পাহাড়ের দুর্গম জনপদ থেকে জিওসির হেলিকপ্টারে উদ্ধার
রাঙ্গামাটির ক্যান্সারাক্রান্ত ওমিল তঞ্চঙ্গ্যার চিকিৎসার ভার নিলো সেনাবাহিনী
Printed Edition
আরফাত বিপ্লব চট্টগ্রাম ব্যুরো
রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার মাইনদারছড়া মুখপাড়া। বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের মিশেলে অবস্থিত এ জনপদটি এতটাই দুর্গম যে, সেখানে যাতায়াতের জন্য পায়ে হাঁটা বা নদীপথ ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। আধুনিক চিকিৎসা সেবা তো দূরের কথা, প্রাথমিক নাগরিক সুবিধা পৌঁছানোও সেখানে এক বড় চ্যালেঞ্জ। ঠিক এমন এক গভীর অরণ্যঘেরা জনপদ থেকে মৃত্যুপথ যাত্রী একজন নারীকে নিজের হেলিকপ্টারে করে শহরে উড়িয়ে এনে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ করে দিয়েছেন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি।
চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন ওমিল শোনা তঞ্চঙ্গ্যা। এ সময় সেখানে উপস্থিত সেনা কর্মকর্তারা এ প্রতিবেদকের কাছে সেদিনের সে মানবিক অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
সেনা কর্মকর্তারা জানান, গত ১৫ ডিসেম্বর মাইনদারছড়া মুখপাড়ার ওই দুর্গম এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শনে যান চট্টগ্রামের জিওসি। সেখানে তখন সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে স্থানীয়দের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ বিতরণ কর্মসূচি চলছিল। পরিদর্শন চলাকালে তার নজরে আসে পেটের তীব্র ব্যথা ও শারীরিক জটিলতায় কাতর স্থানীয় জুমচাষি বস্তাময় তঞ্চঙ্গ্যার স্ত্রী ওমিল শোনা তঞ্চঙ্গ্যা (২৬)।
সেখানে উপস্থিত চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে জিওসি জানতে পারেন, ওমিল শোনার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটাপন্ন এবং ওই দুর্গম পাহাড়ে তার যথাযথ চিকিৎসা সম্ভব নয়। সড়ক যোগাযোগহীন ওই এলাকা থেকে সাধারণ উপায়ে তাকে শহরে স্থানান্তর করাও তার পরিবারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। পরিস্থিতি বিবেচনা করে জিওসি কালক্ষেপণ না করে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেন। তিনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে মুমূর্ষু ওমিল শোনা তঞ্চঙ্গ্যাকে নিজের হেলিকপ্টারে তুলে নেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য আকাশপথে সরাসরি চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সিএমএইচে নিয়ে আসেন।
গত ১৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম সিএমএইচে ওমিল শোনা তঞ্চঙ্গ্যার নিবিড় চিকিৎসা ও বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। দীর্ঘ পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। সিএমএইচে প্রাথমিক ধকল সামলানোর পর এখন তার দীর্ঘমেয়াদী ও বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। তার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার এবং আনুষাঙ্গিক সব খরচ বহন করছে সেনাবাহিনী।
সিএমএইচের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘পাহাড়ে শান্তি রক্ষা ও সন্ত্রাস দমনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নেও কাজ করে যাচ্ছে, জিওসি স্যারের সরাসরি একজন রোগীকে উদ্ধারের এ ঘটনাটি তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেখানে সাধারণ যানবাহন পৌঁছানো সম্ভব নয়, সেখানে খোদ জিওসি স্যারের হেলিকপ্টারে একজন সাধারণ জুম চাষীর স্ত্রীকে উদ্ধার করে আনার এই ঘটনা স্থানীয়দের মাঝে সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা আরো সুদৃঢ় করেছে।’
ওমিল শোনা তঞ্চঙ্গ্যার স্বামী বস্তাময় তঞ্চঙ্গ্যা ও তার ভাবী আছেন সাথে। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তাদের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। বস্তাময় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, আমরা যেখানে বসবাস করি, সেখানে গাড়িতে চড়ে যাওয়া যায় না। কিছুটা নদীপথ আবার কিছুটা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে দুর্গম এলাকায় আমাদের জন্ম ও বসবাস। আমার স্ত্রী পেটের পীড়া নিয়ে যখন কাতরাচ্ছিল তখন আর্মি আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তারা এখানে উন্নত হাসপাতালে এনে আমার স্ত্রীকে চিকিৎসা দিয়েছে। আমি কখনো শহরে আসিনি। এখানকার পথঘাটও চিনি না; কিন্তু সেনাবাহিনীর কারণে আজ আমার স্ত্রী উন্নত চিকিৎসা পাচ্ছে। আমাদের সন্তানদের মুখে আবার হাসি ফুটেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা।
চট্টগ্রাম সেনানিবাসের একজন ঊর্ধ্বতন সেনা কমকর্তা গতকাল সন্ধ্যায় নয়া দিগন্তকে জানান, আমাদের সামরিক হাসপাতালে ক্যান্সারের ট্রিটমেন্ট নেই। তাই রোববার সকালে অসুস্থ নারীকে ক্যান্সারের বিশেষ ট্রিটমেন্টের জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানেও আমাদের সেনাবাহিনীর দুইজন লোক তদারকিতে থাকবেন। অসুস্থ নারীর স্বামী আমাদের ক্যান্টনমেন্টেই থাকেন। তিনি এখান থেকেই চমেক হাসপাতালে যাতায়াত করেন। মোটামুটি আমাদের সার্বিক তত্বাবধানেই চিকিৎসা চলছে।