তবুও ‘ক্যাপাসিটি চার্জে’ গুনতে হবে হাজার কোটি টাকা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অফিস সময় কমিয়ে বিদ্যুৎ চাহিদা কমানো গেলে কিছু ব্যয় সাশ্রয় হবে ঠিকই, কিন্তু ক্যাপাসিটি চার্জের চাপ প্রায় একই থাকবে। কারণ এটি ব্যবহারভিত্তিক নয়, বরং চুক্তিভিত্তিক স্থির ব্যয়। ফলে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কম নেয়া হলেও কেন্দ্রগুলোকে ‘রেন্ট’ বা ভাড়ার মতো অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition
Electricity

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে নতুন কৃচ্ছ্রতাসাধন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে বাজার, শপিংমল ও অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জায়ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। সরকারের আশা, এই পদক্ষেপে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমবে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এতে প্রকৃত সাশ্রয় কতটা হবে, আর বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হিসেবে কত টাকা গুনতে হবে সরকারকে?

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অফিস সময় এক ঘণ্টা কমানোর মূল উদ্দেশ্য হলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, আলো, লিফট, কম্পিউটার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার কমানো। সরকারের ধারণা, অফিস খাতের দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যবহার ৮ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকাসহ বড় বড় শহরের অফিস ভবনগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে থাকে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, অফিস সময় এক ঘণ্টা কমানো হলে কেবল বিদ্যুৎ নয়, যানবাহনের জ্বালানি ব্যবহারও কিছুটা কমবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াত, অফিস পরিবহন, জেনারেটর ব্যবহার এবং সহায়ক সেবার কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল ও অকটেন ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে সরকারি গাড়ির বহর ও অফিস জেনারেটর ব্যবহারে দৈনিক কয়েক লাখ লিটার জ্বালানি সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, দেশের সরকারি ও বড় বেসরকারি অফিস ভবনগুলোতে দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যবহার যদি গড়ে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা হয়, তবে এক ঘণ্টা সময় কমানোর ফলে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতে পারে। মাসের হিসাবে এটি ৪,৫০০ থেকে ৬,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টায় দাঁড়াতে পারে। বর্তমান পাইকারি উৎপাদন ব্যয় ধরে এর আর্থিক মূল্য কয়েকশ’ কোটি টাকার সমপর্যায়ের হতে পারে।

তবে এই সাশ্রয়ের বিপরীতে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ক্যাপাসিটি চার্জ। বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে আলোচিত এই ব্যয় এমন এক অর্থপ্রদান, যা বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদন না করলেও সরকারকে দিতে হয়। অর্থাৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রস্তুত অবস্থায় থাকলেই বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হয়। এতে কেন্দ্র মালিকদের ঋণের সুদ, কর্মচারী ব্যয় এবং বিনিয়োগের রিটার্ন নিশ্চিত করা হয়।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ বেড়ে ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবহার কমলেও এই অর্থপ্রদান উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অফিস সময় কমিয়ে বিদ্যুৎ চাহিদা কমানো গেলে কিছু ব্যয় সাশ্রয় হবে ঠিকই, কিন্তু ক্যাপাসিটি চার্জের চাপ প্রায় একই থাকবে। কারণ এটি ব্যবহারভিত্তিক নয়, বরং চুক্তিভিত্তিক স্থির ব্যয়। ফলে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কম নেয়া হলেও কেন্দ্রগুলোকে ‘রেন্ট’ বা ভাড়ার মতো অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি অফিস সময় কমিয়ে দৈনিক ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা কমে, তা হলে মাসে উৎপাদন ব্যয়ে হয়তো কয়েকশ’ কোটি টাকা কম লাগতে পারে। কিন্তু একই সময়ে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ মাসে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ কোটি টাকা গুনতে হতে পারে। অর্থাৎ ব্যবহার কমানোর সুফল আংশিকভাবে স্থির ব্যয়ের কারণে খর্ব হয়ে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান সঙ্কটে অফিস সময় কমানো একটি জরুরি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। মূল সমস্যা বিদ্যুৎ উৎপাদন কাঠামো ও চুক্তির মধ্যে। গত এক দশকে দ্রুত ভাড়াভিত্তিক ও আইপিপি কেন্দ্র স্থাপনের ফলে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা ক্রমেই বেড়েছে। এখন বিদ্যুৎ চাহিদা কমলেও কেন্দ্রগুলোকে অর্থ দিতে হচ্ছে, যা ভর্তুকির চাপ বাড়াচ্ছে। এ দিকে সরকার ইতোমধ্যে কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ করে বছরে প্রায় ১১৯ কোটি টাকা সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকৃত সাশ্রয়ের জন্য ব্যয়বহুল কেন্দ্রগুলোর চুক্তি পুনর্বিবেচনা জরুরি।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, অফিস সময় কমানোর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় গ্রিডে চাপ কমবে এবং লোডশেডিং পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পিক আওয়ারের আগে অফিস কার্যক্রম শেষ হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও আলোর ব্যবহার কমে যাবে। এতে এলএনজি, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক উৎপাদন কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, শুধুমাত্র অফিস সময় কমিয়ে বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি মিলবে না, যদি ক্যাপাসিটি চার্জের মতো স্থির ব্যয় বহাল থাকে। এক দিকে জনগণ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য কৃচ্ছ্রতাসাধন করবে, অন্য দিকে ব্যবহার না করেও হাজার হাজার কোটি টাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকদের দিতে হবে, এটি অর্থনীতির জন্য বড় চাপ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে এক দিকে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, অন্য দিকে বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারে যেতে হবে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সোলার বিদ্যুৎ এবং গ্যাসভিত্তিক সাশ্রয়ী কেন্দ্রকে অগ্রাধিকার দেয়ার পাশাপাশি ব্যয়বহুল চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। সব মিলিয়ে অফিস সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব হলেও দেশের বিদ্যুৎ খাতের প্রকৃত আর্থিক সঙ্কটের বড় কারণ রয়ে গেছে ক্যাপাসিটি চার্জ। ফলে সাশ্রয়ের সুফল পুরোপুরি পেতে হলে শুধু ব্যবহার কমানো নয়, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কাঠামোতেও বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।