রেলের ডিজি ও তার স্বজনের নামে চলছে তদবির বাণিজ্য

এখনো আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রেলের নানা খাত

রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেন ও তার অধীনস্থ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামে সারা দেশে দেদার চলছে টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্য। এগুলো ছাড়াও নানা খাতে তদবির বাণিজ্য করে অবৈধভাবে সুবিধা নিচ্ছে প্রতারক চক্র। ইতোমধ্যে এই চক্রটি তদবির বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
money-3

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেন ও তার অধীনস্থ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামে সারা দেশে দেদার চলছে টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্য। এগুলো ছাড়াও নানা খাতে তদবির বাণিজ্য করে অবৈধভাবে সুবিধা নিচ্ছে প্রতারক চক্র। ইতোমধ্যে এই চক্রটি তদবির বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিষয়টি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পরই সুবিধাবাদী চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য অনুরোধ জানানো হয়। এরপরও কেউ যদি এই চক্রের সাথে অপকর্মে জড়িয়ে তদবির বাণিজ্য চালিয়ে যায় তাহলে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সেই দায় নেবে না। এমন নির্দেশনা জারির পর কেটে গেছে এক মাসেরও বেশি সময়। কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বা রেলপথ মন্ত্রণালয় ওই তদবিরবাজদের কারো টিকিটিও আজ পর্যন্ত ছুতে পারেনি।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর রেলভবন, ঢাকার উপপরিচালক (প্রশাসন) রুবিনা পারভীন স্বাক্ষরিত ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার রেফারেন্সে কোনো প্রকার সুযোগ সুবিধা প্রদান না করা প্রসঙ্গের বিষয়ে রেলওয়ের সব কর্মকর্তার (জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়) কাছে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অফিসের মোবাইল নম্বর ক্লোন/হ্যাক করে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা দাবি করা হচ্ছে। রেলওয়ের মহাপরিচালকের আত্মীয় পরিচয় ও রেফারেন্স ব্যবহার করে টেন্ডার পাইয়ে দেয়া, বদলির ভীতি প্রদর্শন, চাকরির প্রলোভন বা বিভিন্ন প্রকারের তদবির করে আর্থিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মকর্তা, ঠিকাদার কর্তৃক একে অন্যের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের নাম জড়িয়ে বিভিন্ন অভিযোগ, কুৎসা রটনা এবং সংবাদমাধ্যমে বানোয়াট সংবাদ পরিবেশন করছেন। এতে রেলওয়ের পরিবেশ ক্ষুণœ ও কাজের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারী, ঠিকাদার ও ব্যক্তি বিশেষকে এ ধরনের প্রতারণামূলক কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য এবং সতর্কতা অবলম্বনের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। অন্যথায় এর দায় দায়িত্ব রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বহন করবে না বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল। চিঠির অনুলিপি উপদেষ্টার একান্ত সচিব, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর একান্ত সচিব ও মহাপরিচালকের একান্ত সচিবের কাছে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনার প্রায় দেড় মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত কারা বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক এবং তার আত্মীয়স্বজন ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে তদবির বাণিজ্য করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে সেই চক্রের কারো সন্ধান বের করতে পারেননি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। যদিও সাধারণ কর্মচারীরা বলছেন যদি এমনটি হয়ে থাকে তাহলে তাদেরকে দ্রুত চিহ্নিত করা দরকার। একই সাথে এই চক্রকে যেসব কর্মকর্তারা সহযোগিতা করছেন তাদেরকে রেলভবন থেকে সরিয়ে দেয়া উচিত বলেও মনে করছেন রেলওয়ের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দোসর হিসেবে পরিচিত এমন অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দিয়েই রেলভবন পরিচালিত হচ্ছে। আর যেসব কর্মকর্তা আওয়ামী বিরোধী ভূমিকা পালন করেছিলেন, পোস্টিং প্রশোমন থেকে বঞ্চিত ছিলেন তাদেরকে কৌশলে রেলভবন থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এই সুযোগে টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে নানা খাতে নীরবভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন অনিয়ম আর দুর্নীতি। ওই চক্রটির তথ্য যেসব গোয়েন্দারা অনুসন্ধান করে খুঁজে বের করতে মাঠে আছেন তাদেরকেও তারা ‘নিয়ন্ত্রণে’ নিয়ে রেখেছেন। যার কারণে দুর্নীতির চিত্র চাপা পড়ে আছে। বিনিময়ে তাদেরকে দেয়া হচ্ছে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা। এমনই অভিযোগ করে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, রেলভবনে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের সরাতে দ্রুত শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুবা এই ফ্যাসিস্টরা নানা কৌশলে তাদের আখের গুছিয়ে নেবে। তখন এর দায় বর্তাবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। যদিও রেলপথ মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেলভবন থেকে অনিয়ম দুর্নীতি নির্মুলের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তিনি একা আর কত সামাল দেবেন এই শক্তিশালী চক্রের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের দাবি এখনো রেলভবনে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তারাই আর্থিকভাবে অনেক শক্তিশালী এবং যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় সক্রিয়।