এক যুগ পর স্বস্তির ঈদযাত্রা

আবুল কালাম
Printed Edition
1st 3
যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান উড়াল সেতু গতকাল ছিল অনেকটাই ফাঁকা : নয়া দিগন্ত

প্রায় এক যুগ পর ঈদে স্বস্তিতে বাড়ি ফিরছেন মানুষ। মহাসড়কে কোথাও যানজট নেই। ট্রেনেও শিডিউল বিপর্যয় নেই। বাড়ি ফিরতে দীর্ঘ পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার প্রয়োজনও পড়েনি। মাইলের পর মাইল সীমাহীন জটে পড়ে পাঁচ ঘণ্টার যাত্রা পথে ১২ ঘণ্টা অতিবাহিত হয়নি। ঈদে মহাসড়কে শৃঙ্খলায় কোনো বিড়ম্বনা ছাড়াই সময়মতো মানুষ ফিরতে পারছেন পরিজনের কাছে। অন্যদিকে ১০টার ট্রেনও ১২টায় ছাড়েনি। নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনও যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছায় আনন্দিত মানুষ। তারা বলছেন, বিগত প্রায় এক যুগ পর এই প্রথম কোনো বিড়ম্বনা ছাড়াই ঈদে সবাই বাড়ি ফিরতে পেরেছে।

সায়েদাবাদসহ ঢাকার বাস টার্মিনালগুলো ঘুরে সাধারণ সময়ের মতোই যাত্রীদের উপস্থিতি দেখা যায়। কোথাও ভিড় দেখা যায়নি। বাস চালকরা জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল যাত্রায় মহাসড়কে যানজট না থাকায় সায়েদাবাদ থেকে প্রায় প্রতিটি বাস নির্দিষ্ট সময় ছেড়ে যাচ্ছে। এতে আনন্দ নিয়েই যাত্রা করছেন বাড়ি ফেরা মানুষ।

জানা গেছে, সরকার ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি অপরাধ দমনে চেকপোস্ট বসিয়ে সড়কে রয়েছেন সেনাবাহিনী। সহযোগিতায় রয়েছে কমিউনিটি পুলিশিং, রোভার স্কাউট ও আনসার সদস্যরা। অন্যদিকে মহাসড়কে যানজটপ্রবণ স্পটে শৃঙ্খলা ফেরাতে কয়েক হাজার পুলিশ, রোভার স্কাউট সদস্য এবং সেনাবাহিনী ও আনসার সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। অন্যদিকে মহাসড়কে রাতে যানবাহনে ডাকাতি ও ছিনতাই বন্ধে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা দিতে ২৪ ঘণ্টা টহল অব্যাহত রেখেছে হাইওয়ে পুলিশ। রাতে মহাসড়কে সন্দেহজনক কাউকে দেখলেই আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

রাজধানীর বাস মালিকরা জানান, অনেক বছর পর এবার মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরেছে। ফলে প্রতিটি বাস তার গন্তব্যে নির্ধারিত সময়ে যেতে পারছে। তাদের ভাষ্য, বিগত প্রায় এক যুগ তারা ঈদযাত্রায় ভয়ানক সমস্যায় পড়েছেন। মহাসড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, মাইলের পর মাইল যানজট ঈদযাত্রাকে আনন্দের পরিবর্তে আতঙ্কের করে তুলেছিল। এবার সে আতঙ্ক কেটেছে। আনন্দের যাত্রা আনন্দ নিয়েই মানুষ গন্তব্যে ফিরছে।

কমলাপুর, সায়েদাবাদ, কল্যাণপুর, মহাখালীসহ ট্রেন ও দূরপাল্লার বাসস্টেশন ঘুরে দেখা যায় যাত্রীরা নিজ গন্তব্যে ফেরার উদ্দেশ্যে অপেক্ষারত। মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে কয়েকজন যাত্রী জানান, তারা এবার কোনো আতঙ্ক ছাড়াই বাড়ি ফিরছেন। কারণ বিগত বছরগুলোতে বাড়ি ফিরতে হলে যানজট আতঙ্কে থাকতে হতো। মহাসড়কে মাইলের পর মাইল যানজট ঈদের সব আনন্দকে মাটি করে দিতো। এবার আর তা নেই। যারা যাচ্ছেন তারা সবাই কোনো বিড়ম্বনা ছাড়াই বাড়ি ফিরছেন।

মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে বাড়ি ফেরা কয়েকজন জানান, অন্যান্য বছর এমনও হয়েছে। আগের দিন বাসে চড়ে যানজটে রাত দিন বসে বাসের মধ্যেই ঈদ করতে হয়েছে। তাতে আনন্দের চেয়ে বিড়ম্বনাই ছিল বেশি। তাই এবার তারা আনন্দিত। কারণ ইতোমধ্যে যারা ফিরেছেন তাদের কাউকেই কোনো যানজটে পড়তে হয়নি। যথাসময়েই তারা বাড়ি ফিরতে পেরেছেন।

কমলাপুর রেলস্টেশন ম্যানেজার জানান, এবার তাদের ট্্েরনে কোনো শিডিউল বিপর্যয় হয়নি। যথাসময়ে প্রতিটি ট্্েরন যাত্রা করে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে। তাতে করে মানুষ স্বস্তির যাত্রা উপভোগ করছে।

বাসচালকরা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে প্রতি বছর ঈদে ঘরমুখো মানুষকে যানজটের কবলে পড়তে হয়। তবে এ চিত্র এবার ভিন্ন। ঈদযাত্রায় স্বস্তিতে বাড়ি ফিরছেন মানুষ। কুমিল্লার অংশের ১০৫ কিলোমিটার এলাকার যানজটপ্রবণ এলাকাগুলোতে যানবাহনের ধীরগতি থাকলেও নেই কোনো যানজট।

তিশা পরিবহনের একজন যাত্রীর ভাষ্য, এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক বলা যায়। ঢাকা থেকে কুমিল্লায় যারা গেছেন তাদের সময় লেগেছে মাত্র আড়াই ঘণ্টা। এটা বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ অন্যান্য বছর যানজটের কারণে ৬-৭ ঘণ্টা সময় লাগতো। এবার সড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ছিল প্রশংসনীয়।

স্টারলাইন পরিবহনের অপর যাত্রী বলেন, পরিবার নিয়ে ঢাকা থেকে ফেনী যাবেন। অন্যান্য বছর এ নিয়ে দুশ্চিন্তা হতো। এবার সেই শঙ্কা না থাকায় স্বস্তিতেই বাড়ি ফেরা যাচ্ছে। বলা যায় এক যুগ পর ভোগান্তি ছাড়া প্রথম ঈদযাত্রা। একজন বাসচালক জানান, এবার ঈদ ছুটিতে মহাসড়কে কোথাও যানজট নেই। তাই গাড়ি চালিয়ে আনন্দ পাচ্ছেন। একই অবস্থা দেশের প্রতিটি রুটে। ঢাকা থেকে দেশের সব গন্তব্যে গাড়ি যথাসময়ে ছেড়ে কোনো বিড়ম্বনা ছাড়াই যথাসময়ে পৌঁছাচ্ছে। তবে বাস টার্মিনালের বিভিন্ন কাউন্টারে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়া হচ্ছে এমন অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।

এমন অভিযোগে গতকাল সকালে সায়েদাবাদের জনপথ মোড়ে কয়েকটি বাস কাউন্টারে অভিযান চালান ভোক্তা অধিকারের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাস। এ সময় ইকোনো সার্ভিসের দু’টি কাউন্টারে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় এক লাখ টাকা, হানিফ পরিবহনের কাছ থেকে ২০ হাজার ও জোনাকি পরিবহন থেকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

ঢাকা-যমুনা সেতু সড়কেও নেই যানজট

বাসস জানায়, প্রতি বছরের মতো এ বছরও ঈদকে কেন্দ্র করে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। তবে যানবাহনের চাপ বাড়লেও মহাসড়কে নেই যানজট। স্বাভাবিক গতিতেই চলছে যানবাহন। তবে প্রচণ্ড রোদের কারণে সামনে মরীচিকা তৈরি হওয়ায় যানবাহনে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছে শিশু, বৃদ্ধ, নারী ও পুরুষ।

জানা যায়, যমুনা সেতুর ওপর দিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৮ হাজার ৩৩৫টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এতে টোল আদায় হয়েছে তিন কোটি ৩৮ লাখ ৫২ হাজার ৯০০ টাকা।

ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের এলেঙ্গা বাসস্টেশন, রাবনা বাইপাস, আশেকপুর বাইপাস ঘুরে দেখা যায়, অনেকেই যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছেন। যাত্রীবাহী বাস ছাড়াও ট্রাক, পিকআপ, বিভিন্ন সড়কের লোকাল বাস ও লেগুনায় যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। মহাসড়কে বাসের চেয়ে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলই বেশি দেখা গেছে। ঈদ উপলক্ষে বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে যাত্রীদের। যাত্রী পরিবহন করছে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকার। গণপরিবহন সঙ্কট ও অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খোলা ট্রাক, পিকআপ ও বাসের ছাদে করে গন্তব্যে পাড়ি দিচ্ছেন।

রুহুল আমিন নামে এক যাত্রী বলেন, ‘বাড়ি যেতে আমাদের বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। তবে এলেঙ্গা পর্যন্ত ভালো ভাবেই এলাম। গাড়ি স্বাভাবিক গতিতেই চলেছে। তবে পরিবহন সঙ্কটের জন্য অনেকেই ট্রাক ও পিকআপে বাড়ি যাচ্ছেন।’

হৃদয় নামে এক যাত্রী বলেন, ‘আমি বগুড়া যাবো। ঢাকা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত কোনো যানজট পাইনি। স্বস্তিতেই বাড়ি যাচ্ছি।’

যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষ জানায়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে শুক্রবার রাত ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪৮ হাজার ৩৩৫টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এতে টোল আদায় হয়েছে এক কোটি ৯০ লাখ ৯৮ হাজার ৫৫০ টাকা।

যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুল কবীর পাভেল গতকাল সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এ বছর ঈদযাত্রায় যমুনা সেতুর দুই পাশে ৯টি করে মোট ১৮টি বুথ দিয়ে যানবাহন পারাপার হচ্ছে। এ ছাড়া দুই পাশেই মোটরসাইকলের জন্য আলাদা দু’টি করে বুথ রয়েছে। এতে নির্বিঘেœ মানুষ যাতায়াত করতে পারছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৯ হাজার ১৬৩টি মোটরসাইকেল পারাপার হয়েছে।

জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষকে স্বস্তি দিতে সাড়ে সাত শ’ পুলিশ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে নিয়োজিত আছেন। জেলা পুলিশের প্রতিটি সদস্য তীব্র গরমকে উপেক্ষা করে মহাসড়কে কাজ করে যাচ্ছেন।