ভোট শান্তিপূর্ণ মনে হলেও কাঠামোগত ত্রুটি ছিল : ইডব্লিউএ

Printed Edition
back-5
জাতীয় প্রেস ক্লাবে ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্সের সংবাদ সম্মেলন : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আপাতদৃষ্টিতে শান্তিপূর্ণ মনে হলেও কাঠামোগত নানা ত্রুটি ও অনিয়ম ছিল বলে মতামত দিয়েছে ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্স (ইডব্লিউএ)। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ইডব্লিউর মতামত তুলে ধরেন সংস্থার প্রধান মো: শরিফুল আলম। তিনি বলেন, ভোট আপাত শান্তিপূর্ণ মনে হলেও কাঠামোগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। কিছু আমলা, পুলিশ, আনসার সদস্য ও প্রিজাইডিং কর্মকর্তা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিষয়গুলো নিয়ে গভীর অনুসন্ধান দরকার।

সংবাদ সম্মেলনে ‘নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি : একটি মূল্যায়ন’ শীর্ষক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগের একদিন এবং পরের দুই দিনের সহিংসতার দুই শতাধিক চিত্র তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার উপস্থিতি সন্তোষজনক ছিল। তবে ভোট গণনায় দীর্ঘসূত্রতা, ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব, রেজাল্ট শিটে ঘষামাজার প্রমাণ এবং ভোটার সংখ্যার সাথে ঘোষিত ফলাফলের অসঙ্গতি জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনা নির্বাচন ব্যবস্থায় ত্রুটি ও অনিয়মের ইঙ্গিত বহন করে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

শারফুল আলম জানান, ভোটের পরবর্তী দুই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে জামায়াতের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা, মারধর, বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ইডব্লিউএর পর্যবেক্ষণ মতে, শুধু ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু হলেই নির্বাচন সুষ্ঠু বলা যায় না। সুষ্ঠুভাবে ভোট গণনাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে ভোটের আগে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদলের বিষয়গুলো নিয়ে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন সংস্থার প্রধান শরিফুল আলম।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন ইডব্লিউএর জেনারেল সেক্রেটারি খোন্দকার জাকারিয়া আহমদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট হেমায়েত হোসেন এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান রফিকুজ্জামান রোমান।

এতে বলা হয়, নির্বাচনের পূর্বে জনপ্রশাসন সচিব বদলানো, বেছে বেছে বিভাগীয় কমিশনার বদলানো বা নিয়োগদান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এপিডি অনুবিভাগে দীর্ঘ দিন পদায়ন না থাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারীর পদত্যাগ, নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ব্যক্তিদেরকে নিয়োগ এবং কমিশন সচিব পদে রাজনৈতিক পছন্দের ভিত্তিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, নির্বাচন কমিশনে কিছু কর্মকর্তাকে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া আবার কাউকে কাউকে দায়িত্ব না দেয়া বা নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে কমিশন থেকে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে বদলি করা ইত্যাদি একটি বিশেষ ধরনের নির্বাচনী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়।

সংবাদ সম্মেলন বলা হয়, আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পদে (বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মুখ্য সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন সচিবের মতো সংবেদনশীল পদে) চুক্তিভিত্তিক নিয়োগদান অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অবিমৃশ্যকারী পদক্ষেপ ছিল। এর ফলে নির্বাচন কমিশন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সুস্পষ্টভাবে রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তাদের পদায়ন হয়েছে এবং এসব কর্মকর্তা স্পষ্ট বায়াস হয়ে কাজ করেছেন। আমরা মনে করি এ বিষয়ে নাগরিক সমাজের পক্ষ হতে একটি স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

ইডব্লিউএ ভাষ্য, রাজনৈতিক পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়োগের ফলে যেসব বিষয়ে তারা সুপারিশ করেছিল বিশেষ করে বডি ওর্ন ক্যামেরা, সিসিটিভি ইত্যাদি, সেগুলোর আপাতত ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলোর প্রকৃত ব্যবহার নিশ্চিতে নির্বাচনী প্রশাসনিক কাঠামোর কোনো দৃঢ়অঙ্গীকার ছিল না। সিসিটিভি বিভিন্ন কেন্দ্রে বিক্ষিপ্তভাবে ছিল। যে উদ্দেশ্যে সিসিটিভির জন্য দাবি করা হয়েছিল সে উদ্দেশ্য অর্জনে কোনো আন্তরিক পদক্ষেপ ছিল না।

নির্বাচনে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ও কার্যক্রমে ক্ষিপ্রতা থাকলেও পুলিশের ভূমিকা খুব প্যাসিভ ছিল। নির্বাচনের আগে অন্য কেউ পদত্যাগ না করলেও শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারীর পদত্যাগ হয়তো পুলিশের কম নিষ্ক্রিয়তার একটা ব্যাখ্যা দান করে। এ ছাড়া নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা।

নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা উপেক্ষিত ছিল।