দিগন্ত সাহিত্য কবিতাবলী
Printed Edition
সৈয়দ সাইফুল্লাহ শিহাব
হাদির মৃত্যুতে
সেদিন হাদির মৃত্যুতে জীবন্ত হলো যেন প্রবীণ পৃথিবী
চিল শকুনের মুখে বিষ ছিটিয়ে, উর্বর
হলো সবুজ ঘাসের ডগা।
পল্টন অথবা শাহবাগ আজ
একটি ছায়াদার বটগাছ,
ইনসাফের ট্রেনে সারি সারি পিঁপড়ার মিছিল।
বদলে যাওয়া দেশ
শীতের বদলে বৈশাখের ঝড়,
রক্তিম সূর্যের কাছে যেতে
একে একে পিপীলিকাগুলো
তৈরি হচ্ছে শহীদি নেশায়।
হাদির মৃত্যু সর্ব মৃত্যুকে বহন করে
রঙিন করেছে প্রজাপ্রতি ডানা,
সে এখন মোরাকাবা করে সম্ভ্রান্ত গুহায়।
ও বন্ধু, আমি তো দেখেছি গুহার দুয়ারে
একটি লাল সূর্য সমুদ্রের মতো ঢেউ খেলছে।
ওমর বিশ্বাস
মুখোমুখি রোদ আর শীত
কুয়াশায় ভারী হওয়া আকাশ কুমড়োমুখী হয়ে আছে
শীত আরো বেড়ে যাচ্ছে পৌষের আগেই
ভালো করে আসতে পারেনি সূর্য
তাহলে আকাশেরও কি অসুখ হয়!
সারাদিন রোদের দেখা মেলে না এই কয়দিন
মুয়াজের ভাষায় রাত কি সাদা হয়ে আছে অনেক বেশি
কিছুই দেখা যাচ্ছে না- মানে তাই শীত অনেক বেশি!
আমি বলি ওটা সাদা রংটং কিছু না- কুয়াশা।
আকাশের মনটা এখনো বোঝা যায়নি ভালো করে
সারাদিন মেপে মেপে রোদের ভাষা বুঝতে পারিনি একটুও
রোদ বলেছিল এই এসে যাবে আরেকটু অপেক্ষা যেন করি
তার নাকি শীতের সাথে দারুণ ভাব গলায় গলায় দস্তি।
কি জানি কেন এমন লুকোচুরি দূরে দূরে থাকা
রোদ আর শীতের বন্ধুত্ব আজকাল কমই দেখা যায়
তারাও কি রাজনীতি করে মানুষের মতো! তারাও কি রাজনীতিক!
তাহলে তাদের দু’জনের কেন মুখ দেখাদেখি থাকবে না!
রোদ আর শীত মুখোমুখি নয় আগের মতোই থাকো মিলেমিশে
আমাদের নিয়ে রাজনীতি করলে আমাদের স্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ ভেবেছ!
শাহনাজ পারভীন
হাদির কবর
হাদির কবর কবিতার মতো, জানাজায় ভেসে যাই-
জীবন্ত তাকে চিনি নি তেমন, ভাবনায় আসে নাই।
কিন্তু মরণ চিনিয়ে দিয়েছে চির জনমের মতো-
ভুলতে পারব আজীবন তারে? চেষ্টা করি বা শত?
তুমি যে ওমর- ঐশ্বর্যের খোলাফায়ে রাশেদার-
প্রজ্ঞা ও জ্ঞান আবুবকরের বুদ্ধির শত ধার!
ওসমান তুমি ঠোঁটে ঠোঁটে ফোটে কুরআনের জুড়ি জারি-
হযরত আলীর হিম্মত তুমি, সাহসের তরবারি।
তুমি তো তারিক, মুসনাদ তুমি, তুমি সাফওয়ান বীর
তুমি ফাতিমার কলিজার ওজন; নবীজির খুশি ধীর
তুমিই হাসান, হোসেন তুমিও, এজিদের খুন সেও
জ্বলজ্বলে জ্বলা নক্ষত্র এক; ভুলবে না কভু কেউ!
আদমের মতো আগুন বিছানা করো নি তো তুমি ভয়-
মূসার লাঠির বিলি কাটা পথ; নীলনদে থাকা জয়!
তুমি তো আদিম ইতিহাস যত মরুর বুকের ফুল-
তুমি এসেছিলে পৃথিবীর বুকে মুছে দিতে শত ভুল।
ন্যায়, ধর্ম, ইনসাফ, আদল, সততার শত ঘুড়ি-
ফুলকির মতো ফুটে ওঠো তুমি, কথকের নেই জুড়ি!
তুমি চেয়েছিলে সাম্যাবস্থায় আইনের আওতায়-
হেসে উঠবেই বিচারিক দিন; রাত কাঁদে, গোমরায়।
ক্ষণজন্মার ক্ষণিক সময় থমকে থেমেছে পথ-
মিল্কিওয়ের উল্কির মতো তুমি ছিলে যথাযথ!
তাই তো তোমার কবর হাসছে নিঃসীম শত সুখে-
কে বলে আজিকে তুমি নেই বেঁচে? তুমি আছো কোটি বুকে!
মেঘ, বৃষ্টি, রৌদ্র, সকাল; যতক্ষণ আছে আশ!
ততদিন তুমি বুকের গভীরে; ভালোবেসে বসবাস।
আদরে, দরদে, নরমে, গরমে ওম মেখে আছো তুমি;
তুমি আছো বেঁচে বিজয়ীর বেশে, শতমুখী যায় চুমি।
শাহাদাত মাহমুদ সিদ্দিকী
খালেদা জিয়া
একজন ভালো না থাকলে
ভালো থাকে না দেশ
একজনকে ঘর ছাড়া করা মানে
আমাদের কারোই আর ঘর নেই
একজনের অশ্রু মানে দেশজুড়ে হাহাকার
একজনের পাশে দাঁড়াতে না পারার মানে
আমাদের কেউ-ই আর কারো পাশে নেই
একজনের বন্দিত্ব মানে কারাগার,
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল।
একজনের নিঃসঙ্গতায় সঙ্গীহীন হয়ে পড়ে
আঠারো কোটি মানুষের দেশ
পুরুষেরা যখন কাপুরুষের হতে হতে
আকণ্ঠ মুরিদ হয়ে ওঠে গোপালের বালুর ট্রাকের
একটা কণ্ঠই মরদের মতো শাসিয়ে দেন গোপালীদের
আমরা যখন একে একে ভুলে যেতে থাকি আত্মপরিচয়
একজন বলে ওঠেন, ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির!
আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা
একজনের আপসহীনতার আলোকচ্ছটায়
আলোকিত হয় সবুজের ঠিকানা
একজনই উন্মোচন করে দেন লেন্দুপের অবগুণ্ঠন...
সাব্বির উদ্দিন আহমেদ
হাদির ইনকিলাব
হাদির সাহসী ডাক-
বজ্রকণ্ঠ, রক্ত তপ্ত, বিদ্রোহী মন্ত্র!
ইনকিলাব মঞ্চে জাগুক, কোটি তরুণের ঝাঁক
ঘোর আঁধার চিরে, আধিপত্যের শিকল ছিঁড়ে,
সুবহে সাদেক আসবে নিশ্চয়।
আমরা ন্যায়ের লড়াকু, সত্যের সৈনিক
ভাঙব বাধার প্রাচীর, আমাদের স্বপ্ন
ইনসাফ প্রতিষ্ঠা
দেখো রাজপথ কাঁপছে আজ
দেশজুড়ে তারুণ্যের জাগরণ
সবার স্বপ্ন ইনসাফ ও ন্যায়ের ইনকিলাব
এ মন্ত্রে দীপ্ত, এ মন্ত্রেই হবে তারুণ্যের বিপ্লব
কঠিন শপথে আজ তারা বলীয়ান।
মঞ্চ জাগে, দেশ জাগে, প্রতিটি প্রাণ জাগে নব উন্মাদনায়, মুখে বিজয়ের সেই এক অমোঘ-বাণী-
আল্লাহু আকবার।
দালান জাহান
আপসহীন
রাষ্ট্র ঘুমানোর পরেও ইতিহাস জেগে ছিল
দিনগুলো নিরপেক্ষ নয়
লোহার খাটের পাশে ঝুলে ছিল
পক্ষদুষ্ট ক্ষুধার্ত স্যালাইন
কয়েকটা নির্বাচন কয়েকটা কারাগার।
তিনি চোখ বন্ধ করলেন মানচিত্র কেঁপে উঠল
হাওয়ারা হারিয়ে গেল ভাষাহীন সংবিধানে
তিনি আপস করলেন না জ্বরের সাথে
তিনি আপস করলেন না একাকিত্বের সাথে
তিনি আপস করলেন না
আর্কাইভে রাখা লাল বছরগুলোর সাথে।
মৃত্যু এলো সাদা ঘোড়ায় চড়ে
জিজ্ঞেস করলেন আপস? আপস?
তিনি নীরব রইলেন।
শুধু ফিসফিস করে বললেন ক্ষমতা কি মানুষের ঊর্ধ্বে?