কর্মশালায় তথ্য উপদেষ্টা

পরিবর্তনের জন্য দেশবাসীকে গণভোটে অংশ নেয়ার আহ্বান

Printed Edition
back 4
সিলেটে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কর্মশালায় বক্তব্য রাখছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : নয়া দিগন্ত

সিলেট ব্যুরো

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট প্রতিষ্ঠিত হবে।

গতকাল বিকেলে আসন্ন গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সিলেটে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত নির্বাচন সংক্রান্ত প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সিলেট বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এ কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা। এতে সভাপতিত্ব করেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো: রেজা-উন-নবী।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্ম যে সংস্কার ও পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগ করেছে সেটিকে বাস্তবায়নের জন্যই গণভোট। জনগণ নির্ভীক চিত্তে লড়াই করেছে বলেই স্বৈরাচারের পতন ঘটেছে। এ সাহসী মনোভাবকে ধারণ করেই ভোটকেন্দ্রে নিজের নির্ভয়ে নিজেদের ভোটাধিকার বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের সিস্টেমে পরিবর্তন না হলে দেশ পরিবর্তন হবে না। দেশ গড়ার জন্য সিস্টেম পরিবর্তনের হাতিয়ারই হচ্ছে গণভোট। গণভোট সুযোগ এনে দিচ্ছে দেশে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন এনে তার স্থায়ী রূপ দেয়া। কাজেই গণভোটের পক্ষে-বিপক্ষে জেনে বুঝে জনমত গড়ে তুলতে হবে এবং ভোট দিতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্য সচিব বলেন, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, উৎসবমুখর ও অভাবনীয় নির্বাচন আয়োজনে সরকার বদ্ধপরিকর। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে প্রান্তিক নারী ভোটার, তরুণ ভোটার, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারসহ সবাইকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজন করা। জনগণকে দেশের হিস্যা বুঝে নিতে হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সর্বস্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত করাই প্রধান বিষয়। এবারের গণভোট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভিত্তি, জনগণের মতামতের ভিত্তি। এর মাধ্যমে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণভোটের মাধ্যমে দেশ ন্যায়ের পথে পরিচালিত হবে কি না- সেটির প্রতিফলন ঘটবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে সমন্বয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত এ কর্মশালায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দফতর ও সংস্থার কর্মকর্তারা, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা, কলেজের অধ্যক্ষ, এনজিও প্রতিনিধি, মসজিদের ইমাম, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায় ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।

লিডিং ইউনিভার্সিটির সমাবর্তনে সৈয়দা রিজওয়ানা

সিলেট ব্যুরো জানান, পরিবর্তনের জন্য দেশবাসীকে গণভোটে অংশ নেয়ার আহবান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেছেন, আগামী নির্বাচনে বুঝেশোনে প্রার্থী নির্বাচন করবেন, যাতে আগামী পাঁচ বছর পস্তাতে না হয়। আপনারা ভয় পাবেন না, সাহসের সাথে এগিয়ে যান। পতিত স্বৈরাচার দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। ভয় পাবেন না।

তথ্য উপদেষ্টা গতকাল বেলা ১টায় সিলেট শহরতলীর দক্ষিণ সুরমার রাগীবনগরে অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি লিডিং ইউনিভার্সিটির চতুর্থ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের জন্য কমিটেড, হাদির বিচারের জন্য কমিটেড। এ সরকারের আমলেই হাদির বিচার কাজ শেষ করা হবে। হাদি নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য স্বপ্ন দেখেনি, সে দেশের পরিবর্তনের জন্য স্বপ্ন দেখেছে। তাই শুধু নিজের জীবনের ফোকাস ঠিক করবেন না, সমাজের ফোকাসটা ঠিক করবেন। পড়াশোনা করে শুধু বাড়ি গাড়ির চিন্তা করবেন না। সমাজের জন্যও চিন্তা করবেন।

উপদেষ্টা বলেন, তরুণ প্রজন্ম দেশ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আপনারাই শিখিয়েছেন কিভাবে দেশ গড়তে হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আপনারা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। আপনারাই স্বপ্ন দেখিয়েছেন কিভাবে স্বৈরাচারমুক্ত দেশ গড়তে হয়।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আজকে অনেকেই হাদির বিচারের জন্য দাঁড়িয়েছেন, সে একটা দীপ্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছে। বৈষম্যহীন সমাজ গঠন না হলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ সফল হবে না। আপনাদের মাধ্যমেই মানবিক মূল্যবোধ বাংলাদেশ গঠন হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঐক্য গড়ে উঠেছিল মন্তব্য করে রিজওয়ানা হাসান বলেন, আমাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। তাহলে ফ্যাসিস্টরা সুযোগ পাবে না। অপপ্রচার চালিয়ে সবাইকে বিতর্কিত করতে চায় পতিত শক্তি। তিনি বলেন, আমাদেরকে সহনশীল হতে হবে। এতটা বছর আমরা একটা চর্চা করেছি, রাতারাতি পরিবর্তন হবে না, একটু সময় লাগবে।

রাজনৈতিক দলগুলোকে ইতিবাচক রাজনীতি করার আহ্বান জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে হবে। আপনারা ইতিবাচক রাজনীতি করলে বাংলাদেশে যে পরিবর্তন দেখতে চেয়েছি- সেই রকম বাংলাদেশ হবে।

তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, আপনার কাছ থেকে পরিবর্তন শুরু হোক। তাহলে সমাজটা বদলে যাবে। অভ্যাস পরিবর্তন নিজে থেকে শুরু করতে হবে, তাহলে সমাজ বদলাবে। আপনি নিজে অযথা হর্ন বাজাবেন না, নিজে থেকে শুরু করেন- দেখেন সমাজ বদলাবেই।

সৈয়দা রিজওয়ানা বলেন, হাওর বাংলাদেশের একমাত্র ইকোসিস্টেম। হাওরকে রক্ষা করতে হবে। হাওর ভরাট করে বিশ্ববিদ্যালয় করা যাবে না। যেটা সৃষ্টি করতে পারবেন না, সেটা ধ্বংস করার অধিকার নেই। আল্লাহর সৃষ্টি অক্ষুণœ রেখেই প্রতিষ্ঠান করবেন।

সমাবর্তন বক্তা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী জিন বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী বলেন, পৃথিবীর অবস্থা ভালো নয়। কুরআনে আছে, পৃথিবী নিয়ে তামাশা করো না। অথচ আমরা পৃথিবী নিয়ে ছিনিমিনি খেলছি। আমরা এক উত্তপ্ত পৃথিবী পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছি। এখানে গ্রিনহাউজ গ্যাসের কার্বন অনেক বেশি। আমি আশা করব, লিডিং ইউনিভার্সিটি পরিবার জলবায়ু নিয়ে কাজ করবে, পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে জোর দিতে হবে। টেকসই উন্নয়নে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা ও গবেষণায় জোর দিতে হবে। সেই মোতাবেক অ্যাকাডেমিক কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে আউটকাম বেইজড কারিকুলাম প্রণয়ন করা জরুরি। সিলেট চা শিল্পের জন্য বিখ্যাত। এখানে শতাধিক চা বাগান রয়েছে। তাই এসব চা শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের চাহিদা মোতাবেক দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে হবে।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে লিডিং ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট শিল্পপতি ড. সৈয়দ রাগীব আলী বলেন, জনসংখ্যকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমাদেরকে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে জোর দিতে হবে। লিডিং ইউনিভার্সিটি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্বাগত বক্তব্যে লিডিং ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ তাজ উদ্দিন বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলায় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। আর সেই দক্ষ ও যোগ্য জনশক্তি গড়ে তুলতে কাজ করছে লিডিং ইউনিভার্সিটি। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে কারিকুলাম প্রণয়ন করেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. বশির আহমেদ ভূঁইয়া, আধুনিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর কামরুল আলম, কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. রেজাউল করিম প্রমুখ।

চতুর্থ সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টি বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ ৬ হাজার ১৯৩ জন গ্র্যাজুয়েটকে ডিগ্রি প্রদান করা হয়। কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য ১৫ জন শিক্ষার্থীকে চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল, ভিসি গোল্ড মেডেল, ফাউন্ডার গোল্ড মেডেল এবং কো-ফাউন্ডার গোল্ড মেডেল প্রদান করা হয়। গ্র্যাজুয়েটদের হাতে সার্টিফিকেট তুলে দেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ অতিথিরা।

সিলেট প্রেস ক্লাবে দু’দিনের কর্মশালা উদ্বোধন

আগামী নির্বাচনে পরাজিত শক্তিকে শক্তি দিয়ে মোকাবেলা করার আহ্বান জানিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, পরাজিত শক্তি এখনো সক্রিয়। তবে তাদের শক্তি জুলাই আগস্টের অভ্যুত্থানকারী শক্তির চেয়ে অনেক কম।

গতকাল সকালে সিলেট প্রেস ক্লাবে নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতা বিষয়ক দু’দিনের সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) সিলেট প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে এ প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছে।

পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের সভাপতিত্বে এতে তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানাসহ মন্ত্রণালয়ের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা, সিলেটের জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম, সিলেট প্রেস ক্লাব সভাপতি মুকতাবিস উন নূর ও সিলেট মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খালেদ আহমদ বিশেষ অতিথি ছিলেন।

অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন সিলেট প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট ও ভোটে দেশের মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বর্তমান সরকার নির্বাচন আয়োজনে বদ্ধপরিকর। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলাও পরাজিত শক্তির কাজ। তিনি পরাজিত শক্তিকে মোকাবেলায় সাংবাদিকদের ইতিবাচক ও বস্তুনিষ্ট লেখনীর আহ্বান জানান।

কর্মশালায় সিলেটের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ৫০ জন সাংবাদিক অংশ নিচ্ছেন।