ভারতের বারুইপুরে মুসলিম নাবালিকাকে ধর্ষণের পর হত্যা

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৬৩ ধারা জারি

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ভারতের পশ্চিমবাংলার বারুইপুরে মুসলিম নাবালিকাকে ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বারুইপুর, নরেন্দ্রপুর ও সোনারপুর এলাকায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি রয়েছে। এ দিকে প্রধান অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সোমবার বারুইপুর এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। এই ঘটনায় মোট গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়াল তিন। পুলিশ জানিয়েছে, আরো কয়েক জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অন্য দুই ধৃতের নাম প্রভাস মণ্ডল ও দিবাকর সর্দার।

গত শনিবার থেকে নিখোঁজ ছিল ১২ বছরের ওই কিশোরী। রোববার একটি পুকুর থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়। ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জনতার গণপিটুনিতে এক সন্দেহভাজনের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি রাস্তা ও রেল অবরোধে ব্যাহত হয় স্বাভাবিক জনজীবন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

নাবালিকার লাশ উদ্ধারের পর থেকেই প্রধান অভিযুক্তের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছিল রাজ্য পুলিশের ছয় সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল। রোববার এক অভিযুক্ত গ্রেফতার হওয়ার পর সোমবার সকালে আরো একজনকে ধরা হয়। পরে যৌথ অভিযানে প্রধান অভিযুক্তকেও গ্রেফতার করা হয়।

ঘটনায় দোষীদের কঠোর শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানিয়েছেন, নিহত কিশোরীর পরিবারের সাথে তার কথা হয়েছে এবং ভবানীভবনে কিশোরীর বাবাকে ডাকা হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রথমে তিনটি মামলা দায়ের হলেও পরে রেল অবরোধের ঘটনা ঘিরে আরো একটি মামলা হয়েছে। বর্তমানে মোট চারটি মামলা চলছে। তবে গ্রেফতার হওয়া তিন জনই নাবালিকা হত্যার মামলায় অভিযুক্ত।

শুভেন্দু অধিকারী বলেন, পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে চারজনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং পলাতক অভিযুক্তদের খোঁজে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি জানান, রাজ্য পুলিশের বিশেষ বাহিনী তদন্তে নেমেছে এবং পরিবারের চাওয়া অনুযায়ী সমস্ত সহযোগিতা সরকার করবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গণপিটুনির ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উসকানির ইঙ্গিত মিলেছে। রেললাইন অবরোধ ও ভাঙচুরের ঘটনাও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই ঘটনায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর দুই জওয়ান আহত হয়েছেন এবং একটি পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগানো হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

নিহত কিশোরীর পরিবারের দাবি, তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশ এখনও এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু জানায়নি। রোববার রাতেই লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তদন্তকারীদের বক্তব্য, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে এলেই মৃত্যুর কারণ এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা মিলবে। সেই অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।

আইজি (প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ) কঙ্করপ্রসাদ বারুই জানিয়েছেন, ঘটনায় জড়িত কাউকেই রেহাই দেয়া হবে না। অন্য দিকে, রোববার রাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ির সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারুইপুরে যেতে চেয়েছিলেন এবং তাকে আটকাতেই পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। যদিও প্রশাসনের তরফে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি। একই রাতে নিহত কিশোরীর পরিবারের সাথে ভিডিওকলে কথা বলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পরিবারের সাথে ফোনে কথা বলেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে মুসলিম নারীদের ওপর নির্যাতন ও সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে রাজনৈতিক মেরুকরণ, উগ্র হিন্দুত্ববাদী আদর্শের বিস্তার, এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির মতো জটিল কারণগুলো দায়ী। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই ধরনের অপরাধকে অনেক সময় ধর্মীয় ও সামাজিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।