ভারতের সাথে সম্পর্ক ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে অগ্রসর হচ্ছে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
ভারতের সাথে সম্পর্ক ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভবে অগ্রসর হচ্ছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, দিল্লির পরিবেশে এক ধরনের ‘সম্মিলন’ লক্ষ্য করেছি, যেখানে দুই দেশই আলোচনা, সম্পৃক্ততা ও উদ্যোগ নিতে আগ্রহী। সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য দুই পক্ষই কাজ করছে। তবে এখন তাড়াহুড়া না করে ধীরে ধীরে আস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য।
গতকাল মরিশাসে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ৭ ও ৮ এপ্রিল ভারত সফর করেছেন। এর পর ৯ এপ্রিল ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে যোগ দিতে একই ফ্লাইটে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাথে মরিশাসে এসেছেন। ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ১০ থেকে ১২ এপ্রিল পোর্ট লুইসে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে খলিলুর রহমান বলেন, ঢাকা ও দিল্লি শূন্য থেকে সম্পর্ক শুরু করছে না। এ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে অভিন্ন নদী, অভিন্ন সীমান্ত এবং সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে। এসব ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক কূটনীতিও অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। ২৬ মার্চ দিল্লিতে বাংলাদেশের জাতীয় দিবস উদযাপনে এর একটি প্রতিফলন দেখা গেছে। সেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সঙ্গীত সরাসরি পরিবেশন করা হয়েছে, যা দুই দেশের শক্তিশালী সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে। এটি ছিল একটি স্মরণীয় মুহূর্ত।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কটের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবেলায় ভারত ও বাংলাদেশ এক সাথে কাজ করবে। এটি হবে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সঙ্কটের সময় ঢাকা যখন অংশীদারদের সাথে যোগাযোগ করে, তখন ভারত দ্রুত সাড়া দেয়। দুই দেশের মৈত্রী পাইপ লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ করছে ভারত।
খলিলুর রহমান জানান, মরিশাসে আসার আগে আমি ভারতের কাছে ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ করেছি। কিছু লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও দিল্লি জানিয়েছে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পর সরবরাহ বাড়ানো হবে।
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন সম্পর্কে ড. রহমান বলেন, পানি সীমিত। গঙ্গা মানেই জীবন। অভিন্ন নদীগুলোর পানি প্রবাহের ওপর সীমান্তের দুই পাশেই জীবিকা নির্ভর করে। দিল্লিতে আমি যে আগ্রহ ও সদিচ্ছা দেখেছি, তা একটি শক্তিশালী কাঠামোতে রূপ নেবে। তিনি বলেন, ন্যায্য ও জলবায়ু সহনশীল পানি বণ্টন ব্যবস্থা একটি ‘সভ্যতাগত বন্ধন’। যৌথ সম্পদের মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন আগামী অন্তত তিন দশকের জন্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে। ভারত হোক বা বাংলাদেশ, মানুষ তো মানুষই। আমরা একই ধরনের জলবায়ু সঙ্কটের মুখোমুখি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের সাথে মানুষে-মানুষে সম্পর্ক এবং ভিসা ব্যবস্থা সহজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
চীন প্রসঙ্গে খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিকে ‘জিরো-সাম গেম’ হিসেবে দেখে না এবং অন্যদের কাছ থেকেও একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাশা করে। বাণিজ্য ঘাটতি বাজারের প্রভাবেই তৈরি হয়, কৌশলগত অবস্থানের কারণে নয়।
সবশেষে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক পরিপূরকতা, সীমান্ত পারাপার সংযোগ এবং যৌথ অবকাঠামো- এসবের সুফল বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। ভারত কোনো বাহ্যিক অংশীদার নয়, বরং একটি ‘কাঠামোগত উপস্থিতি’- যা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।
জ্বালানি সঙ্কটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থাকবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চলমান জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় সম্মিলিত বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতির পরেও এর প্রভাব থেকে যাবে এবং এটি অর্থনীতি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে। যুদ্ধবিরতি হতে পারে, কিন্তু জ্বালানি সমস্যার সমাধান দুই সপ্তাহের মধ্যে হবে না। এই সঙ্কটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থাকবে।
মরিশাসে গত শুক্রবার শুরু হওয়া নবম ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে দেয়া ভাষণে তিনি এই আহ্বান জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা সবাই সমস্যায় আছি, কারণ বর্তমান জ্বালানি সঙ্কট বিঘœ সৃষ্টি করছে। এর প্রভাব আগামী বছরগুলোতেও অনুভূত হবে। জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হলেও আমরা বহুপক্ষীয়তার অবক্ষয়ের বৃহত্তর সমস্যার সম্মুখীন হবো। বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের অবক্ষয় একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
তিনি দেশগুলোকে তাদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।