পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় আত্রাইয়ের কৃষক
দরপতনের দুশ্চিন্তায় উলিপুরের বোরো চাষি
Printed Edition
আত্রাই (নওগাঁ) সংবাদদাতা
নওগাঁর আত্রাইয়ে উজানের ঢল ও আকস্মিক পানি বৃদ্ধিতে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছে মাঠের শত শত একর পাকা বোরো ধান। নদীর পানি দ্রুত বেড়ে বিভিন্ন খাল ও ডারা দিয়ে ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ায় চরম উৎকণ্ঠায় সময় কাটাচ্ছেন কৃষকেরা। কষ্টে ফলানো সোনালি ফসল রক্ষায় অনেকেই এখন দিন-রাত মাঠে অবস্থান করছেন।
ভৌগোলিক কারণে আত্রাই উপজেলার ভেতর দিয়ে ছোট যমুনা ও আত্রাই নদী প্রবাহিত হয়েছে। গত দুই দিন ধরে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদী দু’টির পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে উপজেলার বড় কালিকাপুর, হরপুর, রসুলপুর, জাতোপাড়াসহ কয়েকটি নিচু এলাকার ফসলি জমিতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে।
এ দিকে রক্তদহ বিলের পানিও হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় জামগ্রাম খাল দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। সেই পানি সোনাইডাঙ্গা, লাকবাড়িয়া, বাঁকা ও জামগ্রাম এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠের দিকে ধেয়ে আসছে। ফলে পাকা ধান নিয়ে দুশ্চিন্তা আরো বেড়েছে।
গত সোমবার সরেজমিন সোনাইডাঙ্গা এলাকায় দেখা গেছে, ফসল রক্ষায় কৃষকরা স্বেচ্ছাশ্রমে যুদ্ধকালীন তৎপরতা চালাচ্ছেন। মাইকিং করে দলবদ্ধভাবে তারা কাঠ, বাঁশ ও বালুর বস্তা দিয়ে খালের ব্রিজের মুখ ও বিভিন্ন চ্যানেলের ভাঙা অংশ মেরামতের চেষ্টা করছেন, যাতে পানি প্রবেশ কমানো যায়।
সোনাইডাঙ্গা গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন ও বাঁকা গ্রামের হাফেজ উদ্দিন জানান, মাঠে এখন তাদের স্বপ্নের সোনালি ধান। কিন্তু টানা বৈরী আবহাওয়ায় ধান কাটতে পারছেন না। এর মধ্যে মাঠে পানি ঢুকে পড়ায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। চোখের সামনে কষ্টার্জিত ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তাই দিন-রাত এক করে বাঁধ রক্ষার কাজ করছেন।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগও তৎপর রয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ প্রসেজিৎ তালুকদার জানান, নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফসলের ওপর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে সমন্বয় করে নদীমুখের সব সøুইসগেট বন্ধ করা হয়েছে, যাতে মাঠে পানি প্রবেশ কমানো যায়।
তিনি আরো বলেন, কৃষকদের আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রকৃতির বৈরী পরিস্থিতিতে এখন কৃষকের একটাই লড়াই, যে করেই হোক সোনালি ধান বাঁচানো।
দরপতনের দুশ্চিন্তায় উলিপুরের বোরো চাষি
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের উলিপুরে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও স্বস্তি নেই কৃষকের মনে। মাঠজুড়ে ধান কাটা-মাড়াইয়ের ব্যস্ততা থাকলেও টানা বৃষ্টি, শ্রমিক সঙ্কট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে ধানের নিম্নমূল্যে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বোরো চাষিরা। ভেজা ধান ঘরে তুলেও শুকাতে না পারায় লোকসানের আশঙ্কা আরো বেড়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে অনেক জমির পাকা ধান এখনও মাঠে পড়ে আছে। কাটা ধানও ঠিক মতো শুকানো যাচ্ছে না। এতে ধানের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্য দিকে শ্রমিক সঙ্কটের কারণে ধান কাটার মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে কয়েক গুণ।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উলিপুরে ২২ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড ৮ হাজার ৩৯০ হেক্টর, উফশী ১৪ হাজার হেক্টর এবং স্থানীয় জাত ১৪০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার ৭৭৫ মেট্রিক টন।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, কৃষকেরা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ধান কাটছেন। তবে হঠাৎ বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির আশঙ্কায় তাদের উৎকণ্ঠা বাড়ছে। অনেকেই বলছেন, ফলন ভালো হলেও বাজারদর না থাকায় লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
থেতরাই ইউনিয়নের হারুনেফড়া এলাকার কৃষক আশরাফ আলী জানান, তিনি আট বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। সারের উচ্চমূল্য, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে ব্যয় অনেক বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘কিছু ধান ঘরে তুলেছি, কিন্তু বেশির ভাগ এখনো মাঠে। আবহাওয়া খারাপ, শুকাতে পারছি না। এখন যে দামে ধান বিক্রি হচ্ছে তাতে খরচই উঠবে না।’
কৃষক ফুল মিয়া, আমজাদ আলী, সুশান্ত কুমার, আব্দুল হামিদ ও জাহাঙ্গীর আলমসহ অনেকে জানান, বোরো ফসলের ওপরই তাদের সারা বছরের সংসার নির্ভরশীল। কিন্তু চাষাবাদের সব খরচ বাড়লেও ধানের দাম না বাড়ায় তারা হতাশ।
রাজারহাট আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৬১ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এমন আবহাওয়া আরো কয়েক দিন থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন বলেন, আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করায় এবার ফলন ভালো হয়েছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া বিবেচনায় দ্রুত পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাজারদর বাড়লে কৃষকরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।