বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

মেসির আরেকটি রেকর্ড

Printed Edition
first-2
মেসিকে আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা জর্দানের নূর আল রাওয়াবদেহর : ইন্টারনেট

যদি ৫৫ মিনিটে জর্দানের মুসা তামারি গোলটি না করতেন তাহলে লিওনেল মেসির মাঠে নামা হতো কি না সন্দেহ। বিশ্বকাপে এবারই অভিষেক হওয়া জর্দান ৫৫ মিনিটে স্কোর ১-২ করে ফেলে। বাকি সময়ে আর একটি গোল করলেই ম্যাচে সমতা আসবে। শতভাগ জেতা হবে না গ্রুপ পর্বে। তাই আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি মেসিকে নামাতে আর দেরি করেননি। অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে মাঠে নামান তিনি। একজন তারকা ফুটবলারের মাঠে উপস্থিতি মানে পুরো দলই চাঙ্গা হয়ে যাওয়া। আর্জেন্টনা দল মেসি নামার পর আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এরপর যার গোলের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব, সেই মেসি গোল করলেন। ফ্রি-কিক থেকে নেয়া মেসির শট জর্দানের গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে জালে আশ্রয় নেয়। সাথে সাথেই আরেকটি রেকর্ডের মালিক হয়ে যান আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। বিশ্বকাপে টানা সাত খেলায় গোল করা একমাত্র ফুটবলার হলেন তিনি। এর মাধ্যমে ভেঙে দিয়েছেন ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইনের টানা ছয় ম্যাচে করা গোলের রেকর্ডকে।

আগের খেলাতেই নিশ্চিত হয়েছিল নকআউট পর্ব। তাই জর্দানের বিপক্ষে নিয়ম রক্ষার এই ম্যাচে একাদশে বড়সড় পরিবর্তন আনেন আর্জেন্টিনার কোচ। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে খেলা একাদশের ৯ জনই ছিলেন না এই ম্যাচে। শুধু পোস্টের নিচে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ও ফরোয়ার্ড লাইনে লাউতারো মার্টিনেজ ছিলেন। রিজার্ভ বেঞ্চের এই ফুটবলাররাই ম্যাচে এগিয়ে দেয় তিনবারের বিশ্বকাপজয়ীদের। টানা তিন ম্যাচে তিন জয় দিয়ে ‘জে’ গ্রুপের শীর্ষে রেখেছে ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়নদের।

প্রথমেই জিওভান্নি লা সেলসোর শট জালে গেলেও রেফারি তা অফসাইডের কারণে বাতিল করে দেন। বিশ্বকাপে নিজের অভিষেকের এই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত গোল করেই ছাড়েন লা সেলসো। ১৯ মিনিটে তার নেয়া ফ্রি-কিকের শটে কিছুই করতে পারেননি জর্দানের গোলরক্ষক। অবশ্য এই গোলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির গোলরক্ষক আবু লাইলা দায়ী। তিনি ফ্রি-কিকের সময় যে দেয়াল করতে সতীর্থদের নির্দেশ দেন সেই দেয়ালের পেছনে ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। লা সেলসোর শটের সময় দেয়ালের পেছনে চলে আসেন। এতে করে তার পক্ষে বল ঠিকমতো দেখা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে বল দেখেও লাভ হয়নি। ঠেকানো যায়নি লা সেলসোর শট। ৩১ মিনিটে স্কোর দ্বিগুণ করে আর্জেন্টিনা। পোস্টে শট নিয়েছিলেন লাউতারো মার্টিনেজ। সেই বল ক্রসবারে লেগে ফেরত আসে। ফিরতি বলে ডাইভিং হেড নিতে যান আর্জেন্টিনার মার্কোস সেনসি। তিনি হেডও নিয়েছিলেন। সেই হেড ঠেকিয়ে দেন জর্দানের গোলরক্ষক। তবে সেনসির হেডের সময় তার মুখে লাথি মারেন জর্দানের আল রাশদান। ফলে ভিএআর দেখে রেফারি নির্দেশ দেন পেনাল্টির। এই স্পট কিকটি নিতে এসে সফল লাউতারো মার্টিনেজ। গোলরক্ষককে বাম দিকে ফেলে ডান পায়ে ডান দিকে শট নেন তিনি। এতেই গোল। কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে টাইব্রেকারে উইনিং গোল করেছিলেন তিনি। তখনো এই স্টাইলেই গোল করেছিলেন মার্টিনেজ।

৫২ মিনিটে অল্পের জন্য গোল পাননি লাউতারো। বক্সের কোনা থেকে তার নেয়া শট ক্রসবার ছুঁয়ে বাইরে যায়। এর দুই মিনিট পরেই খেলায় দারুণভাবে ফেরার বার্তা দেয় জর্দান। ডান দিক থেকে আসা ক্রসে পা লাগিয়ে ব্যবধান কমান মুসা আল তামারি। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে এই গোল। স্কোর ২-১ হওয়ার পর জর্দান উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। অন্য দিকে আর্জেন্টিনার মনে তখন ২০২২ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে হারের দুঃসহ স্মৃতি। যেখানে সৌদি আরবের বিপক্ষে লিড নিয়েও হারতে হয়েছিল তাদের।

তাই কোনো ঝুঁকি না নিয়ে কোচ লিওনেল স্কালোনি মাঠে নামান মেসিকে। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক ৬০ মিনিটে মাঠে নাামর পর ৬৬ মিনিটে ফ্রি-কিক পায় ল্যাটিন আমেরিকার দেশটি। মেসির সেই শট বারের ওপর দিয়ে গেলেও ৮০ মিনিটে আর হতাশা নয়। এবার তার মাটির সামান্য ওপর দিয়ে নেয়া ফ্রি-কিক ফের জর্দানের গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে জড়িয়ে যায় জালে। এবারো জর্দানের গোলরক্ষক শট নেয়ার সময় সামনে থাকা দেয়ালের পাশের ফাঁকা অংশে না দাঁড়িয়ে দাঁড়ান দেয়ালের পেছনে। এতে দেয়ালের পাশের ফাঁকা জায়গা দিয়ে বল জালে পাঠান বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি গোল করা সুপার স্টার। গতকালের এই গোল নিয়ে মেসির বিশ্বকাপে মোট গোল ১৯টি। আর এবারের বিশ্বকাপে ছয়টি।

এই গোল আর্জেন্টিনার ৩-১ জয় নিশ্চিত করে। সে সাথে দুই বিশ্বকাপ মিলে টানা সাত ম্যাচে গোল করার রেকর্ড গড়লেন মেসি। বার্সেলোনার সাবেক এই তারকা কাতার বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে, সেমিতে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে এবং ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করেন। ওই চার ম্যাচের সাথে মিল রেখে এবার টানা তিন ম্যাচে অর্থাৎ, আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া এবং জর্দানের বিপক্ষে গোল করলেন। এতে টপকে গেলে ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইনের টানা ছয় বিশ্বকাপ ম্যাচে করা গোলকে। মেসি এর আগে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে সর্বোচ্চ ১৮ গোলের রেকর্ড গড়েছিলেন। কাল তা ১৯-এ নিয়ে যান।

এর মাধ্যমে আর্জেন্টিনা পাঁচটি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের সব খেলায় জিতল। এর মধ্যে পরপর দুই বিশ্বকাপে অর্থাৎ ২০১০ ও ২০১৪ সালেও গ্রুপ পর্বের সব খেলায় জিতেছিল।

মেসির গতকালকের ম্যাচে হয়তো গোল আরো বেশি হতো। যদি তিনি শুরু থেকেই খেলতেন। তাহলে লা সেলসোর ফ্রি-কিক এবং লাউতারো মার্টিনেজের পেনাল্টি শট মেসিই নিতেন। অবশ্য এই ডালাসের মাঠেই অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি।

জাস্ট ফন্টেইন ১৯৫৮ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তিনটি, জুগোসøাভিয়ার বিপক্ষে দু’টি স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে একটি, কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দু’টি, সেমিতে ব্রাজিলের বিপক্ষে একটি এবং তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে চার গোল করেন। ছয় ম্যাচে তার গোল ছিল ১৩টি- যা এখনো রেকর্ড। মেসি সাত ম্যাচে করেছেন ১১ গোল। কাতার বিশ্বকাপে মেসি যদি পোল্যান্ডের বিপক্ষে গোল পেতেন তাহলে টানা ১০ ম্যাচে গোল করা হতো তার। পোল্যান্ড ম্যাচের আগে মেক্সিকো ও সৌদি আরবের বিপক্ষে গোল ছিল তার।

তিনে তিন ম্যাচ জিতে আকাশে উড়তে থাকা আর্জেন্টিনাকে ৪ জুলাই সেরা ৩২-এর ম্যাচে খেলতে হবে কেপ ভার্দের বিপক্ষে।