দুই বছরের আগে বাড়ানো যাবে না বাড়িভাড়া
ডিএনসিসির নির্দেশিকা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
মানসম্মত বাড়িভাড়া কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে দুই বছর পর্যন্ত তা অপরিবর্তিত থাকবে এবং কোনো অবস্থাতেই তার আগে ভাড়া বাড়ানো যাবে না, এমন নির্দেশিকা জারি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
নির্দেশিকায় আরো বলা হয়েছে, ভাড়া বৃদ্ধির সময় নির্ধারণ করা হবে জুন থেকে জুলাইয়ের মধ্যে। জানুয়ারি মাসে ভাড়া বাড়ানো যাবে না। তা ছাড়া দুই বছর পর দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে ভাড়া পরিবর্তন করা যাবে। তবে ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ বাজারমূল্যের ১৫ থেকে ১৭ শতাংশের বেশি করা যাবে না।
গতকাল বাড়িভাড়া সম্পর্কিত ডিএনসিসি নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। এ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বাড়িভাড়া নৈরাজ্য ঠেকাতে ও ভাড়াটিয়াদের অধিকার নিশ্চিত করতে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নতুন নির্দেশিকা জারি করা হলো। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অসামঞ্জস্য, অযৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধি এবং অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রশাসক জানান, আইনটি কার্যকর করার দায়িত্ব মূলত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের হলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধীর ও নিষ্ক্রিয় থাকায় বিভিন্ন সময় অযৌক্তিকভাবে বাড়িভাড়া বেড়েছে। একই সাথে যারা বাড়িভাড়া দিয়ে সংসার চালান, তাদের অধিকারও যথাযথভাবে সুরক্ষিত হয়নি। এসব বিষয় মাথায় রেখে বাড়িওয়ালা, ভাড়াটিয়া, বিভিন্ন এলাকার প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী ও নানা পেশাজীবীদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে নির্দেশিকাটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
আলোচনায় নগরবাসী ও গণমাধ্যমের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার কথাও জানান তিনি। ডিএনসিসি প্রশাসক আরো বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিটি করপোরেশন স্থানীয় পর্যায়ে নির্দেশিকা দিতে পারে। সেই ক্ষমতা ব্যবহার করেই বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয় পক্ষের স্বার্থ ও অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই নির্দেশিকা দেয়া হয়েছে।
বাড়িভাড়া সংক্রান্ত নির্দেশিকার অন্য বিষয়গুলো হলো-বাড়িওয়ালা অবশ্যই তার বাড়িভাড়ার উপযোগী ও বসবাসযোগ্য অবস্থায় রাখবেন। ঝুঁকিপূর্ণ বা নোংরা বাসা ভাড়া দেয়া যাবে না। গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সব ইউটিলিটি সেবার নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সমস্যা হলে বাড়িওয়ালা দ্রুত সমাধান করবেন। বাড়িওয়ালার পূর্বানুমতি সাপেক্ষে ভাড়াটিয়া ছাদ, বারান্দা বা বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় ফুল, ফল ও সবজি চাষ করতে পারবেন। অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্পসহ যেকোনো দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় প্রত্যেক ভাড়াটিয়াকে ছাদ ও মূল ফটকের চাবি শর্তসাপেক্ষে দিতে হবে। ভাড়াটিয়া মাসের ১০ তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করবেন এবং বাড়িওয়ালা প্রতি মাসে ভাড়ার লিখিত রশিদ প্রদান করবেন। ভাড়াটিয়ার যেকোনো সময় বাসায় প্রবেশ ও বের হওয়ার অধিকার সংরক্ষিত থাকবে। নিরাপত্তার অজুহাতে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া যাবে না। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হলে ভাড়াটিয়ার সাথে আলোচনা করতে হবে। ভাড়াটিয়া নির্ধারিত সময়ে ভাড়া দিতে ব্যর্থ হলে প্রথমে মৌখিক সতর্কতা, পরে লিখিত নোটিশ দিতে হবে। বকেয়া পরিশোধ না করলে দুই মাসের নোটিশে চুক্তি বাতিল করা যাবে। আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ দুই মাসের নোটিশ দিয়ে ভাড়াচুক্তি বাতিল করতে পারবে। বাড়িভাড়া নেয়ার সময় এক থেকে তিন মাসের বেশি অগ্রিম নেয়া যাবে না। ভাড়াচুক্তি অবশ্যই লিখিত হতে হবে, যেখানে ভাড়া, অগ্রিম, ভাড়া বৃদ্ধির শর্ত ও বাসা ছাড়ার নিয়ম উল্লেখ থাকবে। সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে বাড়িওয়ালা সমিতি ও ভাড়াটিয়া সমিতি গঠন করতে হবে। যেকোনো বিরোধ প্রথমে ওয়ার্ড পর্যায়ে সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। সেখানে সমাধান না হলে জোনাল অফিসে বিষয়টি নেয়া যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, নির্দেশিকাটি কার্যকর করতে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হবে। সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটে বাড়িভাড়া চুক্তিপত্রের একটি নমুনা প্রকাশ করা হবে, যা বিনামূল্যে ডাউনলোড করা যাবে। এ ছাড়া জোন অফিস, ওয়ার্ড অফিস, মসজিদ, হাউজিং সোসাইটি ও বাড়িওয়ালা সমিতিতে নির্দেশিকাটি সার্কুলেট করা হবে। ব্যানার, লিফলেট ও ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমেও নগরবাসীর কাছে এ বার্তা পৌঁছে দেয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, ঢাকায় বাড়িভাড়া ও ভাড়াটিয়া-বাড়িওয়ালা সম্পর্ক নিয়ে আগে কখনো এভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এখনই এই বিষয়গুলো সমাধানের উপযুক্ত সময়। এই নির্দেশিকার মাধ্যমে রাজধানীতে একটি ন্যায্য, সহনশীল ও সুষম বাড়িভাড়া ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে।