টানাপড়েনের মাঝেও ডলার-টাকায় স্থিতি
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ, তারল্য ও নীতিগত বার্তা
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে গত কয়েক বছর ধরে ‘স্থিতিশীলতা’ শব্দটি যেমন প্রত্যাশিত, তেমনি ‘চাপ’ শব্দটিও প্রায় স্থায়ী সঙ্গী। আমদানি ব্যয়, বৈশ্বিক ডলারের শক্তিশালী অবস্থান, রফতানির মন্থর গতি- সব মিলিয়ে টাকার বিনিময় হার যেন প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য ভারসাম্যের খেলায় থাকে। ২০২৫ সালের অক্টোবর-নভেম্বর সময়কাল এই বাস্তবতারই একটি সংযত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।
সাম্প্রতিক এই মাসিক বিশ্লেষণে বাংলাদেশ ব্যাংক দেখিয়েছে, এই সময়ে টাকার বিনিময় হার বড় কোনো ধাক্কা না খেলেও স্বল্পমেয়াদি ওঠানামা হয়েছে। শুরুতে কিছুটা অবমূল্যায়ন, পরে পুনরুদ্ধার- এই দুই পর্যায়ের মধ্য দিয়ে বাজার শেষ পর্যন্ত তুলনামূলক স্থিতিশীলতায় ফিরেছে। কিন্তু এই স্থিতিশীলতার আড়ালে রয়েছে তারল্য, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ঘাটতি ও রেমিট্যান্স প্রবাহের জটিল সমীকরণ।
আমদানি বাড়লেই চাপ : অবমূল্যায়নের প্রাথমিক ধাক্কা : অক্টোবরের শুরুতেই জ্বালানি ও সার আমদানি বাড়ে। সরকারের বড় অঙ্কের এসব আমদানি ডলারের চাহিদা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। ফলাফল হলো- আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দাম ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে শুরু করে।
সেপ্টেম্বর শেষে যেখানে প্রতি ডলার ছিল প্রায় ১২১.৮০ টাকা, নভেম্বরের মাঝামাঝি তা গিয়ে দাঁড়ায় ১২২.৫৮ টাকায়। এই বৃদ্ধিটা সংখ্যায় ছোট মনে হলেও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে এটি একটি স্পষ্ট সঙ্কেত- সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেড়েছে।
তবে এটি ছিল ‘শক’, স্থায়ী প্রবণতা নয়। কারণ বাজারে আতঙ্ক বা অতিরিক্ত জল্পনা দেখা যায়নি; বরং এটি ছিল বাস্তব আমদানি-চাপের প্রতিফলন।
শেষ ভাগে পুনরুদ্ধার : তারল্যই ফিরিয়ে দিলো স্বস্তি : নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে চিত্র বদলে যায়। ডলারের সরবরাহ বাড়ে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বাজার থেকে ডলার কেনা কিছুটা স্থগিত রাখে, আর বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যেও উন্নতি দেখা যায়।
এর ফলে ডলারের দাম আবার কমে ১২২.২২ টাকার কাছাকাছি নেমে আসে। অর্থাৎ বাজার নিজেই একটি ‘স্বাভাবিক ভারসাম্য’ খুঁজে নেয়।
এখানেই এই সময়ের মূল বার্তা- বাজারে যথেষ্ট তারল্য থাকলে কৃত্রিম হস্তক্ষেপ ছাড়াও বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকতে পারে।
স্প্রেড কমেছে : গ্রাহক পর্যায়ে স্বস্তি : ব্যাংক-গ্রাহক লেনদেনে যে ব্যবধান বা স্প্রেড থাকে, সেটি সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ব্যবধান যত বেশি, ডলার কিনতে তত বেশি খরচ।
অক্টোবর-নভেম্বরে এই স্প্রেড উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ব্যাংকগুলোর বিক্রয় হার ও ক্রয় হারের ব্যবধান প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
এর মানে, বাজারে ডলার নিয়ে হাহাকার নেই। প্রতিযোগিতা বেড়েছে, দরকষাকষি কমেছে এবং লেনদেন তুলনামূলক স্বচ্ছ হয়েছে। প্রবাসী আয় বা আমদানিকারকদের জন্য এটি একটি ইতিবাচক সঙ্কেত।
স্পট লেনদেন বাড়ছে : বাজারে সক্রিয়তা বৃদ্ধি : আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো আন্তঃব্যাংক স্পট লেনদেনের বৃদ্ধি। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর- এই তিন মাসে প্রতিদিনের গড় স্পট লেনদেন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে।
এটি বোঝায়, ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি বাস্তব চাহিদা মেটাতে সরাসরি লেনদেন করছে। আগে যেখানে সোয়াপ লেনদেন বেশি ছিল, এখন স্পট লেনদেনের ভাগ বাড়ছে।
এই প্রবণতা সাধারণত তখনই দেখা যায়, যখন বাজারে অনিশ্চয়তা কমে এবং প্রকৃত সরবরাহ চাহিদাভিত্তিক লেনদেন বাড়ে। অর্থাৎ বাজার ‘ফাংশনাল’ হয়েছে।
রিজার্ভ ও হস্তক্ষেপ : সতর্ক কৌশল : অক্টোবর মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়ালেও নভেম্বরে প্রায় কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। এই ‘পিছু হটা’ কৌশলই বাজারে তারল্য বাড়াতে সহায়তা করেছে।
রিজার্ভ সাময়িকভাবে ২৮ বিলিয়ন ডলার ছুঁলেও পরে আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধের কারণে কিছুটা কমে আসে। তবে এই ওঠানামা স্বাভাবিক।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন বাজারকে বেশি ‘স্বাধীনভাবে’ চলতে দিচ্ছে। কঠোর নিয়ন্ত্রণের বদলে নমনীয়তা- এটাই বর্তমান নীতির বৈশিষ্ট্য।
বৈশ্বিক প্রভাব : ডলার শক্তিশালী, চাপ অনিবার্য : বাংলাদেশের বাজার শুধু দেশীয় কারণে প্রভাবিত হয় না। বৈশ্বিক ডলার শক্তিশালী হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রা স্বাভাবিকভাবেই চাপের মুখে পড়ে।
২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ডলার সূচক বাড়তে শুরু করেছে। ফলে টাকার ওপরও একটি ‘বাহ্যিক চাপ’ সৃষ্টি হয়েছে। এই বাস্তবতায় টাকার প্রায় দুই শতাংশ বছরওয়ারি অবমূল্যায়ন খুব অস্বাভাবিক নয়। বরং অনেক দেশের তুলনায় এটি নিয়ন্ত্রিত।
রিয়ার সতর্ক করছে : সামনে কি আরো অবমূল্যায়ন : একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো রিয়েল ইফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেট (রিয়ার)। এটি যদি ১০০-এর ওপরে থাকে, তাহলে বোঝায়- মুদ্রাটি প্রকৃত অর্থে কিছুটা ‘মূল্যায়িত’ বা শক্তিশালী।
বর্তমানে এই সূচক ১০৬-এর ওপরে। অর্থাৎ, বাংলাদেশী পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক বেশি পড়ে যাচ্ছে। রফতানির প্রতিযোগিতা বাড়াতে ভবিষ্যতে টাকার আরো কিছু নমনীয়তা বা অবমূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে- নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
অর্থনীতির ভিত্তি : আশার আলো রেমিট্যান্স : চলতি হিসাবে ঘাটতি কিছুটা বেড়েছে- আমদানি বেড়েছে, রফতানি ধীর। কিন্তু একটি বড় স্বস্তির জায়গা হলো রেমিট্যান্স।
সরকারি প্রণোদনা, মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং ও হুন্ডি নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই প্রবাহই মূলত বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে শক্ত ভিত দিয়েছে। বলা যায়, প্রবাসীরা এখন টাকার সবচেয়ে বড় ‘রক্ষাকবচ’।
সামনে কী : অক্টোবর-নভেম্বরের অভিজ্ঞতা তিনটি বার্তা দেয় : প্রথমত. বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কার্যকর। দ্বিতীয়ত. অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের বদলে তারল্য ব্যবস্থাপনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত. রফতানি ও রেমিট্যান্স বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।
যদি আমদানি নিয়ন্ত্রিত থাকে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বজায় থাকে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক নমনীয় নীতি অনুসরণ করে, তাহলে টাকার বড় ধসের আশঙ্কা কম। তবে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি মাথায় রেখে সতর্কতা অব্যাহত রাখতে হবে।
শেষ কথা হলো- অক্টোবর-নভেম্বর ২০২৫ সময়কাল প্রমাণ করেছে-বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার এখন আর একমুখী সঙ্কটের গল্প নয়। বরং এটি ধীরে ধীরে পরিণত, ভারসাম্যপূর্ণ ও বাজারনির্ভর কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। স্বল্পমেয়াদি চাপ থাকলেও ভিত্তি শক্ত। ডলার-টাকার টানাপড়েনের মাঝেও যে স্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে, সেটিই আগামী দিনের অর্থনৈতিক নীতির প্রধান ভরসা।