ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

জ্বালানি নিরাপত্তায় বেশি ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

উপসাগরীয় অঞ্চলের সাথে উচ্চ অর্থনৈতিক নির্ভরতায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এশিয়া, মূলত জ্বালানি আমদানিকারক একটি অঞ্চল হওয়ায় এ যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রথমত, আমদানিকৃত তেল ও গ্যাসের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল হওয়ায় বাংলাদেশ তো বটেই চীনের মতো উচ্চ আয়ের দেশকেও অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিশোধিত তেলজাত পণ্য বা সারের চাহিদা পূরণে সঙ্কটে পড়তে হচ্ছে। এই জ্বালানি সঙ্কট এক দিকে সরবরাহ শৃঙ্খলকে ব্যাহত এবং প্রধান উৎপাদন খাতকে আঘাত হানছে, যার মধ্যে জ্বালানি-নির্ভর সেমিকন্ডাক্টর শিল্পও রয়েছে (যা হিলিয়ামের ঘাটতির কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে)। বাংলাদেশও চিকিৎসা খাতে হিলিয়াম আমদানি করে থাকে।

দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় অংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে পায় এবং ইরান সঙ্ঘাত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত উপসাগরীয় দেশগুলোতে এশিয়ার রফতানি একটি ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ছিল। জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধি এবং এশিয়াকে ইউরোপের সাথে সংযোগকারী উপসাগরীয় অঞ্চলের ট্রানজিট ফ্লাইটগুলো ব্যাহত হওয়ার কারণে পর্যটনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অধিকন্তু, এই জ্বালানি সঙ্কট বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্থর করার পাশাপাশি এশিয়ার উৎপাদিত পণ্যের রফতানির চাহিদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। যদিও অর্থনৈতিক ঝুঁকির ক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, সরকারগুলো সামগ্রিক প্রভাব প্রশমিত করার জন্য ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত বৃদ্ধির ঝুঁকি এবং হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থার সময়কালের ওপর নির্ভর করছে সঙ্কট আরো কতটা জটিল হবে। দি ডিপ্লোম্যাট, কাউন্সিল অন ফরেইন রিলেশনের মতো আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণী সাময়িকীগুলো বলছে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ৮০ শতাংশেরও বেশি তেল এবং এলএনজি এশিয়ার দেশগুলোতে রফতানি হয়।

বাংলাদেশ, ফিলিপাইন এবং জাপানের মতো দেশগুলোর তেলের চাহিদার পুরোটাই আমদানি নির্ভর, অন্য দিকে পাকিস্তান বা ভারত ওই অঞ্চল থেকে ৮০ শতাংশেরও বেশি গ্যাস আমদানি করে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ঘাটতির কারণে এসব দেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চীন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়া, বেশির ভাগ দেশের জন্য কৌশলগত তেলের মজুদ প্রকৃতপক্ষে এক বা দুই মাসের আমদানির জন্য যথেষ্ট এবং এলএনজির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো খারাপ।

বাংলাদেশে জালানি তেলের কোনো বাফার স্টক নেই এবং তেলের মজুদ মাত্র কয়েক দিনে ঠেকেছে। এসব দেশের সরকারগুলো জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলা এবং স্বল্পমেয়াদে সামাজিক-অর্থনৈতিক ধাক্কা প্রশমিত করতে জ্বালানি রেশনিং, কর্মঘণ্টা এবং উৎপাদন কার্যক্রম হ্রাস করছে। বেশ কয়েকটি দেশ গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কয়লার ব্যবহার বাড়াচ্ছে অথবা রাশিয়া থেকে তেল কিনছে (যেমন ভিয়েতনাম)। মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে, জ্বালানি খাতে বর্ধিত ভর্তুকি (থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া) এবং নির্ধারিত সর্বোচ্চ মূল্য (চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ইত্যাদি)-র মতো প্রচলিত স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নিয়েছে।

উপসাগরীয় সঙ্ঘাতের কারণে দেশ ভেদে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি ভিন্ন। দক্ষিণ এশিয়া সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বিশেষ করে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশ। কারণ তারা বর্তমানে আইএমএফ-এর একটি কর্মসূচির অধীনে রয়েছে। এই দেশগুলোর এক দিকে যেমন উপসাগরীয় অঞ্চলের সাথে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি, তেমনি অন্য দিকে তাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তিও বেশ ভঙ্গুর এবং তারল্যের স্তরও দুর্বল। রফতানি আয় কমিয়ে এবং জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়িয়ে ইরান যুদ্ধ তাদের চলতি হিসাবের ঘাটতি আরো বাড়াবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর আঘাত হানবে। ফিলিপাইনে, সম্ভাব্য বিশৃঙ্খল জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে প্রেসিডেন্ট মার্কোস অভ্যন্তরীণ তেল ব্যবহারের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। ভারতের বিভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থা (তেলের মজুদ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লার ব্যাপক ব্যবহার এবং বিশাল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ) রয়েছে এবং দেশটি রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়িয়েছে। রেমিট্যান্স কমে যাওয়া, রুপির অবমূল্যায়ন (যা এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন) এবং প্রত্যাশিত মুদ্রাস্ফীতির চাপের কারণে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবনতি ঘটছে।

বছরের পর বছর ধরে ভারতে আত্মনির্ভরশীলতা ও বাজার বৈচিত্র্যকরণ বৃদ্ধি, বিশ্বের বৃহত্তম কৌশলগত তেলের মজুদ গড়ে তোলা, অর্থনীতির দ্রুত বিদ্যুতায়ন এবং পর্যাপ্ত বৈদেশিক তারল্য সংরক্ষণের মাধ্যমে এই ধরনের বাহ্যিক ধাক্কা মোকাবেলার জন্য সক্রিয়ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আরো বেশি কয়লা ব্যবহারের ক্ষমতা এবং রাশিয়ার সাথে জ্বালানি সম্পর্ক আরো জোরদার করাও জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় সহায়তা করে। এর পাশাপাশি, চীন তার ইরানি তেল আমদানির একটি বড় অংশ পেতে থাকে (২০২৫ সালে ইরান চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী)। এই পরিস্থিতিতে, চীনা কোম্পানিগুলো দেখবে যে জ্বালানির উচ্চ ব্যয়ের কারণে তাদের কম মুনাফার হার আরো কমে যাচ্ছে এবং উপসাগরীয়, এশীয় ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে তাদের রফতানির চাহিদা কমে যাওয়ায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা জিডিপি প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।

এ দিকে স্বল্প মেয়াদে, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি রেশনিং, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, হ্রাসপ্রাপ্ত বা স্থগিত উৎপাদন, স্থিতিশীল বা বর্ধিত সুদের হার এবং প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির মন্থরতার কারণে ইরান যুদ্ধ এশিয়ার ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরো খারাপ করে তুলবে। এর ফলে ইতোমধ্যে অনেক কোম্পানির রেটিং অবনমন ঘটেছে। যদি এই সঙ্ঘাত বর্তমান যুদ্ধবিরতির পরেও চলতে থাকে, তবে জ্বালানি মূল্যস্ফীতির ধাক্কা ছড়িয়ে পড়বে এবং তা ভোগের উপর ক্রমবর্ধমানভাবে প্রভাব ফেলবে, যা একটি খাদ্য সঙ্কট এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, জ্বালানি ও সারের উচ্চ মূল্য আগামী ফসলের উপর মারাত্মক আঘাত হানতে পারে, বিশেষ করে আগামী বর্ষাকালে উপসাগরীয় অঞ্চলের উপর নির্ভরশীল দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে। বর্ধিত জ্বালানি ও খাদ্য ভর্তুকির মাধ্যমে এই সঙ্কট লাঘব করার ক্ষেত্রে সরকারগুলোর সক্ষমতা সীমিত আর্থিক সংস্থানের কারণে সীমাবদ্ধ থাকবে।

দীর্ঘমেয়াদে, এশীয় সরকারগুলো সাম্প্রতিক জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির উপর অস্থিতিশীল নির্ভরতা এবং সামুদ্রিকে সঙ্কীর্ণ পথের প্রতি দুর্বলতা কমাতে পারমাণবিক শক্তি (যেখানে সম্ভব ও সাশ্রয়ী), নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আরো বৈচিত্র্যময় সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে তাদের জ্বালানি মিশ্রণকে কাঠামোগতভাবে আরো স্থিতিস্থাপক করে তোলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ ইরানে যুদ্ধের কারণে এশিয়াজুড়ে কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, প্রধান বিমান সংস্থাগুলো তাদের রুট কমিয়ে দিচ্ছে এবং রান্নার গ্যাস কেনার জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াচ্ছে। এশিয়া-প্যাসিফিকের বেশির ভাগ অঞ্চলের জন্য এটিই ফসল রোপণের প্রধান মৌসুম। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সার সরবরাহে বিলম্ব বছরের পরবর্তী সময়ে খাদ্য নিরাপত্তা সঙ্কট তৈরি করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি যথেষ্ট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সঙ্কট এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিটি প্রধান শেয়ারবাজারের পতন ঘটেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা পূর্বাভাস দিয়েছেন যে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিভার মতে, জ্বালানির দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি যা এক বছর ধরে স্থায়ী হয়, তা বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি ৪০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে দেবে এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করে দেবে। আর তরুণ জনগোষ্ঠী, এআই ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ এবং দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে আগামী দশকে বেশির ভাগ এশীয় অর্থনীতির জ্বালানির চাহিদা আকাশচুম্বী হবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ দেশের কাছে মাত্র ২০ থেকে ৫০ দিন চলার মতো তেল ও এলএনজির মজুদ রয়েছে। চীন ইতোমধ্যেই আগামী দশকে ২৩টি নতুন পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে এবং এখন সেই পরিকল্পনাগুলোকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনও পারমাণবিক উন্নয়নের গতি বাড়াচ্ছে। তবে, এই ধরনের সিদ্ধান্তের সাথে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি জড়িত রয়েছে, যেমন দক্ষিণ কোরিয়ার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে।

বায়ুর গুণমান এবং স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব থাকা সত্ত্বেও, এশীয় দেশগুলোও কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় গ্রহণ করছে। কারণ অনেকেরই এই দূষিত জ্বালানির অভ্যন্তরীণ মজুদ রয়েছে এবং কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা প্রায়ই তুলনামূলকভাবে সস্তা। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং পাকিস্তান সবাই নতুন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে সময় লাগে, এমনকি ধনী দেশগুলোর জন্যও এবং মস্কোর ইউক্রেন আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া থেকে ইউরোপের আমদানি ধীরে ধীরে কমানোর প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। দুর্ভাগ্যবশত, যত দিন হরমুজ প্রণালী প্রায় পুরোপুরি বন্ধ থাকবে, তত দিন এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং তাদের জনগণকে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।