আদালতের রায়ের প্রতিবাদে হরতাল-ধর্মঘট অবৈধ ঘোষণা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন এমন কর্মসূচি দিলে আইনগত ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ হাইকোর্টের
- রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে, রাজপথে চাপ সৃষ্টি নয়
আদালতের কোনো রায় বা আদেশের প্রতিবাদে হরতাল বা ধর্মঘট আহ্বান অবৈধ ও সংবিধানবিরোধী বলে ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। একই সাথে পরিবহন মালিক সমিতি কিংবা শ্রমিক সংগঠন আদালতের রায় বা আদেশের প্রতিবাদে এ ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া এবং প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে যান চলাচল বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলার সুযোগও আইনসম্মত নয় বলে স্পষ্ট করেছেন আদালত।
আদালতের রায় ও আদেশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে স্বরাষ্ট্র সচিব, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনকে (বিআরটিসি) নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হরতাল বা ধর্মঘটের নামে যান চলাচল বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হলে তা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি ফয়সাল হাসান আরিফের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৭ সালে জারি করা একটি রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ রায় দেন গতকাল রোববার।
আদালতের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন বিভিন্ন সময় বিচারিক সিদ্ধান্ত বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রতিবাদে পরিবহন ধর্মঘটের মাধ্যমে জনজীবন অচল করার নজির রয়েছে। ফলে রায়ের সাংবিধানিক ও বাস্তবিক তাৎপর্য দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীর হত্যার মামলায় ধর্মঘট
২০১১ সালের আগস্টে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হন। ডিলাক্স পরিবহনের একটি বাসের সাথে মাইক্রোবাসটির সংঘর্ষে ওই দুর্ঘটনা ঘটে।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ওই মামলায় বাসচালককে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেন। রায় ঘোষণার পর পরিবহন মালিকরা ধর্মঘটের ঘোষণা দেন। এতে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যাপক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট করা হয়।
রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১ মার্চ হাইকোর্ট আদালতের রায় বা আদেশের প্রতিবাদে হরতাল-ধর্মঘট আহ্বানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রুল জারি করেন। একই সাথে অন্তর্বর্তী আদেশে পরিবহন মালিকদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ধর্মঘট প্রত্যাহার এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। এতে পরদিনই ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।
প্রায় ৯ বছর পর সেই রুলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে আদালত এখন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন, বিচারিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজপথে কর্মসূচি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা যাবে না।
রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের পথ খোলা
চূড়ান্ত শুনানিতে রিটকারী এইচআরপিবির পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের সব কর্তৃপক্ষের জন্য সুপ্রিম কোর্টের রায় ও আদেশ বাস্তবায়নে সহায়তা করা বাধ্যতামূলক।
তিনি যুক্তি দেন, কোনো পক্ষ আদালতের রায়ে সংক্ষুব্ধ হলে তার সামনে আইনি প্রতিকার গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যথাযথ আপিল আদালতে যেতে পারে। কিন্তু আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে হরতাল বা ধর্মঘট আহ্বান করা বিচারিক সিদ্ধান্তের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের শামিল। একই সাথে এ ধরনের কর্মসূচি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক।
তিনি আরো বলেন, ধর্মঘটের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং নাগরিকদের বড় ধরনের দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়।
‘রায় মানতে হবে, আপিল করতে হবে’
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালতের রায় ও আদেশ সংশ্লিষ্ট সবার জন্য বাধ্যতামূলক। কোনো পক্ষ রায়ে সংক্ষুব্ধ হলে যথাযথ আপিল ফোরামে যাওয়ার অধিকার তার রয়েছে। কিন্তু বিচারিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হরতাল বা ধর্মঘট আহ্বান আইনসম্মত নয় এবং সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণ বিচার বিভাগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে কোনো সংগঠন বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ করে বিচারিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারবে কি না- এ প্রশ্নে আদালত এবার সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন।
ব্যবস্থা নেবে স্বরাষ্ট্র, বিআরটিএ ও বিআরটিসি
আদালত স্বরাষ্ট্র সচিব, বিআরটিএ ও বিআরটিসিকে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হরতাল-ধর্মঘট ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পরিবহন মালিক বা শ্রমিক সংগঠন এমন কর্মসূচি আহ্বান করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলা হয়েছে। প্রয়োজন হলে ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রিটের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন মনজিল মোরসেদ। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী সঞ্জয় মণ্ডল ও রিপন বড়ুয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আহসান হাবিব, বিআরটিসির পক্ষে আইনজীবী আসিফুল হক এবং বিআরটিএর পক্ষে আইনজীবী মো: রফিউল ইসলাম শুনানিতে অংশ নেন।