নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় দেশজুড়ে অস্থিরতা
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন জেলায় সহিংসতা, হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর অব্যাহত রয়েছে। কোথাও প্রতিপক্ষের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, কোথাও রাজনৈতিক কার্যালয় ভাঙচুর, আবার কোথাও সাধারণ মানুষের ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। এসব ঘটনার মধ্যে খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, ভোলা ও বগুড়ায় রাজনৈতিক বিরোধ, সমর্থক-কর্মীদের ওপর হামলা এবং ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
খুলনায় জামায়াত সমর্থকের বাড়িতে আগুন
খুলনা ব্যুরো জানিয়েছে, খুলনার ফুলতলা উপজেলার আটরা গিলাতলা ইউনিয়নের মশিয়ালী গ্রামে গত শনিবার রাত দেড়টার দিকে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক শোকর আকুঞ্জির বাড়িতে আগুন দেয়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়রা দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও একটি কাঠের ঘর পুড়ে যায়। জামায়াতের দাবি, নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে। খানজাহান আলী থানার এসআই রুবেল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলা হলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল রোববার স্থানীয় জামায়াত নেতারা সমাবেশ করেন। শোকর আকুঞ্জি সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।
জীবননগরে টানা হামলা-ভাঙচুর
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সংবাদদাতা জানিয়েছে, উপজেলায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। একটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নে হামলা, মারধর, দোকান বন্ধ, রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভাঙচুর ও দখলচেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল রোববার সকালে হাসাদহ ইউনিয়নের বকুন্ডিয়া গ্রামের একটি হিন্দু পল্লীতে ভাঙচুরের চেষ্টা চালানো হয় বলে স্থানীয়রা জানান। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এর আগে রায়পুর ইউনিয়নে স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কবির হোসেন হামলার শিকার হন। রায়পুর বাজারে দুই ব্যবসায়ীকে মারধর ও দোকান বন্ধের অভিযোগ রয়েছে। হাসাদহ ইউনিয়নে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগও ওঠে। জীবননগর প্রেস ক্লাব দখলচেষ্টা ঘিরে সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন আহত হন। বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ রয়েছে। ওসি সোলায়মান শেখ জানান, লিখিত অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং এলাকায় অতিরিক্ত নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
দিনাজপুরে আওয়ামী লীগ অফিসে অগ্নিসংযোগ
দিনাজপুর প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য অনুসারে, প্রায় ২০ মাস পর দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রোববার সকাল ১০টার দিকে দলীয় নেতাকর্মীরা কার্যালয়ে অবস্থান নেন। বিকেলে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে একদল ব্যক্তি সেখানে গিয়ে অগ্নিসংযোগ করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সকালে কার্যালয়ে জেলা আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। বিকেলের ঘটনায় ফ্যাসিবাদবিরোধী স্লোগান দেয়া হয় বলে জানা গেছে।
জামায়াত নেতার বাড়িতে আগুন
অন্য দিকে দিনাজপুর সদর উপজেলায় জামায়াত নেতা জুয়েল রানার বাড়িতে গত শনিবার রাতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। তিনি শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতিও। জুয়েল রানা জানান, বাড়ির সামনে একটি পিকনিক চলাকালে বিভিন্ন স্লোগান দেয়া হচ্ছিল। তবে কে আগুন দিয়েছে তা নিশ্চিত নন। জেলা জামায়াত এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে।
সাতক্ষীরায় সমর্থকদের সংঘর্ষে আহত ৫
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানিয়েছে, সাতক্ষীরা-৩ আসনে পরাজিত দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে পাঁচজন আহত হয়েছেন। গত শনিবার সন্ধ্যায় কালীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের ফতেপুর বাঁশতলা বাজারে এ ঘটনা ঘটে। স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা: শহিদুল আলমের সমর্থকদের অভিযোগ, প্রতিপক্ষ অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুরেরও অভিযোগ রয়েছে। থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। ওসি জুয়েল হোসেন জানান, তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভোলার বোরহানউদ্দিনে হামলার অভিযোগ
ভোলা প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য অনুসারে, ভোলা-২ আসনের বোরহানউদ্দিন উপজেলায় একাধিক হামলার অভিযোগ উঠেছে। হাসাননগর ইউনিয়নে জামায়াতের এজেন্ট হওয়ায় ছেলেকে না পেয়ে বাবাকে মারধরের অভিযোগ রয়েছে। কাচিয়া ইউনিয়নে একাধিক ব্যক্তিকে রড দিয়ে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট কাজী মো: আজম বলেন, দলীয়ভাবে কোনো সহিংসতার নির্দেশ দেয়া হয়নি। কেউ অতিউৎসাহী হয়ে থাকলে ছাড় দেয়া হবে না।
বগুড়ার শিবগঞ্জে মারধর, ভিন্ন দাবি
শিবগঞ্জ সংবাদদাতা জানিয়েছে, বগুড়ার শিবগঞ্জে গোলাম রাব্বানী নামে এক ব্যক্তি মারধরের শিকার হন। তিনি অভিযোগ করেছেন, ধানের শীষ প্রতীকে প্রচারণায় অংশ নেয়ার কারণে তাকে হামলা করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে। শিবগঞ্জ থানার ওসি ফরিদুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেছে, তদন্ত চলছে।
নলডাঙ্গায় বৃদ্ধকে হাতুড়ি পেটা
নাটোরের নলডাঙ্গা সংবাদদাতা জানিয়েছে, নলডাঙ্গা উপজেলার ৪নং পিপরুল ইউনিয়নে সূর্যবাড়ি এলাকায় এক বৃদ্ধকে গত শনিবার হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করেছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাকে নাটোর সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী বাড়ি ফেরার পথে চারজন বিএনপি কর্মী হাতুড়ি, রড দিয়ে পিটিয়ে তাকে জখম করে।
ভুক্তভোগী বৃদ্ধ বলেন, ‘জামায়াতকে ভোট দিয়েছি এই সন্দেহে তারা আমাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়েছে। আগে বিএনপি করেছি কিন্তু এখন আর কোনো দল করি না। আমি কৃষক মানুষ কৃষি কাজ করে খাই।’ হামলাকারীরা হলো সূর্যবাড়ি গ্রামের ছাত্রদল নেতা মো: জনি হোসেন, ছাত্রদল কর্মী মো: বরকত আলী এবং একই গ্রামের বিএনপি নেতা মো: আক্কাস আলী।
হাতিয়ায় নির্যাতিত নারী পুলিশ পাহারায়
নোয়াখালী অফিস জানায়, জেলাটির হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নে শাপলা কলি প্রতীকে ভোট দেয়ার অভিযোগে এক নারী শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আহত বিবি কুলসুম বর্তমানে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং তাকে পুলিশ পাহারায় রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ধানের শীষ প্রতীকের কর্মীরা তাকে নির্যাতন করে। শনিবার সকালে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডা: রাজিব উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ছাগলনাইয়ায় গরু ও খড়ের গাদায় আগুন
ছাগলনাইয়া সংবাদদাতা জানায়, ফেনীর ছাগলনাইয়ায় শনিবার গভীর রাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের এক সমর্থকের গোয়ালঘর ও খড়ের স্তূপে আগুন দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নের চম্পকনগর গ্রামে কারুল হাসানের গোয়ালঘরে আগুন লাগানো হলে দুইটি গরুর শরীরের অংশ পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্তরা লক্ষাধিক টাকার ক্ষতির দাবি করেছেন।
এর আগে শুক্রবার রাতে পৌরসভার পূর্ব ছাগলনাইয়া ওয়ার্ডে জামায়াতের সহসভাপতি নুরুজ্জামানের তিনটি খড়ের গাদা পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফেনী জেলা ও উপজেলা জামায়াতের নেতারা ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা দেন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
বিয়ানীবাজারে বাড়িঘরে হামলা
বিয়ানীবাজার সংবাদদাতার পাঠানো তথ্য অনুসারে, সিলেট-৬ আসনের বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ এলাকায় নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেছেন দুই প্রার্থী। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, বিএনপি ও তালামীযের কর্মীরা জামায়াত নেতাকর্মীদের অন্তত ছয়টি বাড়িতে হামলা ও হুমকি দিয়েছে। তিনি প্রশাসনের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান এবং বলেন, শক্ত পদক্ষেপ না নিলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
অন্য দিকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী অভিযোগগুলো তদন্তের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিএনপির নাম ব্যবহার করে কেউ অপকর্ম করলে তা বরদাশত করা হবে না। তিনি দাবি করেন, পূর্ব বিরোধের জেরে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে, তবে রাজনৈতিক রেশারেশি চান না। তিনি স্বাস্থ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, নদীভাঙন ও শিক্ষা খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন।
এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর অফিসার ইনচার্জরা (ওসি) জানিয়েছেন, প্রতিটি ঘটনার অভিযোগ গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনেক জায়গায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ।