গাজায় ইসরাইলি হামলায় শিশুসহ নিহত ১১
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকাজুড়ে পৃথক হামলায় অন্তত ১১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে। গত মঙ্গলবার এই হামলা চালানো হয়। গত বছরের ১০ অক্টোবর হামাস-ইসরাইল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও একের পর এক হামলা চালয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি বাহনী।
গাজার সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ ও রয়টার্সের বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, মঙ্গলবার এই হামলায় নিহতদের মধ্যে তিন বছর ও ১৪ বছর বয়সী দুই শিশু রয়েছে। গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, গাজা শহরে একটি পুলিশ ভ্যানকে লক্ষ্য করে চালানো হামলায় তিন বছরের শিশুসহ চারজন নিহত হয়েছেন। গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শহরের কেন্দ্রে পুলিশ ভ্যানটি লক্ষ্য করে ইসরাইলি যুদ্ধবিমান হামলা চালানো হয়। এতে পুলিশ কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন নিহত ও ৯ জন পথচারী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাসাল আরো জানান, এদিন ভোরে উত্তরের বেইত লাহিয়া এলাকায় ইসরাইলি গুলিবর্ষণে এক ব্যক্তি নিহত হন।
সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, গাজা শহরে শাতি শরণার্থী শিবিরের একটি মোড়ের কাছে ইসরাইলি হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। আল-শিফা হাসপাতালের চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন, শাতি শরণার্থী শিবিরে একদল মানুষের ওপর ইসরাইলি ড্রোনের দু’টি মিসাইল হামলায় নিহত পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করে হাসপাতালে আনা হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, একটি ক্যাফের কাছে ওই হামলা চালানো হয় এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ইরান যুদ্ধের পর গাজায় নিহত আরো ২৪১
ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা শুরুর পর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় অন্তত ২৪১ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪২২ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু। ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও হামলা থামেনি। ফেব্রুয়ারি ২৮ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত হামলার তীব্রতা ওঠানামা করলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা আবার বেড়েছে। মাত্র দুই দিনেই বিভিন্ন স্থানে হামলায় আরো ১৬ জন নিহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া হামলায় এখন পর্যন্ত মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৩৪৪ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন এক লাখ ৭২ হাজার ২৪২ জন। এখনো বহু লাশ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্য দিকে পশ্চিমতীরেও অভিযান চালিয়ে ১৭ জন ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরাইলি বাহিনী, যাদের মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামলা অব্যাহত থাকা এবং বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনা আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং মানবিক সঙ্কটকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।
ওষুধ-সরঞ্জাম সঙ্কট : ভেঙে পড়ার মুখে গাজায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি অবরোধ ও সহায়তা প্রবেশে বিধিনিষেধের কারণে স্বাস্থ্যসঙ্কট দ্রুত গভীর হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে চিকিৎসক ও মানবিক সংস্থাগুলো। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, প্রয়োজনীয় ওষুধের অর্ধেকের বেশি এখন ‘শূন্য মজুদে’ রয়েছে, অর্থাৎ পুরো গাজায় সেগুলো আর কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। খবর আনাদোল এজেন্সির। এ ছাড়া পরীক্ষাগারের ৭১ শতাংশ উপকরণ এবং ৫৭ শতাংশ চিকিৎসা সরঞ্জামও শেষ হয়ে গেছে। সাধারণ ব্যান্ডেজ, সূঁচ, গ্লাভস, জীবাণুনাশকসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পর্যন্ত তীব্র সঙ্কটে রয়েছে। ইসরাইলের পক্ষ থেকে অস্ত্রোপচারের টেবিল, ভেন্টিলেটর, আল্ট্রাসাউন্ড যন্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আল-শিফা হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, ‘আমরা অনেক সময় পূর্ণ অজ্ঞান না করেই অস্ত্রোপচার করতে বাধ্য হচ্ছি।’ হৃদরোগ ও মস্তিষ্কের জটিল অস্ত্রোপচার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অন্য দিকে শরণার্থী শিবিরগুলোতে নোংরা পরিবেশ, দূষিত পানি, ইঁদুর ও পোকামাকড়ের উপদ্রবের কারণে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই প্রায় ১৯ লাখ মানুষ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়াও জ্বালানি ও ওষুধের তীব্র সঙ্কটের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য প্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বারশ বলেন, চকোলেট ও কোমল পানীয় এলেও জীবনরক্ষাকারী জ্বালানি ও ওষুধের প্রবেশ সীমিত রাখা হচ্ছে। তিনি জানান, বিশেষ করে হাসপাতালের ইনকিউবেটরে থাকা নবজাতকদের জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ বিদ্যুৎ চালাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি নেই। এ ছাড়াও চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা ১৮ হাজারের বেশি রোগীর অনেকেই চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছেন বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। সার্বিকভাবে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকিতে গাজার শিশুরা
গাজায় চলমান অবরোধ ও পণ্যের প্রবেশে বিধিনিষেধের কারণে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় ডায়াপারের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে, যা নতুন এক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। খবর নিউ আরব নিউজের। স্থানীয় বাজারে ডায়াপারের সরবরাহ প্রায় নেই বললেই চলে, আর যা পাওয়া যাচ্ছে তার দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আগে যে পণ্যটির দাম ছিল প্রায় তিন ডলার, এখন তা ৩০ ডলারেরও বেশি। ফলে অধিকাংশ পরিবার এটি কিনতে পারছে না। বাধ্য হয়ে অনেক মা কাপড়, টিস্যু বা অন্য অস্থায়ী উপায় ব্যবহার করছেন, যা শিশুদের ত্বকে সংক্রমণ ও গুরুতর চর্মরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের ত্বকের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শরণার্থী শিবিরগুলোতে পানির সঙ্কট ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। অনেক মা দিনে ডায়াপার ব্যবহার কমিয়ে রাতে সীমিতভাবে ব্যবহার করছেন, যাতে কিছুটা সাশ্রয় করা যায়। এই সঙ্কট শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, মানসিক চাপও তৈরি করছে। অনেক অভিভাবক নিজেদের অসহায় মনে করছেন। মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, প্রয়োজনীয় সহায়তা দ্রুত বাড়ানো না হলে শিশুদের এই সঙ্কট আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে। পশ্চিমতীরে সড়ক বন্ধ, খোলা আকাশের নিচে পাঠদান
অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সড়ক অবরোধের কারণে শিক্ষার্থীদের খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণাঞ্চলের মাসাফের ইয়াত্তা এলাকার উম্ম আল-খায়ের গ্রামের বাসিন্দারা জানান, ভোরে প্রধান সড়কটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়, ফলে প্রায় ৫৫ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে পারেনি। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
স্থানীয়রা সড়ক খুলে দেয়ার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করলে ইসরাইলি বাহিনী হস্তক্ষেপ করে এবং কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে, এতে শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মী তারেক আল-হাজ্জালিন বলেন, এটি শুধু সড়ক বন্ধ নয়, বরং শিশুদের শিক্ষার অধিকার সীমিত করার একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ। ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী সারা জানায়, দীর্ঘ বিরতির পর স্কুলে ফিরে তারা আবারো একই বাধার মুখে পড়ে। বাধ্য হয়ে তারা রাস্তাতেই ক্লাস চালিয়ে যায়। স্থানীয় সূত্র বলছে, চলমান দখলনীতি ও হামলার কারণে শিক্ষাসহ দৈনন্দিন জীবনের নানা খাতে বড় ধরনের বিঘœ ঘটছে। শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।