বিসিবি নির্বাচন তদন্তে নতুন মোড়
Printed Edition
ক্রীড়া প্রতিবেদক
‘নির্বাচনে তো কোনো প্রতিপক্ষই ছিল না। এখানে অনিয়মের সম্ভাবনা কীভাবে দেখছেন? এখানে ভোটার ছিল মনে করেন ৭৬ জনের মতো। তার মধ্যে ৪২ টা ভোট কাস্ট হয়েছে, যেখানে আমি সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলাম। এখানে ৩৪ টা ভোট এরই মধ্যে নেই। যেহেতু প্রতিপক্ষই নেই, এখানে অনিয়মের সম্ভাবনা খুব কম। নাই বলা চলে। আমার মনে হয় যেটা ভোটাভুটি হয়েছে, ঠিকই হয়েছে।’ তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমে এভাবেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বিসিবি সহসভাপতি ফারুক আহমেদ। এর আগে গত শনিবার বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হয়েছিলেন।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি কার্যত পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নিজের আস্থা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তদন্তের গতিপথেও এটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ, যেখানে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার এমন দৃঢ় অবস্থান বিষয়টিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত কমিটি তার বক্তব্যকে কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) ঘিরে গত বছরের নির্বাচন পরবর্তী বিতর্ক এখনো পুরোপুরি থামেনি। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ওঠা অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল ও তার সমমনা সংগঠকদের একটি অংশ বর্তমান বোর্ডের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। যারা ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে।
২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নির্বাচনের আগেই একাধিক পক্ষ সেটি বর্জন করে। সেই নির্বাচনে আমিনুল ইসলাম বুলবুল সভাপতি এবং ফারুক আহমেদ সহসভাপতি নির্বাচিত হন। তবে নির্বাচনকে ‘বিতর্কিত’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠতে থাকে, যা পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক তদন্তের দিকে গড়ায়।
অস্ট্রেলিয়া সফর শেষে দেশে ফিরে বিসিবি কার্যালয়ে নিয়মিত অফিস করছেন সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। তবে তদন্ত প্রসঙ্গে তার সঙ্গে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন ফারুক। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এসেই শুনলাম যে তিনি অফিস করছেন। অবশ্যই আমি তাকে কল দেব। আমার সঙ্গে কথা হবে।’
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গত ১১ মার্চ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। এই কমিটি অনিয়ম, কারসাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যাচাই করছে। এরই মধ্যে বিসিবির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন পদত্যাগ করেছেন এবং নির্বাচন আরও স্বচ্ছ হতে পারত- এমন মতও এসেছে কিছু মহল থেকে।
তবে এসব মন্তব্যের সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফারুক আহমেদ। তিনি মনে করেন, নির্বাচন নিয়ে আপত্তি থাকলে তা আগে জানানো উচিত ছিল। একই সঙ্গে বোর্ডের ভেতরের মতপার্থক্যকে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি। ফারুক বলেন, ‘আপনি দুইটা প্রশ্ন করেছেন। দুইজন পরিচালক পদত্যাগের পর বলেছেন যে নির্বাচন আরও স্বচ্ছ হতে পারত। এটা পদত্যাগের আগে বলতে পারলে ভালো হতো। আর হাত খুলে, মন খুলে কাজ করতে পারছেন না। এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনি একই প্রশ্ন দুই পরিচালককে করলে এক রকম উত্তর আসবে না। এটা একটা দেখারও ব্যাপার থাকবে। শাহনিয়ানের মতো তরুণের কাজ করার আগ্রহ বেশি। সে চায় বাংলাদেশের ক্রিকেটে ভালো কিছু করতে। এই নির্বাচনের পরে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। পুরো ব্যাপারটা স্মুথ ছিল না। আরেকটু ধৈর্য থাকা উচিত। আপনার হাতে চার বছর থাকলে উন্নতির অনেক সুযোগ থাকবে।’
তদন্ত কমিটির সঙ্গে আলোচনার অভিজ্ঞতা নিয়েও ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন বিসিবি সহসভাপতি। তিনি জানান, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ এবং তিনি কোনো তথ্য গোপন করেননি, ‘দেখুন, আমার কাছে খুবই ফ্রেন্ডলি মনে হয়েছে। তাদের সবারই দেখলাম ক্রিকেট নিয়ে অনেক আগ্রহ আছে। আমাদের একজন মাননীয় বিচারক ছিলেন। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আইনজীবী ও একজন সাংবাদিক ছিলেন, যিনি দীর্ঘদিন খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত। ক্রিকেট সংক্রান্ত আমার তো প্রায় ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা। তারা জানতে চেয়েছে ক্রিকেট বোর্ডের ব্যাপারে। আমার মনে হয় যে কাগজগুলো তাদের কাছে এসেছে, সেই কাগজগুলো নিয়েই কথা বলেছে আমার সঙ্গে। আমি যা জানি, যা সত্যি সবই বলেছি।’
বোর্ডের চেয়ে ক্লাবগুলোর দায় বেশি
ক্লাব ক্রিকেটে দেশের শীর্ষ টুর্নামেন্ট ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ যথাসময়ে শুরু হওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। বোর্ডের সবশেষ নির্বাচন কেন্দ্রিক দ্বন্দ্বে ক্লাবগুলো লিগ বর্জনের পথে হাঁটায় বিপাকে পড়েছেন ক্রিকেটাররা। মাঠে ক্রিকেট ফেরাতে এরই মধ্যে সিসিডিএম ও বিসিবিকে চিঠি দিয়েছে কোয়াব। তবে লিগ না হওয়ার পেছনে বোর্ডের চেয়ে ক্লাবগুলোর দায়ই বেশি দেখছেন বিসিবি সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদ।
বর্তমান অচলাবস্থা নিয়ে ফারুক বলেন, ‘ক্রিকেট বোর্ডের কাজ হলো সহযোগিতা করা, যেটা গত বছর থেকে এ বছরও প্রায় দ্বিগুণ না হলেও ৬০-৭০ শতাংশ করা হয়েছে। ক্লাবগুলো আসলে এ পর্যন্ত যা করেছে তাদের কুর্নিশ জানাই। বাংলাদেশ ক্রিকেট আজকে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, ক্লাব ক্রিকেট তার অন্যতম একটি শক্তিশালী দিক। আমরা উঠেছি কিন্তু ক্লাব ক্রিকেট থেকে। কিন্তু যতটুকু সাহায্য সহযোগিতা প্রতিবার কিন্তু বাড়ছে। অথচ এখন এই যে ধারাটা চালু হয়ে গেল, এখন যারা খেলতে চাচ্ছেন না তারা যদি কখনো ক্ষমতায় আসেন আর যদি একই পদ্ধতিতে চলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট খুব বেশি এগোতে পারবে না।’
ক্লাবগুলোকে মাঠে ফেরার আহ্বান জানিয়ে তিনি যোগ কেেরন, ‘আমরা আহ্বান করব, দলবদল হবে, তারপর অংশগ্রহণ করবে কি করবে না সেটা ক্লাবগুলোর দায়িত্ব।’