২০১৫ সালের ৩১ জুলাই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে ছিটমহল সমস্যার অবসান ঘটে। চুক্তি অনুযায়ী, দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় পরিচয়হীনতায় বসবাস করা হাজারো মানুষ বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পান। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তারা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান ও মৌলিক নাগরিক সুবিধার নিশ্চয়তা মিলবে- এমন প্রত্যাশা ছিল তাদের। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় পর বাস্তবতা বলছে- সেই স্বপ্নের বেশির ভাগ এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। বাস্তবে মানচিত্রে স্থান মিললেও উন্নয়নের মূল ধারায় তাদের অন্তর্ভুক্তি এখনো অসম্পূর্ণ।

‘মানচিত্রে ঠাঁই মিললেও প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে বন্দী ছিটমহলবাসী’-শিরোনামে নয়া দিগন্তে গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে সাবেক ছিটমহলবাসীর বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। উল্লিখিত প্রতিবেদন বলছে, বহু সাবেক ছিটমহলে এখনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন সীমিত। কর্মসংস্থানের সুযোগ অপ্রতুল। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার মান কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছেনি। নাগরিকত্ব অর্জনের আনন্দের সাথে উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো- উন্নয়নের ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে বৈষম্য স্পষ্ট। কোথাও কিছু রাস্তা নির্মাণ বা বিদ্যুৎসংযোগের কাজ হলেও অনেক এলাকায় এখনো চলাচলের উপযুক্ত সড়ক নেই। এতে করে বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। চিকিৎসার জন্য উপজেলা বা জেলা শহরে যেতে হয়; যা জরুরি মুহূর্তে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ না থাকায় তরুণদের বড় অংশ বেকারত্ব কিংবা অনিশ্চিত পেশায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। অন্য দিকে ভূমির মালিকানা, জমির রেকর্ড, খতিয়ান ও প্রশাসনিক নানা জটিলতা এখনো অনেকের জীবনে বড় সমস্যা হয়ে আছে। নাগরিকত্ব পেলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কৃষি সহায়তা কিংবা ক্ষুদ্রঋণের মতো উন্নয়ন কার্যক্রমে সবাই সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।

অবশ্য সরকারের উদ্যোগে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও হয়েছে। ভোটাধিকার নিশ্চিত হয়েছে। বিদ্যুৎসংযোগ সম্প্রসারণ হয়েছে। কিছু এলাকায় রাস্তা নির্মাণ ও সরকারি সেবা বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করা সম্ভব নয়। সঙ্গতকারণে প্রয়োজন সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা। বিশেষ বরাদ্দ, নিয়মিত তদারকি এবং স্থানীয়দের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের গতি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছাবে না।

সাবেক ছিটমহলের মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায় শুধু নাগরিকত্ব প্রদানে শেষ হয় না। জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। যেসব মানুষ দীর্ঘ দিন রাষ্ট্রহীনতার যন্ত্রণা বহন করেছেন, তাদের উন্নয়নকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

স্থল সীমান্ত চুক্তির প্রকৃত সার্থকতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন সাবেক ছিটমহলবাসী কেবল মানচিত্রে নয়, উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধাতেও দেশের অন্য নাগরিকের মতো সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করবেন। আমরা মনে করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগে সাবেক ছিটমহলগুলো জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করে অগ্রাধিকার দিতে হবে।