লিড নিয়েও বিপদে পড়াটা মেসিদের পুরনো অভ্যাস
Printed Edition
এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপের শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে প্রচণ্ড একটা ধাক্কা দিয়েছিল জর্দান। মধ্য প্রচ্যের দেশটি সেই যে আর্জেন্টিনার জালে প্রথম বল পাঠাল, সেই জের এখনো টানতে হচ্ছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশটিকে। আরব বিশ্বের দেশটির বিপক্ষে সেই ম্যাচসহ সর্বশেষ চার ম্যাচে ৬ গোল হজম। নকআউটে কেপ ভার্দে, মিসর ও সুইজারল্যান্ড পাঁচবার বল পাঠিয়েছিল আর্জেন্টিনার জালে। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন একটি দল, যাদের দলে লিওনেল মেসির মতো বিশ্বখ্যাত তারকা, পোস্টের নিচে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ এবং ডিফেন্সে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো মতো নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার, সেই দল এভাবে গোলের পর গোল খাবে তা নিতান্তই বেমানান। অবশ্য আর্জেন্টাইনদের এই রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং গোল দিয়ে লিড নিয়েও তা ধরে রাখতে না পারাটা নতুন কিছু নয়।
আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের বছর থেকে দেখলেই এর প্রমাণ মিলবে। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে এই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার দুই গোলে লিড নেয়ার পর বেশ স্বস্তি¡তে। অথচ এরপর ইংল্যান্ড একটি গোল শোধ দিয়ে বেশ চাপে ফেলে দেয় কার্লোস বিলার্দোর দলকে। সে ম্যাচে ২-১ স্কোর লাইনে জর্জ ভালডানো, অস্কার রুজেরিরা জিতেছিল। এরপর পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে হোসে ব্রাউন, জর্জ ভালদানোর গোলে ২-০ তে এগিয়ে গিয়েছিল। এরপর দুই কর্নার থেকে দুই গোল পরিশোধ জার্মানদের। যদিও শেষ পর্যন্ত জর্জ বুরুচাগার গোলে ৩-২ এ ম্যাচ জিতে দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়া।
১৯৯০ এর ইতালি বিশ্বকাপে রোমানিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে থেকেও পরে গোল খেয়ে ম্যাচ ড্র করে আর্জেন্টিনা। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫ মিনিটে গোল দিয়েও ৯ মিনিটে হজম করে। সেই খেলা ২-২ শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে জিতেছিল গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা-আরিয়াল ওর্তেগাদের আর্জেন্টিনা। ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপে স্বাগতিকদের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে রবার্তো আয়ালার হেডে লিড নিয়েও হেরেছিল তারা। ৮০ মিনিটে জার্মানির গোল পরিশোধ। এরপর টাইব্রেকারে হেরে বিদায় হোসে লুইস পেকারম্যানের দলের। এতে দুর্দান্ত দল হওয়া সত্ত্বেও সেমির আগে বিদায় নিতে হয় হার্নান ক্রেসপোদের আর্জেন্টিনাকে। সেই আসরেই অভিষেক হয়েছিল লিওনেল মেসির।
২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দুই দফা লিড নিয়েও তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল। আহমেদ মুসার জোড়া গোলে স্কোর ২-২ করে ফেলে আফ্রিকান দেশটি। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় দফা লিডে ৩-২-এ ম্যাচ জয় মেসিদের। ২০১৮ বিশ্বকাপে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯ মিনিটে লিড নিয়ে এরপর ২৩ মিনিটে হজম। সে ম্যাচে আর জেতাই হয়নি। এরপর নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ১৪ মিনিটে লিড নিয়েও ৫১ মিনিটে গোল খাওয়া। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ২-১-এ জয়। পরবর্তীতে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও এক পর্যায়ে ২-১-এ লিড নিয়েছিল ল্যাটিন আমেরিকার দেশটি। কিন্তু এরপর ৩-৪ গোলে হেরে বিদায়। ২০২২ সালে সৌদি আরবের বিপক্ষে এগিয়ে থেকেও হার। নকআউট পর্বে এসেও সেই ধারা অব্যাহত ছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডস এবং ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে দুই গোলে লিড নিয়েও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে জিততে হয়েছিল লিওনেল স্কালোনি বাহিনীকে। উল্লেখ্য নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ১২০ মিনিটের খেলা ২-২-এ শেষ হয়েছিল। আর ফ্রান্সের বিপক্ষে ৩-৩-এ।
এবারের বিশ্বকাপে জর্দানের বিপক্ষে এক গোলে লিড নেয়ার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। জর্দান সমতা আনে। ফলে কোচ লিওনেল স্কালোনি নামাতে বাধ্য হন মেসিকে। এরপর ৩-১ গোলে জয়। এরপর নকআউটে এসে কেপ ভার্দের বিপক্ষে দুই দফা লিড নিয়েও ৯০ মিনিটে জিততে পারেনি তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ীরা। দুই দফা পিছিয়েও স্কোর ২-২ করেছিল পশ্চিম আফ্রিকার আটলান্টিক মহা সাগরের দ্বীপ রাষ্ট্রটি। পরে অতিরিক্ত সময়ের গোলে জয় মেসিদের। কোয়ার্টার ফাইনালে লিড নেয়ার পরও তা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বিরতির পর সমতা আনে সুইজারল্যান্ড। এরপর সুইসরা ১০ জনে পরিণত হওয়ার পর রক্ষা। শেষ পর্যন্ত ৩-১-এ জয় ম্যারাডোনার দেশের।
পুরনো সেই বাজে স্মৃতি এখন নিত্যসঙ্গীই হয়ে আছে আর্জেন্টিনার। এখন সেমিতে প্রথমে ইংল্যান্ড বাধা এবং পরে স্পেন/ফ্রান্স বাধা। এই দুই হার্ডল ডিফুয়ে শিরোপা জিতে তা কি ঢেকে দিতে পারবেন মেসিরা।