মন খারাপের বিদায় পরিসংখ্যানে উজ্জ্বল রোনালদো
Printed Edition
খেলা শেষে মাঠের পর্ব শেষ করে রোনালাদো যখন ড্রেসিং রুমে ফিরছিলেন, তখনো টিভি ক্যামেরান তার সামনে পেছনে। কারণ তার এই যাওয়া যে বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষবারের মতো। আর কোনো দিন বিশ্বকাপ ফুটবলের মাঠে পা পড়বে না তার। পর্তুগালের এই রাজপুত্র যখন ড্রেসিং রুমে ফিরছিলেন, তখন তার মাথা নত। চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। তার এমন বিদায় কেউই চায়নি। কিন্তু স্পেনের কাছে ০-১ গোলে হেরে এভাবেই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়তে হলো তাকে ও তার দলকে। সব ট্রফি জিতলেও এই একটি বিশ্বকাপই জেতা হয়নি তার।
অথচ গত পরশু ডালাস স্টেডিয়ামে শেষ মুহূর্তের নায়ক হয়ে যেতে পারতেন তিনি। ইনজুরি টাইমের একেবাবেই শেষ সময়ে একটি ক্রস ভেসে এলো স্পেনের গোল পোস্টের সামনে। রোনালদো ছুটে গেলেন সে বলে মাথা ছোঁয়াতে। কিন্তু অল্পের জন্য নালাল পেলেন না। ওই বলে মাথা লাগিয়ে গোল করতে পারলে সমতা আনতে পারত পর্তুগাল। রোনালদো হয়ে যেতে পারতেন নায়ক। তার আর না হওয়ায় সব আশা শেষ। ব্যর্থতার দায় নিয়ে ফিরতে হলো তাকে। তাই খেলা শেষে যখন মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন কাঁদছিলেন। তার মতো কেঁদেছে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তার কোটি কোটি ভক্ত।
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সময় কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। শূন্য দৃষ্টিতে দূরের দিকে তাকিয়ে পরাজয়ের কঠোর বাস্তবতার কথা ভাবছিলেন তিনি, আর তার চোখে ছিল পানি।
সেই মুহূর্তেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। এমন এক মুহূর্ত যা আসলে চার বছর আগেই কাতারে আসার কথা ছিল, যখন কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছে হেরেছিল পর্তুগাল। তার বদলে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে রোনালদোর ‘শো’ বা অভিযানটি আরো একবারের জন্য দীর্ঘায়িত হয়েছিল। তবে বাস্তবিকভাবে বলতে গেলে, তার জন্য কোনো জমকালো বিদায়ের সুযোগ আসলে কখনোই ছিল না।
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদোকে দেখে দুঃখজনকভাবে তার প্রকৃত অবস্থায় ফুটে উঠছিল : তিনি এখন ৪১ বছর বয়সী এক কিংবদন্তি, যার সেরা সময়টা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তিনি সময়ের স্রোতকে আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন এবং ব্যর্থ হচ্ছিলেন। অথচ সেই সাথে আঁকড়ে ধরেছিলেন সেই একটি বড় ট্রফি জয়ের আশা, যা পর্যন্ত তার অধরা রয়ে গেছে।
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদো মাত্র ১৯ বার বল স্পর্শ করেছিলেন। বিষয়টি বোঝার সুবিধার্থে বলা যায়, শুরুর একাদশে থাকা খেলোয়াড়দের মধ্যে তার পরই সবচেয়ে কম বল স্পর্শ করেছিলেন স্পেনের স্ট্রাইকার মিকেল ওয়ারজাবাল। তার সংখ্যাটি ছিল ৩৫।
মনে হচ্ছিল যেন বিশ্বকাপ ফুটবলের শেষ ষোলোর এই ম্যাচটি তার উপস্থিতি ছাড়াই বা তাকে ছাড়াই কোনোভাবে চলছে। তিনি যেন মাঠে কেবল একজন দর্শকের ভূমিকায় নেমে এসেছিলেন। এই বিশ্বকাপে রোনালদোর পারফরম্যান্সের বিচারে এর কোনোটিই খুব একটা বিস্ময়কর ছিল না। দুই সপ্তাহ আগে টেক্সাসের হিউস্টনে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে চিৎকার করে যখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ফিরে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি!’
উজবেকিস্তানের বিপক্ষে করা দু-একটি গোল দেখে আচ্ছন্ন হয়ে যায়নি এবং যাদের মনে আছে রোনালদো তার সেরা সময়ে কেমন খেলতেন; এমন একজন খেলোয়াড় যিনি বিস্ময়কর নিয়মিততায় শ্বাসরুদ্ধকর সব মুহূর্ত উপহার দিত এবং একাই ম্যাচ জিতিয়ে দিতে সক্ষম ছিলেন।
স্পেনের বিপক্ষে খেলার সময় ফুরিয়ে আসছিল, স্কোরলাইন ছিল গোলশূন্য এবং বদলি খেলোয়াড়দের বোর্ডটি যখন ওপরে তোলা হলো, তখন মনে হচ্ছিল এবার কি রোনালদোর নম্বরটিই উঠবে? পর্তুগালকে বেশ নিষ্প্রভ মনে হচ্ছিল; আক্রমণভাগে নতুন গতি এবং এমন একজন খেলোয়াড়ের প্রয়োজন ছিল যিনি স্পেনের রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে পারেন। যে রক্ষণভাগ দীর্ঘ সময় ধরে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে খেলা চালিয়ে যাচ্ছিল।
পেদ্রো নেতো মাঠ ছাড়লেন। ভিতিনহা বেরিয়ে গেলেন। জোয়াও ফেলিক্সকে তুলে নেয়া হলো। জোয়াও কানসেলোও মাঠ ছাড়লেন। কিন্তু রোনালদো নন। যিনি মাঠের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ খেলোয়াড় এবং কৌতূহলোদ্দীপকভাবে, পর্তুগাল দলের অন্য যেকোনো সদস্যের চেয়ে গ্রুপ পর্বে যিনি সবচেয়ে বেশি সময় ধরে খেলেছেন।
পর্তুগালের কোচ রবার্তো মার্টিনেজ যে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রোনালদোকে মাঠে রেখেছিলেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। মার্টিনেজের পূর্বসূরি ফার্নান্দো সান্তোসের সেই সাহস ও দৃঢ়তা ছিল যে তিনি গত বিশ্বকাপে রোনালদোকে ছাড়াই শুরুর একাদশ সাজিয়েছিলেন। এর বিপরীতে মার্টিনেজ রোনালদোর আবদার বা ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
টরন্টোতে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদোকে তুলে নেয়ার যে সিদ্ধান্ত মার্টিনেজ নিয়েছিলেন, তা দেখে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়। সেই সিদ্ধান্তটি নেয়া ছিল সহজ; কারণ তখন মাঝমাঠে পর্তুগাল কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল এবং সমতাসূচক গোলের আশায় গঞ্জালো রামোসকে মাঠে নামানো হয়েছিল- যে গোলটি শেষ পর্যন্ত রোনালদোর পেনাল্টি থেকেই এসেছিল।
এমন পরিস্থিতিতে দু’জন স্ট্রাইকারকে মাঠে রেখে দেয়াটা হতো একধরনের কৌশলগত ব্যর্থতা। কারণ ক্রোয়েশিয়া যে আবারো গোল করতে যাচ্ছিল, তা ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার। রোনালদোর জায়গায় রুবেন নেভেস মাঠে নামার পর পর্তুগাল খেলায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় এবং দলের একসময়ের বিস্মৃতপ্রায় সেই খেলোয়াড়টিই ত্রাতা হয়ে ওঠেন।
ম্যাচজয়ী পর্তুগিজ তারকা পরে বলেছিলেন, ‘যখন শেষ মুহূর্তে গোলের প্রয়োজন হয়, তখন আপনি গঞ্জালো রামোসের ওপর ভরসা করতে পারেন।’ কিন্তু মার্টিনেজ স্পেনের বিপক্ষে কখনোই রোনালদোকে সরিয়ে সেই বিকল্পটি বেছে নিতে চাননি।
পর্তুগিজ ফুটবলে রোনালদোর অবদানকে কোনোভাবেই বাড়িয়ে বলা সম্ভব নয়। দেশের হয়ে খেলা সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় তিনি। ২৩৩টি ম্যাচে ১৪৬টি আন্তর্জাতিক গোল, পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জয় এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা তারকা। এই বিশ্বকাপের ফলাফলের কারণে তার সেই মর্যাদায় কোনো আঁচড় পড়বে না; আর তা পড়া উচিতও নয়। এমনটি ভাবাও হবে বোকামি।
শেষবারের মতো ‘সিআর সেভেন’, তারপর শুধু স্মৃতি, রোনালদো নামটি থেকে যাবে অনন্তকাল। চোখে জল থাকুক বা না থাকুক, বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ফাঁকা হয়ে যায়। কারণ, রোনালদোর বিদায় মানে শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়, বিদায় এক যুগের, এক মানসিকতার, এক অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্পের। কখনো তাকে ভালোবেসেছে পৃথিবী, কখনো সমালোচনায় বিদ্ধ করেছে। কেউ তাকে স্বার্থপর বলেছে, কেউ অহঙ্কারী। কিন্তু একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই, তিনি কখনো হার মানতে শেখেননি। প্রতিটি ব্যর্থতাকে তিনি বানিয়েছেন প্রত্যাবর্তনের সিঁড়ি। প্রতিটি সমালোচনার জবাব দিয়েছেন গোল দিয়ে। পর্তুগালের জার্সিতে তার সেই পরিচিত দৌড় দেখা যাবে না। কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে দাঁড়িয়ে দুই হাত ছড়িয়ে উদযাপনও হয়তো ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে।