টেন্ডার ছাড়া প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও বিতর্কিত জমি ক্রয়

ডিএই-ব্র্যাক ব্যাংক প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ ও ১৩ কোটির তহবিলে ‘অনিয়ম’

Printed Edition

কাওসার আজম

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে (ডিএই) ব্র্যাক ব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত ‘পার্টনারশিপ ইন ব্র্যাক ব্যাংক-ডিএই কৃষি উন্নয়ন’ প্রকল্পে নিয়োগ, জমি ক্রয়, অবকাঠামো নির্মাণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ১৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পে কোনো বিজ্ঞপ্তি ও প্রতিযোগিতা ছাড়াই অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তাকে পরামর্শক নিয়োগ, টেন্ডার ছাড়া ভবন নির্মাণ এবং ক্রেতা-বিক্রেতা এক ব্যক্তি হয়ে জমি কেনার তথ্য মিলেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিসিএস কৃষি ক্যাডারের ১৩তম ব্যাচের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. বিজয় কৃষ্ণ বিশ্বাস অবসরের পর কোনো উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি ছাড়া রাতারাতি এ প্রকল্পের পরামর্শক বনে যান। শুরুতে তার মাসিক ভাতা ৭৫ হাজার টাকা থাকলেও দুই দফায় বাড়িয়ে তা এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা করা হয়।

সবচেয়ে গুরুতর অনিয়ম দেখা গেছে নাটোরের বড়াইগ্রামে প্রশিক্ষণকেন্দ্রের জন্য জমি কেনায়। গত ১৯ মে সম্পন্ন ৯৪১/২০২৬ নম্বর সাফ-কবলা দলিলের তথ্য অনুযায়ী, বাটরা কুণ্ডুপাড়া কৃষি উন্নয়ন সমবায় সমিতির নামে জমিটি কেনা হয়। বিক্রেতা মো: আব্দুল মজিদ নিজেই ওই সমিতির সভাপতি, অর্থাৎ ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষেই একই ব্যক্তি ছিলেন। এ ছাড়া সরকারি কোনো টেন্ডার ছাড়াই মুকসুদপুর ও বড়াইগ্রামে ৪৫ লাখ টাকার দু’টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।

প্রকল্পটিতে এনজিওর মতো ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। ডিএইর সাবেক মহাপরিচালক মো: আসাদুল্লাহ জানান, ঋণ দেয়া ও আদায় করা ডিএইর বিধিবদ্ধ কাজের অংশ নয় এবং ভবিষ্যতে খেলাপি হলে এর দায় অস্পষ্ট। অধিদফতরের প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের উপপরিচালক মো: নজরুল ইসলাম জানান, প্রকল্পে কোনো সরকারি বা রাজস্ব অডিট হয় না, সম্পূর্ণ হিসাব ব্র্যাক ব্যাংক পরিচালনা করে। তবে ডিএইর মহাপরিচালক মো: আব্দুর রহিম ঋণ আদায়ের উচ্চ হারকে ইতিবাচক দাবি করলেও টেন্ডার ছাড়া নির্মাণের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের ওপর দায় ঠেলেছেন।

দলিল অনুযায়ী, বিক্রেতা মো: আব্দুল মজিদ। তিনি প্রকল্পে কর্মরত আলম আলীর বাবা এবং একই সাথে বাটরা কুন্ডুপাড়া কৃষি উন্নয়ন সমবায় সমিতির সভাপতি। অর্থাৎ যে সমিতির নামে জমি কেনা হয়েছে, সেই সমিতির সভাপতিই জমিটির বিক্রেতা। এতে একই ব্যক্তির বিক্রেতা এবং ক্রেতাপক্ষের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে।

অভিযোগের বিষয়ে ড. বিজয় কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, কোনো গ্রুপ জায়গা দিতে না পারায় স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার উদ্যোগে জায়গা খোঁজা হয়। পরে গ্রুপের সভা ও রেজুলেশনের মাধ্যমে জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ওই উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা এখন এই প্রকল্পের মনিটরিং অফিসারের দায়িত্বে।

প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণসহ বিভিন্ন কেনাকাটায় প্রকল্পের অস্থায়ী জনশক্তি আলমের ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে-এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, কোটেশনের মাধ্যমে কাজ হয়েছে। দু’টি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের জন্য আনুমানিক ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। পিপিপির আওতায় হওয়ায় টেন্ডার ছাড়াই নির্মাণ করা হচ্ছে।

ডিএইর মহাপরিচালক মো: আব্দুর রহিম বলেন, তিনি কয়েকটি এলাকায় প্রকল্পের কৃষক গ্রুপ ও ঋণ কার্যক্রম সরেজমিনে দেখেছেন। তার কাছে অংশীদারিত্বভিত্তিক ব্যবস্থা কার্যকর ও ইতিবাচক মনে হয়েছে। ঋণ পরিশোধের হারও প্রায় ৯৫ থেকে ১০০ শতাংশ বলে জানান তিনি। তবে টেন্ডার ছাড়া প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ভবন দু’টি কোন প্রক্রিয়ায় নির্মাণ করা হয়েছে, ডিপিপিতে কী ব্যবস্থা ছিল এবং বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা প্রকল্প পরিচালকই বলতে পারবেন।

অডিট ব্যবস্থা নিয়েও রয়েছে অস্বচ্ছতা। প্রকল্প পরিচালক ও ডিএইর প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের উপপরিচালক মো: নজরুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের আর্থিক বিষয় ও নথিপত্র ব্র্যাক ব্যাংক দেখে। ব্যাংকের প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ে গিয়ে গ্রুপগুলোর কার্যক্রম যাচাই ও ক্রসচেক করেন। সরকারি অডিট বিভাগের অডিট হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাজস্বের অডিট নাই।’