলগুলো দ্রুততার সাথে পাস করার জন্য।

আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেন, রোববার সব মন্ত্রী নোটিশ দিবেন। সোমবার বিলগুলো উত্থাপিত হবে। তিনি বলেন, বিলগুলো ওয়েব সাইটে দেয়া আছে। প্রিন্ট করতে গেলে ১২ লাখ টাকা খরচ হতো। খরচ বাঁচাতে প্রিন্ট করা হয়নি। আপনারা ওয়েব সাইটে কিক করে বিলগুলো দেখতে পাবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রোববারের মধ্যে সব মন্ত্রী নোটিশ দিতে পারবেন বলে মনে হয় না। যেহেতু ৯ তারিখের (এপ্রিল) মধ্যে ফয়সালা করতে হবে, তাই সময়টা আপনার বিবেচনায় নিবেন।

জবাবে স্পিকার বলেন, বিলগুলো আপনারা (মন্ত্রী) সাবমিট করেন। ৯ তারিখের মধ্যে বিল সাবমিট করেন। সংশ্লিষ্ট সংশোধনীগুলো আপনারা দিবেন। এরপর সময়ের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

এরপর বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, এখানে (উপস্থাপিত রিপোর্ট) শুধু প্রস্তাবনাটা এসেছে। কিন্তু অরজিনাল বিল কি ছিল এ মুহূর্তে আমাদের সামনে নেই। যদি অরজিনাল বিল না থাকে তাহলে পরিবর্তনটা কি এলো সেই তুলনা তো আমরা করতে পারব না। বলা হয়েছে ওয়েব সাইটে ওপেন থাকবে, ডাউনলোড করে নেয়ার জন্য, ওখানেও তো খরচ হবে, যারই খরচ হোক। সুতরাং এই যুক্তিতে না গিয়ে আমাদের জন্য সহজ করে দেয়া হোক। অরজিনাল বিলটা থাকুক আর কী গৃহীত হলো সেটি তো আছেই এখানে, তা আমরা মিলিয়ে নেবো। তা না হলে জটিলতা তৈরি হবে।

এ সময় স্পিকার বলেন, যে ধারায় সংশোধনী আনা হয়েছে তার সাথে মূল আইন না দিলেও মূল আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা সাথে কী পরিবর্তন সেটা কিয়ারলি একটা স্টেটমেন্ট আকারে উপস্থাপিত হোক। তার পর যদি আপনাদের বুঝতে সমস্যা হয় তাহলে আইনমন্ত্রী আছেন, বিজ্ঞ মন্ত্রী ও সদস্যরা আছেন- আমরা সেটি সমাধান করব।

সংশোধনের অধিবেশন আগামী রোববার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।