নিজস্ব কবরস্থান চান মান্দা সম্প্রদায়ের জেলেরা
Printed Edition
রফিকুল হায়দার ফরহাদ চর মোন্তাজ, পটুয়াখালী থেকে ফিরে
দেখতে একেক জন সুঠাম দেহের অধিকারী। কেউ কারো চেয়ে কম নন। তবে লেখাপড়ার কথা বললেই তাদের উত্তর, কখনই বই খাতা হাতে নেয়া হয়নি। সেই ছোট বেলা থেকে বাপ দাদাদের সাথে সাগরে মাছ ধরেছেন। আর কুলে এসে বিক্রি করেছেন। আজও তারা সেই মাছ ধরার পেশায়। তারা পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী ইউনিয়নের চর মোন্তাজের মান্দা সম্প্রদায়। মানে সাগরের যাযাবর। নদীর উপকূলে নৌকার মধ্যেই তাদের জীবন। সেখানেই থাকেন। আর মাছ ধরার জন্য যান সাগরে। কেউ উপকূলের কাছাকাছি থাকেন। কেউ বা চলে যান এক দিনের ট্রলার চালানো পথে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের গভীরে। অবশ্য এখন এই মান্দা সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার আলো লেগেছে। আগে চর মোন্তাজের স্লুইজের খালে নৌকায় তাদের জন্য স্কুল ছিল। বিভিন্ন জেলে পল্লীতে গিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নৌকায় করে নিয়ে আসা হতো। এরপর স্লুইজের ঘাটে থাকা নৌকায় লেখাপড়া করত তারা। এখন অবশ্য নৌকার স্কুল বন্ধ। তবে শিক্ষার্থীদের অন্য স্কুলের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
এই স্কুলের মতো মান্দাদের জীবনেও পরিবর্তন এসেছে। নৌকার ঘর সংসারের বদলে তারা এখন ডাঙ্গায় বাড়িতে থাকছে। বিগত সরকারের আমলে তাদের জন্য বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর পাড়েই ঘর করে দেয়া হয়েছে। নদীর পাড়ে রঙিন টিনের চালওয়ালা বাড়িগুলো দেখতে দারুণ লাগে। চার পাশে ওয়াল ও ওপরে টিনের এই বাড়ি। প্রত্যেক পরিবারের জন্য দুই রুমের বাড়ি। একটি অংশে ২০টি পরিবার থাকে। অন্য অংশে আরো ২৫টি পরিবারের আবাস। এই বাড়ি পেয়ে তারা খুশি। তবে এখন পর্যন্ত নিজস্ব কোনো কবরস্থানের জায়গা পাননি তারা। তাই এই মান্দা সম্প্রদায়ের দাবি, সরকার যেন তাদের জন্য পৃথক একটি কবরস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়।
ছোটবেলা থেকেই সাগরে মাছ ধরেন মান্দা সম্প্রদায়ের মাঝি আবদুর রশীদ। ১৫ বার সাগরে ঝড়ের কবলে পড়েছেন। আল্লাহর রহমতে প্রাণে বেঁচেও এসেছেন। সুঠাম দেহের এই মাঝির সাথে আগেও দুই বার দেখা হয়েছিল। ২০২২ সালে প্রথম তার ট্রলারে করেই সোনার চর ও চর হেয়ারে গিয়েছিলাম। ট্রলার চালানোর পাশাপাশি আমাদের রান্না করে খাওয়ানোর দায়িত্বটা তিনিই পালন করেছিলেন। শীতকালে সুযোগ পেলে পর্যটকদের বিভিন্ন চর বা দ্বীপে ঘুরতে নিয়ে যান। আর মাছ ধরার মৌসুমে তার গন্তব্য গভীর সাগরে।
এবার দেখা হওয়া মাত্রই তার দাবি, তাদের কবরস্থানের জন্য সরকার যেন এক খণ্ড জমি দেন। আমি যেন এ নিয়ে একটু লেখালেখি করি। আগে যাদের লাশ সাগরে ভাসিয়ে দেয়া হতো এখন তাদের লাশ চর মোন্তাজের স্লুইজ গেটের কাছে বেড়িবাঁধ সংলগ্ন একটি গণকবরে দাফন করা হয়। তবে সেই এলাকা অনেক দূরে। এ ছাড়া ওই স্থান ময়লা আবর্জনায় ভরা। কুকুর-শিয়ালের উৎপাত আছে। শিয়ালে প্রায়ই খেয়ে ফেলে লাশ। তাই রশীদের অনুরোধ সরকার যেন তাদের মৃত মানুষগুলোকে সমাহিত করার জন্য নির্দিষ্ট একটা জমি দেয়। যোগ করলেন, আগে তো আমাদের খাওয়া-লওয়া সবই নৌকায় ছিল। ছিল নৌকায় ভাসা জীবন। এখন সরকার আমাদেরকে থাকার জন্য জমি দিয়েছে। এবার কবরের জায়গা দিলে খুবই উপকার হবে।
স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত পারিবারিক কবরস্থানেই লাশ কবর দেয় স্থানীয়রা। বেওয়ালিশ লাশগুলোর শেষ ঠিকানা হয় গণকবরে। জঙ্গল-আবর্জনায় ভরা। কবর থেকে লাশ তুলে শিয়ালের খেয়ে ফেলার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। এই মান্দা সম্প্রদায়ের মুরুব্বি বা সিনিয়রদের মধ্যে লেখাপড়ার কোনো বালাই ছিল না। অধিকাংশেরই রাজধানী ঢাকায় আসা হয়নি। ২০২২ সালে সোনার চরের কাছেই নদীতে মাছ ধরার সময় এই সম্প্রদায়ের এক জেলেকে পেয়েছিলাম। ছোট দুই ছেলে আর ছোট একটি মেয়ে। সাথে স্ত্রী। সবাই মিলেই মাছ ধরছিল নদীতে। ওই ব্যক্তির বাড়ি ছিল পটুয়াখালীর কালাইয়াতে। এখন থাকেন চর মোন্তাজে। তিনি কালাই এবং নদী ও সাগরের বাইরে আর কোথায়ও যাননি। তার আড়াই বছরের ছেলে সাকিব তিনবার সাগরে পড়ে গিয়েছিল নৌকা থেকে। প্রতিবারই পরিবারের অন্য সদস্যরা মুহূর্তেই তা দেখে ফেলায় দ্রুত পানিতে লাফিয়ে তাকে উদ্ধার করে। যেহেতু তাদের জীবন চক্র নৌকাতেই ঘুরপাক খায় তাই এভাবে প্রায়ই নদীতে পড়ে যায় ছোট ছোট শিশুরা।
যেহেতু নদী এবং সাগরে মাছ ধরাই মান্দাদের কাজ তাই যখন মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে তখন জীবনযাপন বেশ কঠিনই হয়ে যায়। রুবেল নামে উঠতি এক জেলে জানান, তখন আমাদের রান্নার চুলা বলতে গেলে বন্ধই থাকে। তখন পারলে কোথায় কামলা/ বদলার কাজ করি। সেই কাজও না পেলে অনাহারেই থাকতে হয়।
সাগরে ভাসা মান্দারা ২০২৩ সালে সরকার থেকে বাড়ি পেলেও স্থানীয় ২০ হাজার লোকের চিকিৎসা কেন্দ্র বলতে কিছুই নেই। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার এই ইউনিয়নে একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মিত হয়েছিল। তবে ডাক্তার না থাকায় সেই স্বাস্থ্য কেন্দ্র এখন বন্ধ। তালা ঝুলছে প্রধান ফটকে। ফলে বাজারে থাকা কয়েকটি ফার্মেসিতে প্যারামেডিক্যাল কোর্স করা ব্যক্তিরাই প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানীয়দের বুড়া গৌরাঙ্গ, দাড় চিড়া এবং আগুন মুখা নদী পেরিয়ে গলাচিপা উপজেলায় যেতে হয়। বিশেষ করে স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী, গর্ভবতী নারীদের এই লম্বা নদীপথ পাড়ি দিতে গিয়ে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে হয়। বর্ষাকালে অবস্থা আরো জটিল হয়ে যায়। তখন আগুন মুখা নদী প্রচণ্ড উত্তাল থাকে। স্থানীয় সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম জানান, বর্ষায় আগুন মুখা নদীর এই উত্তাল অবস্থা পাড়ি দিয়ে অনেকেই যেতে চান না। আবার নদীর মধ্যেই নৌকা বা ট্রলারে স্ট্রোকের রোগী, গর্ভবতী নারী এবং নবজাতকের মারা যাওয়ার ঘটনাও আছে। স্থানীয় একজন জানান, চর মোন্তাজ থেকে ঢাকায় যেতে যে সময় লাগে লঞ্চে, চর মোন্তাজ থেকে গলাচিপা যেতে তেমন সময়ই লাগে। ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন ঘাট হয়ে এরপর গলাচিপা উপজেলায় যেতে হয়।
চর মোন্তাজবাসীর কাছের এলাকা রাঙ্গাবালী উপেজলা। কিন্তু সেখানে একটি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণকাজ তিন বছর আগে শুরু হলেও এখন সেই কাজ বন্ধ। ফলে বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ই থাকে না স্থানীয়দের। যাদের সামর্থ্য আছে তারা লঞ্চে করে ঢাকায় রোগী নিয়ে আসেন।
এই চর মোন্তাজে একটি মাত্র বেসরকারি কলেজ চালু হয়েছে ২০২৪ সালের শেষ দিকে। এর আগ পর্যন্ত স্থানীয়দের উচ্চশিক্ষা প্রায় বন্ধ ছিল। কারণ প্রতিদিন ২০০-৩০০ টাকা খরচ করে রাঙ্গাবালী গিয়ে কলেজে পড়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। অবশ্য যাদের সামর্থ্য ছিল তারা সন্তানদের রাঙ্গাবালীতে হোস্টেলে রেখে লেখা পড়া করাতেন। ২০২২ সালে চর মোন্তাজে গিয়ে কলেজে লেখাপড়া নিয়ে স্থানীয় ছাত্রদের হতাশার কথা শুনতে হয়েছিল। একছাত্র জানিয়েছিলেন, আমাদের পক্ষে এভাবে চর মোন্তাজে থেকে কলেজে পড়া বেশ কঠিন।
অবশ্য চর মোন্তাজে ১৪টি প্রাইমারি স্কুল ও দুইটি হাইস্কুল আছে। স্থানীয়দের মূল পেশা সাগরে মাছ ধরা এবং কৃষিকাজ। শীতকালে তরমুজ ও সাম্মাম চাষ করে তারা। ডাব ও নারিকেলও উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া ডাল, ধানও চাষ হয়। তবে গোলআলু, পটোল, পেঁয়াজ, রসুন তারা ঢাকা থেকে নিয়ে আসেন।