রাজনৈতিক প্রভাবে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে না : তাজুল ইসলাম
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছে। দলটির পূর্ব-ঘোষণা অনুযায়ী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন এবং আগামীকাল মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানের দিন ধার্য করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের হাত থেকে ক্ষমতার চাবিকাঠি এখন নির্বাচিত নতুন প্রতিনিধিদের হাতে হস্তান্তরের অপেক্ষায়। তবে এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথেই আবার জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। নতুন সরকারের অধীনে ট্রাইব্যুনাল কতটা স্বাধীন থাকবে এবং এর চলমান বিচারপ্রক্রিয়াগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে নানামুখী বিচার-বিশ্লেষণ।
এই অনিশ্চয়তা ও জল্পনার মধ্যে অত্যন্ত স্পষ্ট ও পেশাদার অবস্থান ব্যক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। সুপ্রিম কোর্টের এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও তার নেতৃত্বাধীন প্রসিকিউশন টিম গত দেড় বছরে ট্রাইব্যুনালকে একটি অত্যন্ত গতিশীল ও কার্যকরী পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে তিনি নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, প্রসিকিউশন টিম শুরু থেকেই সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করে আসছে। তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের পরিবারগুলোকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেয়া। আমি শুরু থেকেই সেই নৈতিক অবস্থান থেকে কাজ করেছি এবং যতদিন এই দায়িত্ব পালন করব, নিজের নীতিতে অটল থাকব।’ তিনি আরো যোগ করেন যে, গুম ও খুনের বিচার নিশ্চিত করা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণে অপরিহার্য এবং কোনো রাজনৈতিক টানাপড়েন এই বিচারিক ধারাবাহিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।
২০১০ সালে গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। বর্তমান ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে জুলাই আন্দোলনের আলোচিত বেশ কয়েকটি হাই-প্রোফাইল মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে সুপিরিয়র কমান্ড হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিচার, চানখাঁরপুল হত্যাযজ্ঞ এবং আশুলিয়ায় জুলাইযোদ্ধাদের লাশ পোড়ানোর মামলার রায় হয়েছে। গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম জানিয়েছেন, রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করার মামলার রায় আগামী ৪ মার্চ প্রকাশ করা হবে। এ ছাড়া শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার বিচারিক কাজও ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, যার রায় যেকোনো দিন ঘোষণা হতে পারে।
এই ট্রাইব্যুনালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের গুম এবং জুলাই বিপ্লবের হত্যাকাণ্ডে সাবেক ও বর্তমান ২৫ জন সেনাকর্মকর্তাসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করা। পাশাপাশি শতাধিক গুম ও খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক সেনাকর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধেও বিচার শুরু হয়েছে। শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে গণহত্যাসহ বহু চাঞ্চল্যকর মামলা এখন এই আদালতের টেবিলে। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই মুহূর্তে প্রশ্ন উঠেছে ট্রাইব্যুনালের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব ও জনবল কাঠামো নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের সময় প্রায়ই বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা পরিবর্তনের শিকার হয়। আইসিটি কি বর্তমান কাঠামোতেই চলবে নাকি নতুন সরকার কোনো বড় ধরনের আইনি সংস্কার আনবে তা নিয়ে জল্পনা চলছে। বিশেষ করে ট্রাইব্যুনালের নেতৃত্বে বা প্রসিকিউশন টিমে পরিবর্তনের সম্ভাবনা মামলার গতি ও নিরপেক্ষতাকে প্রভাবিত করতে পারে বলে অনেক ভুক্তভোগী পরিবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার শাইখ মাহদী অবশ্য মনে করেন, এই রাজনৈতিক পরিবর্তন বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা হওয়া উচিত নয়। তার মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ দলই জুলাই আন্দোলনের সময় পরস্পরের সহযোদ্ধা ছিল। জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ গত ১৫ বছরের অপরাধের বিচারে তারা সবাই রাজপথে ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং দলগুলোর বহু নেতাকর্মী সরাসরি ভিকটিম হিসেবে অভিযোগ করেছেন। সুতরাং, নতুন সরকার এই বিচারপ্রক্রিয়া আরো নবোদ্যমে এগিয়ে নেবে বলেই তিনি আশাবাদী। অন্যদিকে, ট্রাইব্যুনালের একজন জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর নাম প্রকাশ না করার শর্তে কিছুটা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ভুক্তভোগীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে যে রাজনৈতিক রদবদলে ট্রাইব্যুনাল অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। সাক্ষীরা বারবার আদালতে ন্যায়বিচারের আকুতি জানাচ্ছেন, তাই সামনের দিনগুলোতে নেতৃত্বের বড় কোনো পরিবর্তন বিচারিক নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।
বাংলাদেশ জাতীয় আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহ মো: খসরুজ্জামান এই জটিল পরিস্থিতিতে বলেন, অতীতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামরিক বাহিনীর গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সংস্কৃতি দেখা গেছে। ট্রাইব্যুনালের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে নতুন সরকারের নির্মোহ অবস্থান ও পেশাদারিত্বের ওপর। নির্বাচিত সরকার যদি বিশেষ কোনো পক্ষকে রক্ষা করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে, তবেই এই প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সুরক্ষিত হবে। দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীর পর্যবেক্ষণে রয়েছে যে, নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের পর ট্রাইব্যুনালের এই ঐতিহাসিক বিচারিক ধারাবাহিকতা কোন পথে ধাবিত হয়।