পাকিস্তানের আকাশ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
ইরান যুদ্ধে নতুন করে বিপাকে ভারতীয় এয়ারলাইন্স
Printed Edition
রয়টার্স
ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বিমান চলাচলে যে বিধিনিষেধ জারি রয়েছে তা ভারতীয় এয়ারলাইনগুলোকে নতুন বিপাকে ফেলেছে। গত বছর থেকে পাকিস্তান তার আকাশসীমা নিষিদ্ধ করে রাখায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনায় মধ্যপ্রাচ্যের আকাশই ছিল ভারতীয় এয়ারলাইনগুলোর অন্যতম প্রধান ভরসা। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ওই পথের বেশির ভাগই কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।
মধ্যপ্রাচ্যের টালমাটাল পরিস্থিতির কারণে একাধিক ভারতীয় বাণিজ্যিক বিমান সংস্থাকে তাদের ফ্লাইটের সময়সূচি ও পথ বদলাতে হচ্ছে, কিন্তু পাকিস্তানের আকাশ ব্যবহার করতে না পারায় তাদের বিকল্পও অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করা সংস্থা সিরিয়াম জানিয়েছে, গত ১০ দিনে ভারতের সবচেয়ে বড় দুই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এয়ার ইনডিয়া ও ইন্ডিগো তাদের মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার নির্ধারিত এক হাজার ২৩০টি ফ্লাইটের ৬৪ শতাংশই চালাতে পারেনি। ‘যেসব ভারতীয় এয়ারলাইন আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চালায় তাদের জন্য এটি দ্বৈত আঘাত হয়ে এসেছে,’ বলেছেন বিমান চলাচলবিষয়ক স্বাধীন বিশেষজ্ঞ অমিত মিত্তাল।
প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনার কারণে গত বছরের এপ্রিল থেকেই পাকিস্তান ভারতের ক্যারিয়ারগুলোর জন্য তাদের আকাশসীমা নিষিদ্ধ করে রেখেছে। দিনকয়েক আগে ব্যাংক ও আর্থিক সেবা সংস্থা এইচএসবিসি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের এখনকার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ভারতীয় এয়ারলাইনগুলোর খরচ ও মুনাফার ওপর ‘বড় চাপ’ সৃষ্টি করতে পারে। যুদ্ধরত অঞ্চলটিতে সাত দিন ফ্লাইট বাতিলের কারণে এয়ারলাইনগুলোর বার্ষিক করব্যতীত আয় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে বলেও তাদের ধারণা।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ভারতীয় এয়ারলাইনগুলো মধ্যপ্রাচ্যের কিছু কিছু রুটে সামান্য পরিমাণ ফ্লাইট চালানো শুরু করতে পারলেও ইন্ডিগো আছে অন্য জটিলতায়। তাদের ইউরোপে যাত্রার অনেকটাই নর্স আটলান্টিক এয়ারওয়েজ থেকে ভাড়া নেয়া ছয়টি দূরপাল্লার বোয়িংয়ের ওপর নির্ভরশীল। বিমানগুলো নরওয়েতে নিবন্ধিত হওয়ায় তাদেরকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান চলাচল নিরাপত্তা সংস্থার নির্দেশনা মানতে হয়। সংস্থাটি সম্প্রতি তাদের সব এয়ারলাইনগুলোকে ইরান, ইরাক, ইসরাইল, কুয়েত, লেবানন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের আকাশসীমা এড়িয়ে চলতে বলেছে।
এ কারণে ইন্ডিগোকে আফ্রিকা হয়ে ইউরোপ যাত্রার দীর্ঘ পথ বেছে নিতে হচ্ছে, যার ফলে তাদের যাত্রাকাল কোথাও কোথাও দুই ঘণ্টাও বেড়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ফ্লাইটরেডার টোয়েন্টিফোর। আফ্রিকার পথ ব্যবহারেও নানান জটিলতায় পড়তে হচ্ছে ভারতীয় এ এয়ারলাইনকে। নর্স নামে নিবন্ধিত একটি বিমান কী করে ইন্ডিগো ব্যবহার করছে, এ বিভ্রান্তির কারণে আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়ার বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে না দেয়ায় রোববার ইন্ডিগোর ম্যানচেস্টারগামী একটি ফ্লাইটকে দিল্লিতে ফেরত আসতে হয়েছে বলে বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে। ইন্ডিগো ওই ঘটনা প্রসঙ্গে জানিয়েছে, ‘শেষ মুহূর্তে আকাশসীমায় বিধিনিষেধজনিত কারণে’ ১৩ ঘণ্টা আকাশে থাকার পর ওই বিমানকে দিল্লিতে ফিরতে হয়েছে।
লন্ডন থেকে থমুম্বাই যাওয়া ইন্ডিগোর আরেকটি বোয়িংকেও একই জটিলতায় পড়ে সোমবার বাধ্য হয়ে কায়রোতে অবতরণ করতে হয়েছে, বলেছে সূত্রটি। এসবের সাথে যুক্ত হয়েছে ইন্ডিগোর প্রধান নির্বাহী পিটার এলবার্সের পদত্যাগ। ডিসেম্বরে ইন্ডিগোর ফ্লাইট বিপর্যয়ের পর জনসাধারণ ও সরকারের সমালোচনার ধাক্কায় মঙ্গলবার তিনি পদ ছেড়ে দেন। ফ্লাইট পরিচালনা নিয়ে নতুন জটিলতা প্রসঙ্গে রয়টার্সের জিজ্ঞাসার জবাব দেয়নি ইন্ডিগো ও এয়ার ইনডিয়া। নর্স তাদের কাছে করা সব প্রশ্নের উত্তরে ইন্ডিগোকে দেখিয়ে দিয়েছে।
সোমবার এয়ার ইনডিয়া জানায়, ইরান সঙ্ঘাতের কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তারা সপ্তাহজুড়ে ভারত থেকে ইউরোপে অতিরিক্ত ৭৮টি ফ্লাইট পরিচালনা করবে। বাধ্য হয়ে মাঝপথে একটি যাত্রাবিরতি যোগ করায় কোনো কোনো গন্তব্যে তাদের ফ্লাইটের সময়সীমা এত বেড়ে গেছে যে যা লুফথানসা ও আমেরিকান এয়ারলাইনগুলোর মতো তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সুবিধা করে দিচ্ছে।
এয়ার ইনডিয়ার সোমবারের দিল্লি থেকে নিউ ইয়র্কের ফ্লাইট রোমে যাত্রাবিরতি নেয়ায় চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে তার প্রায় ২২ ঘণ্টা লেগেছে বলে জানিয়েছে ফ্লাইটরেডার টোয়েন্টিফোর। ইরান যুদ্ধের আগে কোনো যাত্রাবিরতি ছাড়া ইরাক ও তুরস্কের ওপর দিয়ে ১৭ ঘণ্টায় এয়ার ইনডিয়া একই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারত। এয়ার ইনডিয়ার যেখানে ২২ ঘণ্টা লেগেছে, সেই একই পথ রোববার আমেরিকান একটি এয়ারলাইন পাড়ি দিয়েছে মাত্র ১৬ ঘণ্টায়, পাকিস্তানের আকাশ ব্যবহার করে।