আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা
Printed Edition
গত ৬ মাসে রাজধানীতেই খুন ১২১
- বীভৎস নৃশংসতায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে জনসাধারণের
- আসকের হিসাবে গত ছয় মাসে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার ৬৫ জন
রাজধানীর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত বিনতে আজিজের আজ তৃতীয় সেমিস্টারের পরীক্ষা। গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিওতে দেখেন গত বুধবার সন্ধ্যায় পুরান ঢাকায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে একদল সন্ত্রাসী নৃশংস ও বীভৎসভাবে হত্যা করছে। ওই ভিডিও দেখার পর থেকেই নুসরাতের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তিনি পড়ার টেবিলেও মন বসাতে পারছেন না বলে জানান।
এই বীভৎস দৃশ্য শুধু নুসরাতই নয়, গোটা দেশজুড়ে চলছে সমালোচনার ঝড়। গত বুধবার সোহাগের হত্যার পর অল্প সময়ের ব্যবধানে আরো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে চাঁদপুরে এক ইমামকে মসজিদের ভেতর কুপিয়ে হত্যাচেষ্টা, চট্টগ্রামে স্ত্রীকে তার স্বামী হত্যার পর লাশ ১১ টুকরো করে বাথরুমে কমোডের ভেতর দিয়ে গোশত ফেলে দেয়া ও খুলনায় এক বিএনপির বহিষ্কৃত নেতাকে গুলি করার পর কুপিয়ে হত্যা করা। এ ছাড়াও ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে নিহত-আহত, মব তৈরি করে মারধরের পর হত্যা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে মানুষ।
২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এই চার খুনের পর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী নুসরাতের মতো দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বাড়ছে খুনোখুনি। যার ফলে সারা দেশের মানুষ রয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্যানুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গত ছয় মাসে শুধু রাজধানীতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১২১টি। এ ছাড়াও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ২৪৮টি, ডাকাতি ৩৩টি ও চুরির ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ৬৮টি। এর আগে ডিএমপির দেয়া তথ্যানুযায়ী গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত খুনের ঘটনা ঘটে ১৩৬টি। ডাকাতি ৩৬টি, দস্যুতা ২৪৩টি ও চুরির ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ২৮টি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) সূত্র জানায়, গত ছয় মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ২৭০টি। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন দুই হাজার ৭৭০ জন। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী খুনের শিকার হয়েছেন ৬৫ জন। আসকের তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ- বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় ছয়জন নিহত এবং আহত হয়েছেন ৩৩৯ জন। বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষের ঘটনায় ১৮৯ জন আহত এবং নিহত হয়েছেন দু’জন। আ’লীগ ও ছাত্রদলের সংঘর্ষের ঘটনায় একজন নিহত, আ’লীগ স্বেচ্ছাসেবক দলের সংঘর্ষের দু’টি ঘটনায় একজন নিহত ও দু’জন আহত, বিএনপির সাথে ছাত্রলীগের হামলায় একজন নিহত, যুবদল ও ছাত্রলীগের হামলায় একজন নিহত, বিএনপি ও শ্রমিক লীগের মধ্যে দু’টি ঘটনায় একজন নিহত ও আহত হয়েছেন চারজন।
এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের সাথে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে পাঁচটি। এসব ঘটনায় ৫৬ জন আহত এবং নিহত হয়েছেন চারজন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সাথে এনসিপির সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে একটি। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন একজন। এ ছাড়াও বিএনপির সাথে বিএনপির ১৩১টি সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৬ জন এবং আহত হয়েছেন এক হাজার ৪৭৭ জন। দলীয় কোন্দলে গত ছয় মাসে বিএনপির সাথে বিএনপির বিরোধপূর্ণ ঘটনায় আহত ও নিহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
সম্প্রতি : পুরান ঢাকায় ব্যবসায়ী খুন :
গত ৯ জুলাই ভাঙ্গাড়ি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে মিটফোর্ড হাসপাতাল চত্বরে পিটিয়ে ও ইট-পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তার পর লাশের ওপর চলে এই বর্বরতা। সিসিটিভিতে ধরা পড়া ছবিতে দেখা যায়, ব্যস্ত সড়কে অনেক মানুষের সামনে এ ঘটনা ঘটছে। উৎসুক জনতা এসব দৃশ্য দেখার পরও এগিয়ে আসেনি। কিন্তু ঘটনার ভয়াবহতায় তারাও হতবিহ্বল। হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যের ক্যাম্প ছিল পাশেই। তারাও কেউ এগিয়ে আসেনি। ভিডিওতে হত্যা ও বীভৎসতায় জড়িতদের হাত উঁচিয়ে চিৎকার করে উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশে কিছু বলতে শোনা যায়।
পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অপারেশন্স) এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এমন বীভৎসতা আগে দেখিনি’। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছে। তরুণদের একটা অংশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সমাজে শৃঙ্খলা ও ঐক্য বজায় না থাকলে বিপদ আরো বাড়বে। রক্তাক্ত লাশের ওপর যা হয়েছে, সেটি অবর্ণনীয়। এই আচরণ চিন্তার বাইরে।
গত ৯ জুলাই চট্টগ্রামের একটি ফ্ল্যাটে বাসার ভেতরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে নিজ স্ত্রীকে হত্যা করে লাশ ১১ খণ্ড করে ঘরের বিভিন্ন স্থানে ফেলে রেখে ঘাতক স্বামী পালিয়ে যায়। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভিকটিমের বড় ভাই মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন রুবেল বাদি হয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানায় একটি হত্যা মামলার দায়ের করেন। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও আসামিকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে র্যাব কার্যক্রম শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার অভিযান পরিচালনা করে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার বিজয়নগর থানাধীন ফুলবাড়িয়া এলাকা হতে হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি মো: সুমনকে (৩৫) গ্রেফতার করা হয়। পারিবারিক কলহের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত ১১ জুলাই বিকেলে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলে ফোন দিয়ে মহিলা কণ্ঠে জানানো হয় যে, ঢাকা কাঠমান্ডু ফ্লাইটে বোমা জাতীয় কিছু থাকতে পারে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বিমানটি থামানোর অনুরোধ জানানো হয় এবং ফ্লাইট থামিয়ে ব্যাপক তল্লাশি করে কোনো কিছুই পাওয়া যায়নি। এরই প্রেক্ষিতে ০১৬২৩৬৯৬২৮২ নম্বরের অবস্থান শনাক্ত করে উত্তরা মধ্য দক্ষিণখান এলাকায় একটি বাসায় সেনাবাহিনী ও র্যাব-১-এর একটি যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। পরে ওই নম্বর ব্যবহারকারী ইমনের স্ত্রী তাহমিনা ও ইমনের মা এবং ইমরান, র্যাবের হেফাজতে রয়েছে।
গত ২ জুলাই লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম থানায় সন্ত্রাসী কর্তৃক মব সৃষ্টির মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের আহত করে আসামিদের ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে তিনজন আসামিকে গ্রেফতার করে র্যাব।
এ ছাড়াও গত ৩ জুলাই কুমিল্লার মুরাদনগরে ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় একই পরিবারের মা ও দুই সন্তানকে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে হত্যার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ছয়জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
অন্য দিকে কুমিল্লায় এক নারীকে শ্লীলতাহানি ও নির্যাতন করে ভিডিওধারণ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে এ ঘটনায় গত ৩ জুলাই প্রধান আসামি শাহ পরানসহ ছয়জন আসামিকে গ্রেফতার করে র্যাব। এ ছাড়াও ভোলার তজুমদ্দিনে চাঁদার জন্য স্বামীকে মারধর এবং স্ত্রীকে ধর্ষণ মামলার আসামিকে গ্রেফতার করেছে র্যাব।
র্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) এ কে এম শহীদুর রহমান বলেন, আইনের শাসন সমুন্নত রাখা, মানবাধিকার রক্ষা, সব নাগরিকের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা, অপরাধ চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করা এবং অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। যখনই ঘটনা ঘটছে তখনই র্যাবের সদস্যরা ছুটে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে। তিনি বলেন, র্যাব জনগণের প্রকৃত বন্ধু ও আস্থার প্রতীক হিসেবে কাজ করছে। জনগণের বিশ্বাস অর্জন করাই হচ্ছে র্যাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বলে তিনি জানান।