সাক্ষাৎকার : ড. মাহবুবুল হক

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে পিপলস ডিপ্লোম্যাসি জরুরি

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মাহবুব মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ এবং ইন্দোনেশিয়ার অনাগরিকদের অধিকারের জন্য গবেষণা এবং ওকালতির কাজ করছেন।

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition
Mahbubul-Haque
ড. মাহবুবুল হক | সংগৃহীত

গবেষক ও শিক্ষক ড. মাহবুবুল হক বলেছেন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সরকার পর্যায়ে যে কূটনীতি চলছে তা রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে যথেষ্ট নয়। কিন্তু দুটি দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বা পিপলস ডিপ্লোম্যাসি সরকারি প্রচেষ্টার সাথে কার্যকরভাবে যোগ হলে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধান সম্ভব। সেগুনবাগিচার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে নেইপেডোর যোগাযোগ, দুইটা মিটিং অথবা একজন মন্ত্রীর আসা যাওয়া ও কয়েকটা বৈঠকের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসন সম্ভব নয়। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্বেষ ও অবিশ্বাস এক ঐতিহাসিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যা একদিনে দূর করা সম্ভব না। দুটি দেশের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান প্রদান, বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করে অবিশ্বাস ও সন্দেহ কমিয়ে আনতে হবে। বর্তমানে দুটি দেশের সমস্যা অনেকটা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেকার সম্পর্কের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বাধা নিজেদের স্বার্থেই জনগণের পর্যায় থেকে দুই দেশকে অতিক্রম করতে হবে। ড. মাহবুবুল হক নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।

ড. মাহবুবুল হক বলেন, আলোচনা ও সম্পর্ক উন্নয়নের মধ্য দিয়েই মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মিয়ানমারের সাথে সমস্যাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তা নিরসনে অব্যাহতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এবং সন্দেহটা থাকবে না যদি আমরা আমাদের লেভেলে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি। তৃতীয় কোনো শক্তি আসার সুযোগ নেই, ভয়ও নেই, এ আসবে ও আসবে করিডোর হবে ইত্যাদি। আর তা না হলে তৃতীয় শক্তি, চতুর্থ শক্তি, পঞ্চম শক্তি এখানে আসবে, তারা তাদের স্বার্থে ভূকৌশলগত রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চেষ্টা করবে। আমরা দ্বিপাক্ষিকভাবে সমস্যা সমাধান করলে অন্যদের এখানে সুযোগটা কমে যাবে।

ড. মাহবুবুল হক বর্তমানে মালয়েশিয়ার সুলতান জয়নাল আবিদিন (UNISZA) বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অনুষদে কর্মরত। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মাহবুব মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ এবং ইন্দোনেশিয়ার অনাগরিকদের অধিকারের জন্য গবেষণা এবং ওকালতির কাজ করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর এবং থাইল্যান্ডের মাহিদোল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানবাধিকারে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে, ২০১৪ সালে, তিনি থাইল্যান্ডের একই ইনস্টিটিউট থেকে মানবাধিকার ও শান্তি অধ্যয়নে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তার অসংখ্য গবেষণা নিবন্ধ, বই রয়েছে। এসব প্রবন্ধের ২০টি রোহিঙ্গা সম্পর্কিত।

ড. মাহবুবুল হক মনে করেন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এমনকি ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে কাজ করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে যাতে প্রতিবেশী মিয়ানমারের জনগণের সাথে বাংলাদেশের জনগণের সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস দূর হয়ে যায়। দুটি দেশের মধ্যে যে সামরিক সমস্যা রয়েছে এটা সত্যি যেমন আমাদের সীমান্তে ল্যান্ড মাইন পুঁতে রাখা হয়, এ ধরনের মাইন পুঁতে রাখার ব্যাপারে আমাদের একটা আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা আছে যা মিয়ানমারের ক্ষেত্রে নেই। কারণ বহু দিন বহু দশক ধরে মিয়ানমার একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। এই যুদ্ধ কখনো বাড়ে কখনো কমে।

নয়া দিগন্ত : রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধান নিয়ে মিয়ানমার এ যাবৎ কেবল আশ্বাসই দিচ্ছে যা কখনো বাস্তবে পরিণত হচ্ছে না, উপায় কি?

ড. মাহবুবুল হক : রোহিঙ্গাদের কথা বললেই মিয়ানমার খুব সেনসেটিভ হয়ে ওঠে। ওদের সাথে আমাদের এই প্রধান সমস্যার পাশাপাশি সীমান্ত বাণিজ্য বৃদ্ধি করতে হবে, এগুলোকে আরো অফিসালাইজ করতে হবে। বাংলাদেশের পাঁচজন সাংবাদিক নেইপেডোতে গেলে, এখানে ওদের সাংবাদিকরা এলে, দুটি দেশের সংবাদপত্র ও মিডিয়ার মধ্যে পেশাগত সম্পর্ক ও খবর আদান প্রদান হবে। ওদের মিডিয়ায় বাংলাদেশের সংবাদ গুরুত্ব পায় না বললেই চলে। ফলে অনেকগুলো মিসইনফরমেশন আছে যা দুই দেশের মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। বিশেষ করে পর্যটন, বাংলাদেশ থেকে মাত্র এক ঘণ্টার জার্নি হচ্ছে রেঙ্গুনে যাওয়া। মাঝে মধ্যেই দু’দেশের মধ্যে বিমান চালু আবার রাজনৈতিক সঙ্কটে তা বন্ধ হয়। রেঙ্গুনে গেলে আপনি খুব একটা বোধ করবেন না যে বাংলাদেশের বাইরে আছেন, বিশেষত পুরনো রেঙ্গুন ও পুরনো ঢাকার মধ্যে বেশ মিল। ভবনগুলো দেখলে মনে হবে দক্ষিণ এশিয়ার ভেতরেই আছেন। লুঙ্গি পরা মিয়ানমারের নাগরিকরা পান খেয়ে রাস্তায় হাঁটছে। ভারতের শেষ স্বাধীন সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধি বলেন আর মিয়ানমারের কেন্দ্রে বাংলায় লেখা দেখতে পাবেন বাঙালী সুল্লি মসজিদ। এটা কি দিল্লিতে দেখা যাবে, লাহোরে তো পাবেন না। মিয়ানমারে গেলে যে পরিমাণ বাংলাদেশী ফ্লেভার পাবেন ওদের জীবনযাত্রায় এটাকে রিস্টোর করতে হবে। সম্পর্ককে আবার জাগিয়ে তোলার মাধ্যেমে চাঙ্গা করে তোলা গেলে পারস্পরিক অবিশ্বাসও কমতে থাকবে।

নয়া দিগন্ত : আন্তঃধর্মীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৌদ্ধ সংগঠনগুলো তো ভূমিকা রাখতে পারে

ড. মাহবুবুল হক : খুবই সত্য কথা। কিন্তু মিয়ানমারে বৌদ্ধদের মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষটা এতটা কঠিন মাত্রায় বিরাজ করছে যে তার জন্যে গভীর যোগযোগ জরুরি। ১৯৪২ সালে মিয়ানমারের আরাকানে গণহত্যার সময় ব্রিটিশদের পক্ষে থাকে রোহিঙ্গারা, আর বৌদ্ধরা থাকে জাপানের পক্ষে। যুদ্ধের পর রোহিঙ্গারা আপারহ্যান্ডে চলে যায়, ব্রিটিশরা রোহিঙ্গাদের পৃথক দেশ বা অটোনমি দেয়ার কথা বললেও তা পারেনি। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আলোচনা হয় যে বার্মার জন্যে যে মানচিত্র তৈরি করা হচ্ছে এটা খুব সমস্যাপ্রবণ হবে এবং গণ্ডগোল লেগেই থাকবে। ফলে রোহিঙ্গারা নতুন দেশ পায়নি আরাকানে, মিয়ানমারের অটোনমি পায়নি আবার পাকিস্তানের সাথে যুক্তও হতে পারেনি। এই সঙ্কটের ধারাবাহিকতা ২০২৫ সালে এসে রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়, যথেষ্ট সময় দরকার। এরপর বুড্ডিইজমকে মিয়ানমারে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। বুড্ডিইজম তো আসলে এ রকম না। থাইল্যান্ডে বুড্ডিইজমের চেহারা আর মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কায় বুড্ডিইজমের চেহারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ডেফিনিটলি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোচনার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ দূর করার একটা বিরাট সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশী মানুষ কখনোই মিয়ানমার বিদ্বেষী না। দুই দেশের বৌদ্ধরা মিলে এর একটা সমাধানের পথ রচনা করতে পারে। বাংলাদেশীরা বৌদ্ধবিরোধী এমন অমূলক ধারণ বিরাজ করছে মিয়ানমারে। সেটাও দূর করা দরকার। এগুলোতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটা দেড়টা বা আড়াই মিটিং দিয়ে করা যাবে না।

নয়া দিগন্ত : একবার তো নাসাকা বাহিনী বাংলাদেশের সীমান্তের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়লে যুদ্ধ বেঁধে যায়, এমন যুদ্ধংদেহী মনোভাবে কিভাবে সম্পর্ক উন্নয়ন করা যায়?

ড. মাহবুবুল হক : এ রকম বহু যুদ্ধ থাইল্যান্ডের সাথে মিয়ানমারের হচ্ছে। থাই এথনিক আর্মগ্রুপের সাথে মিয়ানমারের সংঘর্ষ হচ্ছে প্রতিনিয়ত আবার দুই দেশের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক বিরাজ করছে। বাংলাদেশে অতীতে বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সম্মেলন করে কিন্তু কখনো মিয়ানমারের কোনো রাজনৈতিক ডেলিগেটকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। যদিও খুব কম সময়ে মিয়ানমারে ডেমোক্রেসি চালু ছিল। বিদ্বেষটা দু’দেশের মধ্যে একেবারে রুলসে পরিণত হয়ে গেছে। সারাক্ষণ যদি বলি যুদ্ধ, অবিশ্বাস তাহলে তো দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন হবে না। একসময় কিন্তু ঢাকায় মিয়ানমারের ফুটবল দল খেলতে আসত। রেঙ্গুন ও ঢাকা ভার্সিটির মধ্যে যদি দু’দেশের পাঁচজন করে ছাত্রকে বৃত্তি দেয়া হয় তাহলে তো দুই দেশের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি দূর হওয়ার একটা অবকাশ তৈরি হয়। কক্সবাজার গেলে আমরা বার্মিজ আচার কিনে খাই। সীমান্ত পেরিয়ে আরাকান থেকে এসে ওরা ওষুধ কিনে নিয়ে যায়। চাল, ছোলা ডালের সঙ্কট হলে আমরা আমদানি করি। দুটি দেশের মধ্যে ফুড ফেস্টিভ্যাল হতেই পারে। বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক কর্মীদের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। বাংলাদেশী বিদ্বেষ এমন পর্যায়ে যে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করা হয়। যখন জাতিসঙ্ঘে এ গণহত্যার শুনানিতে অংসাং সুচি গিয়েছিলেন তখন বৌদ্ধরা বিরাট সমাবেশ ও মিছিল করে তাকে সমর্থন জানিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে তিক্ততা বছরের পর বছর বেড়েছে। অথচ মিয়ানমারের সংসদে একসময় রোহিঙ্গা প্রতিনিধিও ছিল। থাইল্যান্ডের নেতা থাকসিন সিনাওয়াত্রার প্রভাব মিয়ানমারের ব্যাপক। বাংলাদেশ এটিকে কাজে লাগাতে পারে। দলীয় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি নয় জুলাই কনসেনসাস কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক নতুন করে গড়তে হবে। প্রতিবেশীর সাথে বন্ধুত্বের বাতাবরণ তৈরি করে সঙ্কট থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কারণ রাজনীতির বাইরেও সামাজিক একটা জায়গা আছে।

নয়া দিগন্ত : যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার মতো পরাশক্তির দেশগুলোর ভূকৌশলগত স্বার্থ রক্ষার একটা প্রতিযোগিতা চলছে, সেক্ষেত্রে প্রতিবেশী এই দেশটির সাথে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা তো বেশ চ্যালেঞ্জের.... বাংলাদেশকে কেউ ব্যবহার করে তাদের ভূকৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় আগাতে চায় এমন পরিস্থিতিতে আমাদের কী করণীয়?

ড. মাহবুবুল হক : মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক এই কারণেই মজবুত করে তোলা জরুরি। যাতে তৃতীয় কোনো দেশ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মিয়ানমারকে ব্যবহার করতে না পারে। সম্পর্ক উন্নয়ন, সঙ্কট নিরসনে দুই দেশের মধ্যে দরকষাকষি ও পারস্পরিক আলোচনা অব্যাহত থাকলে, দ্বিপক্ষীয়ভাবে আগাতে পারলে, কোনো এক্সটার্নাল শক্তি এ ধরনের সুবিধা করতে পারবে না। সমস্যা মিয়ানমার ও বাংলাদেশের, যদি এ দু’টি দেশ নিজেদের মধ্যে তা নিরসন করতে পারে তাহলে তো অন্য কাউকে এখানে আনতে হয় না। দুটি দেশই স্বাধীন রাষ্ট্র, সমস্যা আছে, সঙ্কট নিরসনের পথও খুঁজে বের করার সুযোগ আছে, আর যদি অতীতের মতো সরকার দিল্লির কাছে হাত ও পা বন্ধক দিয়ে আসে তাহলে তো স্বাধীনভাবে আমরা পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে পারব না। এটা করতে না পারলে বাইরের অন্য কোনো দেশ এখানে ইন্টারফেয়ার করার সুযোগ নেবেই।

নয়া দিগন্ত : দীর্ঘ মেয়াদে তো প্রতিবেশীকেই নিয়ে যে কোনো দেশকে অবস্থান করতে হয়।

ড. মাহবুবুল হক : দেখেন করিডোর বলেন আর আমেরিকার বার্মা অ্যাক্ট বলেন এ ধরনের প্রস্তাব আসবে একটার পর একটা। হয়তো একটা ঠেকানো যাবে, অন্যটা ঠেকানো যাবে না। যদি প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ না থাকে, অবিশ্বাস না থাকে, শ্রদ্ধা থাকে, তাহলে তো বাইরের কেউ এখানে আসতে পারবে না। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আমরা না রাখতে পারলে বাইরের দেশ তাদের স্বার্থেই তা করবে। মিয়ানমারের সাথে চীন ও ভারত যদি সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে পারে তাহলে আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও চেষ্টা করব সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে। চীন ও ভারতের সাথে মিয়ানমারের অনেকগুলো এস্টেট সীমান্ত লাগোয়া, থাইল্যান্ডের সাথেও তাই। আমাদের সাথে প্রধানত রাখাইনের সাথে সীমান্ত, সামান্য কিছু হয়তো চিন এস্টেটের সাথে। আবার মিয়ানমারের চিন ও ভারতের মিজোরাম এস্টেট বা রাজ্য লাগোয়া। এ দু’টি দেশের দু’টি রাজ্যের জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে খুব একটা বড় পার্থক্য নাই। ভারতের মনিপুরের গণ্ডগোলের সূত্রপাত কিন্তু ঘটে চিন এস্টেট থেকে। মিয়ানমারের চিন এস্টেট খুব বড় হলেও লোকসংখ্যা খুব কম। বেলুচিস্তানের মতো। এক পাহাড়ে কিছু মানুষ আরেক পাহাড়ে কিছু। চিন এস্টেটটা আবার খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রথম যখন মিয়ানমারে যাই তখন বিষয়টি ঠাহর করতে পারি যে চিনের পাশাপাশি ভারতের মিজোরামও খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই থ্রেটগুলো কিন্তু আছে।

নয়া দিগন্ত : মিয়ানমারের সাথে থাইল্যান্ড সীমান্তে সংঘর্ষ হয়, মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিচ্ছে কিন্তু মিয়ানমারের সাথে ওদের সম্পর্ক বেশ ভালই তো মনে হয়।

ড. মাহবুবুল হক : আসিয়ান জোটে এসব দেশ থাকার কারণে তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো। মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে খুব শক্ত কথা বলছে মিয়ানমারের সাথে কিন্তু তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ৫ আগস্টের পর ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্কের যে অবনতি সেইটা ওসব দেশের মধ্যে নাই। সত্তর দশক থেকে থাইল্যান্ডে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী গিয়েছে। নতুন শরণার্থী থাইল্যান্ড নিচ্ছে না। থাইল্যান্ডে মিয়ানমার থেকে শরণার্থী গেলে ১৫ দিন বা একমাস রেখে তারপর আবার ফেরত পাঠাচ্ছে। ভারত পাকিস্তানের মতো থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার সীমান্তে অনেকগুলো যুদ্ধ হয়েছে তারপরও দুটি দেশের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক বিরাজ করছে। মালয়েশিয়ার সিনিয়র কর্মকর্তারা বলে যে রোহিঙ্গা সঙ্কটে আসিয়ানে তারা সবচেয়ে বড় ভিক্টিম। আমি তাদের বলেছি বাংলাদেশের চেয়ে বড় ভিক্টিম তো নয়। এদিক থেকে মালয়েশিয়া একমাত্র দেশ রোহিঙ্গা সঙ্কটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

নয়া দিগন্ত : সিঙ্গাপুরের সাথে মিয়ানমারের সম্পর্ক তো ভালোই মনে হয়।

ড. মাহবুবুল হক : মজার ব্যাপার হচ্ছে মিয়ানমারে সিঙ্গাপুর সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে। জাপানও বড় বিনিয়োগ করেছে মিয়ানমারে। তো রোহিঙ্গা নিয়ে এ দুটি দেশ কখনো বড় উদ্যোগ নিতে চায় না। বরং তুরস্ক ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে চাপ দিয়ে আসছে। মুসলিম স্বার্থকে সংরক্ষণের জন্যে তুরস্ক কাজ করে। আবার দেখেন পাকিস্তান মিয়ানমারে জঙ্গি বিমান বিক্রি করলেও করাচিতে বিশাল বার্মা কলোনি রয়েছে বাংলাদেশের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম। ষাট ও সত্তরের দশক থেকে করাচিতে রোহিঙ্গারা যেতে শুরু করে।