অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশ ২১ জানুয়ারি

শিক্ষার্থীদের পক্ষে ছিলাম, পদত্যাগ করতে চেয়েছিলাম : ট্রাইব্যুনালে পলক

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দাবি করেছেন যে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে ছিলেন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পদত্যাগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে পলক বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় ২ আগস্ট তিনি শিক্ষার্থীদের দাবির সাথে একাত্মতা পোষণ করে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এর আগে ২৯ জুলাই আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বশেষ মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি বিক্ষোভকারীদের পক্ষে কথা বলেছিলেন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে তার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট শাটডাউনের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধে উসকানি দেয়ার অভিযোগে করা একটি মামলায় পলক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আইসিটিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি চলাকালে তিনি এ কথা বলেন। এ দিন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের অব্যাহতির আবেদন জানান।

ট্রাইব্যুনালে পলকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী লিটন আহমেদ এবং জয়ের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মনজুর আলম।

শুনানিতে অ্যাডভোকেট লিটন ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘জুনাইদ আহমেদ পলকের পক্ষে তিনটি পিটিশন দাখিল করেছি। অল্প সময়ের মধ্যে প্রস্তুত করায় এগুলোতে কিছু ভুলত্রুটি থাকতে পারে।’ জবাবে ট্রাইব্যুনাল জানায়, বিষয়টি তারা বিবেচনায় রাখবে। এরপর লিটন বলেন, আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে ৯৭টি মামলা রয়েছে এবং তিনি ৮৯ দিন রিমান্ডে ছিলেন। গতকালও (বুধবার) তিনি একটি মামলায় ভার্চুয়ালি হাজিরা দিয়েছেন। এরপর তিনি ২০২৪ সালের ২০ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত তিনটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত পলকের বক্তব্যের চুম্বক অংশ আদালতে পড়ে শোনান।

এ সময় ট্রাইব্যুনাল পলকের আইনজীবীর কাছে ইন্টারনেট বন্ধের কারণ জানতে চান। আইনজীবী জবাব দেয়ার সময় কাঠগড়া থেকে হাত উঁচিয়ে কথা বলার অনুমতি চান পলক। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের নির্দেশে তাকে মাইক্রোফোন দেয়া হলে পলক বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৫ জুলাই মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে একটি গুজব ছড়ায়। এ নিয়ে ওই দিন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সাথে ছাত্রলীগ কর্মীদের সংঘর্ষ হলেও কেউ নিহত হয়নি। কিন্তু দেশের বাইরে অনেক জায়গায় দুজন নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকেও বাংলাদেশে দুজন নিহতের দাবি করে একটি পোস্ট দেয়া হয়। পরে এ বিষয়ে সচিবালয়ে সাংবাদিকরা আমাকে প্রশ্ন করলে আমি যা বলেছিলাম, তা জাতীয় পত্রিকায় এসেছে।’ এরপর পলকের আইনজীবী ওই রিপোর্টটি ট্রাইব্যুনালে পড়ে শোনান। তখন ট্রাইব্যুনাল জানতে চান বাংলাদেশের ইন্টারনেট কোথা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। উত্তরে পলক বলেন, আমাদের এই অঞ্চলের ডেটা সেন্টার সিঙ্গাপুরে।

পরে আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের লিটন বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের ইন্টারনেট সংক্রান্ত অভিযোগে আমরা বলেছি, পলক কখনোই ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশনা দেননি বা ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল না। গুজব প্রতিরোধে ইন্টারনেট কেবল সীমিত করা হয়েছিল। ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ইন্টারনেট সংক্রান্ত সব ইস্যুর ব্যাখ্যা পলকের কাছে রয়েছে, যা প্রসিকিউশনই দাখিল করেছে। তাদের সাক্ষ্য থেকেই বোঝা যায় যে অভিযোগ গঠনের কোনো উপাদান নেই। তাই আমরা উনার অব্যাহতি চেয়েছি। তিনি আরো যোগ করেন, ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষমতা কেবল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। আমার ক্লায়েন্ট শিক্ষার্থীদের প্রতি সর্বদা সংবেদনশীল ছিলেন এবং সঙ্কট সমাধানের চেষ্টা করেছেন।

অন্য দিকে পলাতক আসামি সজীব ওয়াজেদ জয়ের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুনজুর আলম বলেন, ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগে জয়ের ঠিকানা ও পরিচয় সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অবৈতনিক উপদেষ্টা, মন্ত্রণালয়ের নয়। মন্ত্রণালয়ের প্রাত্যহিক কার্যকলাপে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তিনি কেবল প্রয়োজন হলে পরামর্শ দিতেন, কোনো নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ার তার ছিল না।’

আইনজীবী মুনজুর আলম আরো বলেন, অভিযোগ করা হয়েছে যে পলক জয়ের নির্দেশে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন, অথচ সেসব পোস্টে জয়কে ট্যাগ করা হয়নি এবং জয় সেখানে কোনো লাইক বা মন্তব্যও করেননি। এ ছাড়া পলকের সাথে সালমান এফ রহমানের কথোপকথন হলেও জয়ের সাথে কোনো যোগাযোগের প্রমাণ নেই। ৫ আগস্ট পর্যন্ত জয় কোনো বক্তব্য দেননি এবং ঘটনার সময় তিনি দেশেও ছিলেন না।’

সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে তিনি বলেন, ‘যাদের আসামি করার কথা ছিল তাদের সাক্ষী করা হয়েছে। জয়কে দেশে আসা থেকে বিরত রাখতেই এই অভিযোগ আনা হয়েছে।’

এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল জানতে চান আন্দোলনের সময় জয় কোথায় ছিলেন। জবাবে আইনজীবী বলেন, আন্দোলনের ৬ মাস আগে থেকেই তিনি দেশের বাইরে ছিলেন।

তবে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম ট্রাইব্যুনালে বলেন, সজীব ওয়াজেদ জয় তিন দফায় আইসিটি উপদেষ্টা হয়েছেন এবং সরকারের নীতিনির্ধারণে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। সালমান এফ রহমান ও পলকের টেলিফোন কথোপকথনেও তার প্রভাবের প্রমাণ মেলে। সেখানে পলক জানিয়েছিলেন যে উপদেষ্টা লেটেস্ট টেকনোলজি সম্পর্কে জানেন এবং তার অনুমোদনেই সবকিছু হচ্ছে। এতে স্পষ্ট হয় যে প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টার কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন এবং উপদেষ্টা প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশনা দিতেন।

প্রসঙ্গত, গত ১১ জানুয়ারি প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ পড়ে শোনান। অভিযোগগুলো হলো : জয়ের নির্দেশে ১৪ জুলাই রাতে ফেসবুকে উসকানি দেয়া, যার ফলে ১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়; ইন্টারনেট বন্ধ করে মারণাস্ত্র ব্যবহারে প্ররোচনা দেয়া যাতে ২৮ জন শহীদ হন; এবং উত্তরায় ৩৪ জনের হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করা।

এই মামলায় সজীব ওয়াজেদ জয়কে আত্মসমর্পণে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং পলককে গ্রেফতার থাকা অবস্থায় আদালতে হাজির করা হয়। আগামী ২১ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত জানা যাবে।