কমেছে জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইমও
অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৪.৭৫% ও কার্গোতে ৭.৩৯% প্রবৃদ্ধি
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ম ৯ মাসের তুলনামূলক পারফরম্যান্স রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কার্গো হ্যান্ডলিং, কনটেইনার পরিবহন এবং জাহাজ আগমনের সংখ্যা প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দর উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কমেছে বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থানকাল বা টার্ন অ্যারাউন্ড টাইমও।
কার্গো হ্যান্ডলিং : ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ধারাবাহিক উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ম ৯ মাসে ১০ কোটি ৪২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫৮ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭.৩৯% বেশি। বিশেষ করে গত বছরের অক্টোবর মাসে পণ্য পরিবহনে রেকর্ড ২১.১১% প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়া এবং জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানি বৃদ্ধির ফলে এই সাফল্য এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
কনটেইনার হ্যান্ডলিং (টিইউএস) : প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ম ৯ মাসে ২৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৬ টিইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৭৫% বেশি। বন্দর সূত্র জানিয়েছে, কনটেইনার পরিবহনের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গেল আগস্ট মাসে ২০.১০% এবং সেপ্টেম্বর মাসে ১০.২২% প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন এবং অটোমেশনের ফলে কনটেইনার জট কমেছে এবং দ্রুত পণ্য খালাস সম্ভব হয়েছে।
জাহাজ হ্যান্ডলিং : বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থানের সময় (টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম) ৪ দিন থেকে কমিয়ে ২.৫৩ দিনে আনা হয়েছে। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ম ৯ মাসে মোট ৩ হাজার ৩০টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৬২% বেশি। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ৩৯১টি জাহাজ হ্যান্ডল করা সম্ভব হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬.০২% বেশি বলেও সূত্র জানায়।
সাফল্যের যেসব কারণ বলছে বন্দর কর্তৃপক্ষ
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীমের মতে চবকের বর্তমান চেয়ারম্যানের দূরদর্শী নেতৃত্বে একটি গতিশীল ও কার্যকর টিমের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় বন্দর পরিচালনায় আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২৫ সালের ৭ জুলাই নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেডের (বাংলাদেশ নৌবাহিনী দ্বারা পরিচালিত) কাছে হস্তান্তর করা হয়। এই পদক্ষেপের ফলে বন্দরের সবচেয়ে ব্যস্ত এই টার্মিনালে কর্মদক্ষতা ১২-১৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া জাহাজ বন্দরে অবস্থানের গড় সময় (টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম) ৪ দিনের বেশি থেকে কমে ২.৫৩ দিনে নেমে এসেছে। এর ফলে ২০২৪-২৫ সময়ের তুলনায় বন্দরটি প্রতি মাসে অনেক বেশি সংখ্যক জাহাজ হ্যান্ডল করতে সক্ষম হয়েছে।
আধুনিকায়ন ও অটোমেশন : অনলাইন ইগেট পাস সিস্টেম চালু এবং টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের (টিওএস) পূর্ণ বাস্তবায়ন কাগজের নথিপত্রসংক্রান্ত বিলম্ব এবং ইয়ার্ডে যানজট কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালের শেষ দিকে অনেক দিনই জাহাজগুলোকে জেটিতে ভিড়তে কোনো সময় অপেক্ষা করতে হয়নি (জিরো ওয়েটিং টাইম)।
ছুটির দিনেও নিরবচ্ছিন্ন সেবা (মার্চ ২০২৬) : ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি সত্ত্বেও বন্দর ২৪/৭ কার্যক্রম চালু রেখেছিল। শুধু এক সপ্তাহে (১৭-২৩ মার্চ) বন্দরটি ২৫ লক্ষ টন কার্গো এবং ৫৫ হাজার টিইউএস কনটেইনার হ্যান্ডল করেছে, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন সচল রাখতে সাহায্য করেছে।
জিরো ওয়েটিং টাইম : চট্টগ্রাম বন্দর ঈদের ছুটির বন্ধেও ২৪/৭ তাদের অপারেশনাল কার্যক্রম চালু রেখেছিল। ঈদের আগে জাহাজের ওয়েটিং টাইম ৩ থেকে ৫ দিনে উন্নিত হলেও কর্তৃপক্ষের সার্বিক মনিটরিং এবং সমন্বয়ের ফলে আউটার অ্যাংকরেজে জাহাজের অপেক্ষমান সময় পুনরায় ০(শূন্য) দিন অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এতে জাহাজ দ্রুত পণ্য লোড আনলোড করে চলে যেতে পারে। লজিস্টিকস খরচ কমে যাওয়ার ফলে পণ্যের বাজারমূল্য কমে যায়, ভোক্তারা কমমূল্যে তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যাদি ক্রয় করতে পারে।
প্রি অ্যারাইভাল প্রসেস (পিএপি) : বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই বর্তমানে পিএপি ব্যবহার করে শুল্কায়ন সম্পন্ন করা হয়। এই পদ্ধতিতে, জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসার আগেই- আমদানিকারক কর্তৃক দাখিলকৃত আমদানিকৃত পণ্যের বিবরণের ওপর ভিত্তি করে অ্যাসাইকুডা প্লাস প্লাস সিস্টেমের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট মডিউল ব্যবহার করে কাস্টমস কর্তৃক শুল্ক আদায় করা হয়। এর ফলে আমদানিকৃত পণ্য/কনটেইনার জাহাজ হতে আনলোড হওয়ার পর বন্দরে পড়ে থাকতে হয় না। ফলে বন্দরের এফিসিয়েন্সি বৃদ্ধি পায় এবং স্বল্পতম সময়ে পণ্য আনলোড এবং ডেলিভারি দেয়া যায়।
বন্দর সচিব বলেন, চলমান আধুনিকায়নের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হলে ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির এই ধারা আরো শক্তিশালী হবে বলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আশাবাদী।