নতুন সরকারের কাছে ৪ দাবি ডিসিসিআইর
চাঁদাবাজি ও উচ্চ সুদে ব্যবসায় আস্থাহীনতা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
উচ্চ সুদহার, ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অসহনীয় চাঁদাবাজি, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা দেশের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটি বলেছে, বিদ্যমান সঙ্কট উত্তরণে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান আরো চাপে পড়বে।
গতকাল রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় নবগঠিত সরকারের কাছে ডিসিসিআইর প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
তাসকীন আহমেদ বলেন, অপরিবর্তিত পলিসি রেটের কারণে বর্তমানে ব্যবসায়ীদের ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণ নিতে হচ্ছে। এর সাথে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং ঋণ শ্রেণিকরণের সময়সীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৩ মাসে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত আর্থিক খাতে চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যকর মূলধনের সঙ্কটে পড়ছে এবং শিল্পখাতে অস্থিরতা বাড়ছে। সুদহার সহনীয় পর্যায়ে না নামালে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, উৎপাদন কমবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, শিল্প-কারখানায় চাহিদামাফিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নতুন শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম যথাক্রমে ৪০ ও ৪২ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় মারাত্মকভাবে বেড়েছে। এতে স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানো এবং রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে। সামগ্রিকভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে পড়ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডিসিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, শিল্পনীতি বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতার অভাব এবং বিশেষ করে অসহনীয় চাঁদাবাজি স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করছে। পরিবহন খাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরে চাঁদাবাজির প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে গিয়ে পড়ে, যা ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। কারা চাঁদা নেয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের সরকারি দলের লোক পরিচয় দিয়ে চাঁদা দাবি করে। যেকোনো মূল্যে এই চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন না থাকায় ব্যবসায়ীরা নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, কর জালের বাইরে থাকা বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে রাজস্ব কাঠামোর আওতায় আনা গেলে সরকারের আয় বাড়বে এবং সৎ করদাতারা স্বস্তি পাবেন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
লজিস্টিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা ও জমির উচ্চমূল্য ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সেবার হার গড়ে ৪১ শতাংশ বাড়ানোয় আমদানি-রফতানি ব্যয় বেড়েছে। অভ্যন্তরীণ নৌপথের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেশি রয়ে গেছে। এর সম্মিলিত প্রভাব উৎপাদন ও বিতরণ ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী উত্তরণের পর বাংলাদেশের রফতানি ৫ দশমিক ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, যার পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ধাক্কা সামাল দেয়া কঠিন হবে উল্লেখ করে তিনি এলডিসি উত্তরণ অন্তত তিন বছর পিছিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যিক চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এর ফলে তৈরী পোশাক খাতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়নি। পাশাপাশি এলএনজিসহ অন্যান্য পণ্য আমদানিতে শর্তারোপের কারণে ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে পুনঃআলোচনার মাধ্যমে চুক্তির শর্ত সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
ডিসিসিআই মনে করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বেসরকারি খাতের পুনরুজ্জীবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সংগঠনটি নতুন সরকারের কাছে চারটি দাবি তুলে ধরে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত ও চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ, দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ প্রশাসন, অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সহায়তা এবং সহনীয় সুদহার নিশ্চিতকরণ।
তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষিত তরুণ বেকার রয়েছেন। কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই তরুণদের কেবল চাকরিনির্ভরতা থেকে বের করে এনে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার এবং ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। স্টার্ট-আপ খাতে সহজশর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।