পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় তৎপর আ’লীগ
বিএনপি-আ’লীগ তৃণমূল সঙ্ঘাতে রাজনীতিতে প্রভাব
Printed Edition
মনিরুল ইসলাম রোহান
রাজনীতিতে ফের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় তৎপর হয়ে উঠেছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আত্মগোপনে থাকা দলটির নেতাকর্মীদের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে স্থানীয়পর্যায়ে আনাগোনা বেড়েছে। ভয়ভীতি কাটিয়ে উঠে তারা এলাকার মানুষের সাথে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছেন। এ দিকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া দলটির নেতাকর্মীরাও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘শেখ হাসিনা আসছে, বাংলাদেশ হাসছে’ এরকম স্লোগান তুলে ধরে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে দিল্লি থেকে বিদেশে অবস্থান করা নেতাকর্মীদের দেশে ঢুকতে দলটির প্রধান শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। তবে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াটি এ দেশের রাজনৈতিক কোনো গোষ্ঠীর সাথে সমঝোতার ইঙ্গিত দিচ্ছে নাকি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী বিশেষ করে ভারতের সাথে নতুন সরকারের বোঝাপড়ার কৌশলগত দিক রয়েছে- সেটা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা রয়েছে।
অপর দিকে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে- যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় পর্যায়ে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় দীর্ঘদিন জেলে থাকা নেতাকর্মীরা জামিনে বের হয়েই স্থানীয় কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছেন। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতের ঘটনাও ঘটছে। এমনকি উভয়পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে নিহত হওয়ারও খবর পাওয়া গেছে।
গেল ২৩ ফেব্রুয়ারি আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নড়াইল জেলার সদর উপজেলার সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা খায়রুজ্জামান খায়ের মোল্যা এবং বিএনপি সমর্থিত স্থানীয় নেতা খলিল মোল্যার গ্রুপের মধ্যে ভয়াবহ সঙ্ঘাতে বিএনপির সমর্থিত চারজন ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা খায়রুজ্জামান খায়ের মোল্যার প্রভাবে বিএনপি কোণঠাসা অবস্থায় ছিল। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্বও লেগে ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই স্থানীয় আওয়ামী লীগ অনেকটা এলাকা ছাড়া হয়ে যায়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ আবার ধীরে ধীরে এলাকায় পুনর্বাসন হওয়ার চেষ্টা করে এবং একপর্যায়ে পূর্বের দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে রূপ নেয়। গত সোমবার বরিশালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি তালুকদার মো: ইউনুস, সাবেক এমপি জেবুন্নেছা আফরোজ, বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন জামিনে মুক্ত হন। এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি একই আদালত মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন ও মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হক খানকে জামিন দেয়া হয়। পতিত আওয়ামী লীগের পাঁচ শীর্ষ নেতার জামিনের প্রতিবাদে আদালত বর্জন ও বিােভ কর্মসূচি পালন করেন সেখানকার আইনজীবীরা। গেল মঙ্গলবার লক্ষ্মীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির বার্ষিক নির্বাচনে কোনো প্যানেল না দিয়েও ১৫টি পদের আটটিতেই জয় পান আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা। বাকি ছয়টিতে জয়ী হন বিএনপিপন্থী আইনজীবী। এর আগে নির্বাচনের পর পরই সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে। তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত শনিবার জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলেন দলটির কর্মীরা। এর আগে শুক্রবার আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ের ফটকের সামনে জাতীয় পতাকা ও শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি রেখে স্লোগান দেন যুব মহিলা লীগের কয়েকজন নেত্রী। এ ছাড়াও সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া, হবিগঞ্জ, রাজবাড়ী, পাবনা, রাজশাহী ও যশোরের বাঘাইছড়িতেও আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম পঞ্চগড় সদরের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের তালা খুলে দেয়ার সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এক ভিডিওতে দেখা যায়, তালা খুলে দেয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবু দাউদ প্রধান। ১৫ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন দলটির নেতাকর্মীরা। ১৬ ফেব্রুয়ারি বরগুনার বেতাগী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ঢুকে পড়েন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বেতাগী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিফাত সিকদার ওই দিন গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন, ধানমন্ডি ৩২সহ আমাদের স্থানীয় দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াত শুরু করতে। ওই দিনই সকালে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা কার্যালয়ও খোলা হয়। অফিস খোলার পর সেখানে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার নামে দোয়া ও মুনাজাত করেন। একই দিন বিকেলে খুলনা মহানগরীর শঙ্খ মার্কেটে আওয়ামী লীগ অফিস খুলে সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রবেশ করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুরের পালং বাজারে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, একই দিন সকালে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে তালা ভেঙে প্রবেশ করেন নেতাকর্মীরা এবং এসব কার্যালয়ে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙানোসহ ব্যানার ঝুলিয়ে রাখা হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে লাগানো হয়েছে দলীয় পরিচিতি ফলক। এর আগে দলটির চট্টগ্রাম জেলা উত্তর কার্যালয়ে পরিচিতফলক লাগানো হয়েছিল। শনিবার জাতীয় প্রেস কাবের সামনে আওয়ামী সমর্থিত সাংবাদিকরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে তাদের কার্যালয় খুলে দেয়ার জন্য জোরালো দাবি জানান।
সূত্র বলছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা বাড়ি ঘরে উঠতে শুরু করেছে। কোনো কোনো জায়গায় শক্তি প্রদর্শনের মহড়াও দেখা গেছে। স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি দলের এমপিদের ছত্রছায়ায় তাদের অনেকেই চলাফেরা করছেন এবং সরকারি দলের কিছু এমপিদের সাথে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার সংশ্লিষ্ট ছবি ও ভিডিও ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে। গোপালগঞ্জ ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতার মতে, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে গোপালগঞ্জে দুই শতাধিক নেতাকর্মী জামিনে মুক্ত হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে তারা নিজেদের ঘরবাড়িতে উঠেছেন, আগের মতোই প্রকাশ্যেই চলাফেরা করছেন। তাদের কেউ কেউ স্থানীয় এমপির কাছের লোক বলে পরিচিত হওয়ারও দৌড়ে রয়েছেন। শুধু গোপালগঞ্জ নয়, দেশের সব জেলায় পতিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জামিন দেয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছে। মহানগর আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার মতে, স্থানীয় আওয়ামী লীগ স্থানীয় বিএনপির সাথে সমঝোতা করে এখন সব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এটা একটা রাজনৈতিক কৌশল। তবে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নাই।
রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিষয়ে বিএনপির সাথে আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের সমঝোতা হয়েছে বলে মনে করেন না বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি। তার মতে, আওয়ামী লীগ একটি আদর্শভিত্তিক দল, আর আদর্শভিত্তিক দলকে কখনো দমিয়ে রাখা যায় না। কিছুদিন পরে হলেও আওয়ামী লীগ যে আবার রাজনীতিতে কামব্যাক করবে সেটা সহজে অনুমান করা যায়। গোলাম মাওলা রনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন একটা সরকার গঠন হয়েছে যেটা আওয়ামী লীগের জন্য স্বস্তি। বেশ কয়েক জায়গায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ও খুলতে দেখা গেছে। যেটা আগামীতে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার একটা বার্তা বহন করে।