বেসরকারি হাতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম ব্যুরো
Printed Edition

  • প্রতিবাদে ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের বিপিসি ভবন ঘেরাও আজ
  • এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে বিইআরসির বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ

দেশে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য খসড়া নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়ে জ্বালানি খাতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা আরো শক্তিশালী না করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হলে জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভোক্তা স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এরই মধ্যে ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বিপিসিকে চার দিনের মধ্যে এ বিষয়ে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে। আজ মঙ্গলবার এ উদ্যোগের প্রতিবাদে বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন বিপিসি ভবন ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সংশ্লিষ্টরা বেসরকারি আমদানির পরিবর্তে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন।

গত ৬ আগস্টের চিঠিতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বলেছে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। ১০ আগস্টের মধ্যে খসড়া নীতিমালা বিভাগে পাঠাতে বলা হয়। অর্থাৎ নীতিমালা তৈরির জন্য বিপিসিকে সময় দেয়া হয়েছে মাত্র চার দিন।

জ্বালানি খাতে বর্তমান আলোচনার সূত্রপাত গত ২৪ মে। ওই দিন বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বিওজিসিএল জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজসম্পদ মন্ত্রীর কাছে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি চেয়ে চিঠি দেয়। প্রতিষ্ঠানটি বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন ডিজেল, দুই লাখ টন অকটেন, দেড় লাখ টন পেট্রল এবং ৮ থেকে ১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানির অনুমতি চায়।

আবেদনটি ২ জুলাই বিপিসিতে পাঠানো হয়। পরে ১৪ জুলাই বিপিসি ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে এবং দুই কার্যদিবসের মধ্যে মতামত দিতে বলে। সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, কমিটি প্রস্তাবটির বিপক্ষে মত দেয়। এর মধ্যে ২৬ জুলাই রাতে বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে সরিয়ে দেয়া হয়। এতে প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার কারণে তাকে সরানো হয়েছে, এমন গুঞ্জন তৈরি হয়। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য খসড়ায় নেই।

২ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো: জিয়াউল হককে বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়। এর চার দিন পরই বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ও বিপণনের নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়।

খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, এলপিজি ও বিটুমিনের ব্যবসায় বেসরকারি অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক নয়। তাদের অভিযোগ, এলপিজির বাজারে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। বিপিসির সাবেক সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (কমার্শিয়াল) ও এলপি গ্যাস লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু হানিফ বলেন, গত এক বছর ধরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশনা করার শর্তে বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো প্রশাসনিক ও নৈতিকভাবে কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি আমদানি ও বিপণনের সুযোগ দেয়া উচিত নয়। তার মতে, এ খাতে বেসরকারি অংশীদারত্বের উপযোগী পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।

আবু হানিফ বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মানসম্মত জ্বালানি আমদানি না করার আশঙ্কা রয়েছে। সঙ্কটের সময় আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে তারা বাজার থেকে সরে যেতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি দ্বিতীয় রিফাইনারি দ্রুত বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন।

বিপিসির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ৭৪ লাখ ২৪ হাজার ১৬০ টন জ্বালানি তেল বিক্রির লক্ষ্য রয়েছে। এর ৯২ শতাংশ আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়; বাকি ৮ শতাংশ বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রের কনডেনসেট থেকে পাওয়া যায়।

এ দিকে নীতিমালা তৈরির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করছে বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কায়ছার হামিদ বলেন, বেসরকারিভাবে জ্বালানি আমদানি ও বিপণনের উদ্যোগ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ইস্টার্ন রিফাইনারি এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সাধারণ সম্পাদক মো: আবদুর রহমানও দ্রুত ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিপিসি ও এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারিভাবে জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন, বিতরণ ও বিপণনের সিদ্ধান্ত মানা হবে না।