একটু কষ্ট তো লাগেই

বাংলাদেশ ছাড়া টি-২০ বিশ্বকাপ

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

১৯৯৯ থেকে সব ফরম্যাট মিলিয়ে ১৬টি বিশ্বকাপ খেলেছে বাংলাদেশ। এবার বিরতি! সত্যিই অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। বিশ্বকাপ মানেই ছিল বাংলাদেশের অংশগ্রহণ- এটিই গত দুই দশকের চেনা দৃশ্য। গতকাল সেই দৃশ্যটাই বদলে গেছে। টি-২০ বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে, কিন্তু গ্যালারিতে নেই লাল-সবুজের পতাকার ঢেউ, মাঠে নেই বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের লড়াই। ২৬ বছরের অভ্যাস ভেঙে এই প্রথম বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে টাইগারদের ছাড়াই, যা ক্রিকেটীয় দিক থেকে যেমন অস্বাভাবিক, তেমনি আবেগের জায়গায় ভীষণ ভারী, ভীষণ কষ্টের।

হয়তো নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এগোবে টুর্নামেন্ট। চ্যাম্পিয়নও পাওয়া যাবে। কিন্তু এই বিশ্বকাপ ক্রিকেটীয় রোমাঞ্চের জন্য নয়, স্মরণে থাকবে অন্য কারণে। কারণ এটি মনে করিয়ে দিচ্ছে, ক্রিকেট মাঠে খেললেও তার ভাগ্য অনেক সময় নির্ধারিত হয় মাঠের বাইরের সিদ্ধান্তে। আর সেই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে রইলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা।

বিশ্ব ক্রিকেটের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের দর্শক ও বাজারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ- এই তিন দেশের অংশগ্রহণই বিশ্বকাপকে পূর্ণতা দেয়। সেখানে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, এই কাঠামো কতটা স্পর্শকাতর। একটি দেশের বাইরে থাকা পুরো টুর্নামেন্টের ভারসাম্য বদলে দিতে পারে- এবারের বিশ্বকাপ তার প্রমাণ।

এই টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই আলোচনা সরে গেছে ব্যাট-বলের লড়াই। কে কত রান করবে বা কোন দল শিরোপার দাবিদার- এসব প্রশ্নকে ছাপিয়ে গেছে নিরাপত্তা, রাজনীতি ও কূটনৈতিক সমীকরণ। ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আবারো বিশ্বকাপকে প্রভাবিত করছে, তবে এবার সেই টানাপড়েনে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ।

বাছাইপর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়ার পরও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত ছিল না। ভারতে খেলতে গিয়ে খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও সমর্থকদের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ ধীরে ধীরে বড় সঙ্কটে রূপ নেয়। আইসিসির সাথে কয়েক দফা আলোচনা হলেও কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি। শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে বিরল। নিয়মিত অংশগ্রহণকারী একটি দলকে বাইরে রেখে টুর্নামেন্ট শুরু করা।

এ সিদ্ধান্ত শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, পুরো বিশ্বকাপের জন্যই বড় ধাক্কা। বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ড সুযোগ দেয়া হলেও বাস্তবতা হলো, আবেগ ও বাণিজ্যিক প্রভাবের জায়গায় দুই দেশের তুলনা চলে না। বাংলাদেশের ম্যাচ মানেই দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল দর্শকগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা, বিজ্ঞাপনদাতাদের আগ্রহ এবং সম্প্রচারকারী সংস্থার বাড়তি আয়। সেই জায়গায় তৈরি হওয়া শূন্যতা টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ইস্যুর প্রভাব গিয়ে ঠেকেছে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচেও। বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাকিস্তান ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার ঘোষণা দিলে পুরো বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক ভিত্তিই কেঁপে ওঠে। কারণ এ একটি ম্যাচের ওপর নির্ভর করে বিশ্বকাপের বড় একটি অংশের বাণিজ্যিক হিসাব। ম্যাচটি না হলে ক্ষতির অঙ্ক যেমন বিশাল, তেমনি টুর্নামেন্টের আকর্ষণও লাগবে বড় ধাক্কা।

বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলো ও আইসিসি এখন এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি। এক দিকে মাঠে খেলা চালু রাখতে হবে, অন্য দিকে মাঠের বাইরের সঙ্কট সামলাতে হচ্ছে। সম্প্রচার সংস্থা, স্পন্সর, পর্যটন খাত থেকে শুরু করে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও এই অনিশ্চয়তার প্রভাব অনুভব করছে। যে বিশ্বকাপ ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা ছিল, সেখানে অনিশ্চয়তায় প্রশ্নবিদ্ধ।

টি-২০ বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু স্বাভাবিক উন্মাদনার বদলে একধরনের সঙ্কট ব্যবস্থাপনার ভেতর দিয়ে। উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল পাকিস্তান ও নেদারল্যান্ডস, আর সেই ম্যাচেই দর্শকদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মাঠে ঢোকার সুযোগ দিয়েছে টুর্নামেন্টের সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কা।