বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস আজ
Printed Edition
হাবিবুল বাশার
আজ ২ এপ্রিল, ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’। প্রতি বছরের মতো এবারো বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। অটিজম কোনো রোগ নয়, বরং এটি একটি স্নায়বিক বিকাশজনিত বৈচিত্র্য বা ‘নিউরো-ডাইভারসিটি’ এই বার্তাটি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়াই দিবসটির মূল লক্ষ্য। ২০২৬ সালে জাতিসঙ্ঘের ঘোষিত এই দিবসের মূল সুর হলো অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের কেবল দয়া নয়, বরং তাদের অধিকার ও প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিয়ে মূলধারার সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা।
অটিজম সচেতনতা দিবস ঘোষণার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী কূটনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। এই দিবসের মূল কারিগর মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার। ২০০৭ সালের শেষভাগে কাতারের তৎকালীন ফার্স্ট লেডি শেখা মোজা বিনতে নাসের আল-মিসনদ জাতিসঙ্ঘে অটিজম সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি বিশেষ দিবসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এই মর্মে যে, অটিজম আক্রান্ত শিশুরা উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সমাজের বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হতে পারে। কাতারের উত্থাপিত এই প্রস্তাবটি জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে ব্যাপক সমর্থন লাভ করে। ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘের ৬২তম অধিবেশনে ৬২/১৩৯ নম্বর রেজুলেশনটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
২০০৮ সালের ২ এপ্রিল প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হয়।
২ এপ্রিল ও ‘নীল বাতি’র তাৎপর্য
জাতিসঙ্ঘের সেই ঐতিহাসিক সভায় ২ এপ্রিল তারিখটি নির্দিষ্ট করার কোনো একক বৈজ্ঞানিক কারণ ছিল না; বরং এটি বিশ্বজুড়ে অটিজম প্রচারণাকে একটি অভিন্ন ক্যালেন্ডার ডে-তে নিয়ে আসার জন্য কাতার ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিতে নির্ধারিত হয়।
পরবর্তীতে ২০১০ সালে মার্কিন অটিজমবিষয়ক বিশ্বের বৃহত্তম সংস্থা ‘অটিজম স্পিকস’ (অঁঃরংস ঝঢ়বধশং) প্রথমবারের মতো ‘খরমযঃ ওঃ টঢ় ইষঁব’ বা ‘নীল বাতি প্রজ্বলন’ কর্মসূচি শুরু করে। নীল রঙকে প্রশান্তি, সহমর্মিতা এবং অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনন্য প্রতিভা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। ২ এপ্রিল সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং থেকে শুরু করে ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবন পর্যন্ত বিশ্বের আইকনিক স্থাপনাগুলো নীল আলোতে আলোকিত করা হয়।
বাংলাদেশ এই দিবসের অন্যতম সক্রিয় অংশীদার এবং দক্ষিণ এশিয়ায় অটিজম ব্যবস্থাপনায় নেতৃস্থানীয় দেশ। ২০০৮ সাল থেকে নিয়মিত পালনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার এই খাতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। ২০১১ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল অটিজম পাবলিক হেলথ ইনিশিয়েটিভ’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে অটিজম আন্দোলন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০০ জন শিশুর মধ্যে একজন অটিজম স্পেকট্রাম ডিজ-অর্ডারে (অঝউ) আক্রান্ত। বাংলাদেশেও সরকারি জরিপ অনুযায়ী, সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে গ্রাম ও শহর উভয় অঞ্চলেই এখন প্রাথমিক পর্যায়ে অটিজম শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইগট) ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিস-অর্ডার অ্যান্ড অটিজম (ওচঘঅ) এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশে অটিজম সেবায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোও (ঘএঙ) গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এই দিবসের মূল সমন্বয়ক হিসেবে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কর্মসূচি পালন করে।
অটিজম সচেতনতায় সাফল্য এলেও এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বিশেষ করে বয়স্ক অটিস্টিক ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান, তাদের আবাসন সুবিধা এবং সমাজের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় তাদের পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত করা (ওহপষঁংরাব ঊফঁপধঃরড়হ) এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।