রামপুরায় ২৮ হত্যা : বিচার শুরু ২০ জানুয়ারি

বিজিবি কর্মকর্তাসহ ৪ জনের বিচার শুরুর আদেশ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চারজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

গতকাল বুধবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর জন্য আগামী ২০ জানুয়ারি দিন রেখেছেন আদালত; ওই দিন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা হবে। বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ছাড়া বাকি আসামিরা হলেন বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা মেজর মো: রাফাত বিন আলম মুন, ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো: রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো: মশিউর রহমান। চারজনের মধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন রেদোয়ানুল ইসলাম ও মো: রাফাত বিন আলম। সকালে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেল থেকে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এ ছাড়া পুলিশের দুই কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম ও মো: মশিউর রহমান পলাতক আছেন।

দিনের কার্যক্রমের শুরুতে আসামিদের অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে দেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আল নোমান, সহিদুল ইসলামসহ অন্যরা। গ্রেফতার দু’জনের পক্ষে আইনজীবীরা হলেন হামিদুল মিসবাহ এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো: আমির হোসেন। পরে কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘১৮ ও ১৯ জুলাই রামপুরায় বিজিবি ছাত্র-জনতার ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। এ মামলায় দুই বিজিবি কর্মকর্তাসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। আগামী ২০ জানুয়ারি সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হবে।’ গেল ২১ ডিসেম্বর পলাতক দুই আসামির পক্ষে মো: আমির হোসেন এবং উপস্থিত দুই আসামির জন্য হামিদুল মিসবাহ অব্যাহতির আবেদন করেন।

১৪ ডিসেম্বর এ বিষয়ে শুনানির কথা ছিল। কিন্তু বিশেষ কারণে হয়নি। এর আগে ৬ ডিসেম্বর ফরমাল চার্জের ওপর শুনানি শেষ করেন প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। ২২ অক্টোবর সেনা হেফাজতে থাকা রেদোয়ান ও রাফাতকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। শুনানি শেষে তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায় ট্রাইব্যুনাল। একইসাথে পলাতকদের হাজিরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়। জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় রামপুরায় নিহত হয়েছেন ২৮ জন। আহত হয়েছেন আরো অনেকে। এই ঘটনায় বিজিবি কর্মকর্তা রেদোয়ানুলকে আন্দোলনকারীদের ‘সরাসরি গুলি করতে দেখা যায়’।

তাইম হত্যায় ৯ জনের নামে পরোয়ানা, দু’জনকে হাজিরের নির্দেশ : এ দিকে জুলাই অভ্যুত্থানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ইমাম হাসান তাইম হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একইসাথে ৯ জনের নামে ও গ্রেফতারি পরোয়ানা ও দু’জনকে হাজিরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেলে ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। অপর সদস্য জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি এ মামলায় আনা সুনির্দিষ্ট একটি অভিযোগ পড়ে শোনান। অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কোথায়, কিভাবে, কার নেতৃত্বে বা গুলিতে তাইমকে হত্যা করা হয়েছে তা বর্ণনা দেন। পরে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয়ার আবেদন করেন।

শুনানি শেষে ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া গ্রেফতারদের হাজিরের ও পলাতকদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয়। এ মামলায় দু’জন গ্রেফতার রয়েছেন। তারা হলেন যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান ও তৎকালীন ওসি (তদন্ত) জাকির হোসেন। হাবিবুর ছাড়া পলাতক অন্যরা হলেন ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারি জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো: মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন, এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান ও মো: শাহদাত আলী।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন ২০২৪ সালের ২০ জুলাই পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তাইম। তার বাবা মো: ময়নাল হোসেন ভূঁইয়াও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উপ-পরিদর্শক। ওই দিন বন্দুর সাথে বেরিয়ে যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলি খেয়ে লাশ হয়ে ফিরতে হয় তাকে। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ছেলের লাশ পেয়ে ফোনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ময়নাল বলেন, ‘স্যার, আমার ছেলেটা মারা গেছে। বুলেটে ওর বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। স্যার, আমার ছেলে আর নেই। এ সময় প্রশ্ন রেখে বলেছিলেন, একজনকে মারতে কতগুলো গুলি লাগে স্যার।’

ইনুর মামলা: ট্রাইব্যুনালে বাবা হত্যার বিচার চাইলেন ছেলে

চব্বিশের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে কুষ্টিয়ায় ছয় হত্যা, উসকানি, ষড়যন্ত্রসহ সুনির্দিষ্ট আট অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে এসে বাবা হত্যার বিচার চেয়েছেন ছেলে।

গতকাল বুধবার বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ বিচার প্রার্থনা করেন তিনি। প্যানেলের অন্য সদস্য জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এ মামলায় সাত নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন এই যুবক। নিরাপত্তার স্বার্থে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন তার বাবা।

জবানবন্দীতে সাক্ষী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনে আমার বাবাসহ এলাকার অনেকেই অংশ নেন। ওই সময় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বামপন্থী অন্যান্য দলের নেতাকাদের উসকানি ও নির্দেশে কুষ্টিয়ার সাবেক এসপি পলাশ কান্ত রায় ও এসআই সাহেব আলীর বাহিনী মিলে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালান। এতে আমার বাবাসহ ছয়জন হত্যার শিকার হন।

তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর আমাকে একজন লোক ফোন করে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে যেতে বলেন। হাসপাতালে গিয়ে বাবার গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে থাকতে দেখি। পরে লাশটি নিজ বাড়িতে নিয়ে আসি। ওই দিন একই এলাকায় তিনজন শহীদ হন। তিনজনেরই একসাথে নামাজে জানাজা হয়। ট্রাইব্যুনালের কাছে আমার বাবা হত্যার বিচার চাই।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাকে জেরার জন্য সময় চান ইনুর আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। পরে আগামী ৬ জানুয়ারি দিন ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার ও সহিদুল ইসলাম।

এ দিন সকালে কারাগার থেকে ইনুকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন সাবেক এই তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি। গত ২ নভেম্বর ইনুর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। তাদের গুলিতে শহীদ হন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ। আহত হন বহু নিরীহ মানুষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। পরে তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ এনে ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) জমা দেয় প্রসিকিউশন।